ইরানের সম্পদ দিয়ে মিত্রদের ক্ষতিপূরণের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার পর, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘জব্দ’ করা সম্পদ ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা বিবেচেনা করছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে রবিবার (৭ জুন) এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। খবর দ্য এজ মালয়েশিয়ার।
সূত্রটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইতিমধ্যে ইরানের কারণে উপসাগরীয় মিত্রদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার খরচ নির্ধারণ করতে একটি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সেসব মেরামতের জন্য মিত্রদের হাতে ইরানের সম্পদ তুলে দিতে পারে।
এই তথ্যটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেল যার ঠিক আগের দিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মহসেন রেজাই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে বলেছিলেন যে, একটি শান্তি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড় দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন কেবল ‘জব্দ’ হওয়া সম্পদই নয়, বরং ইরানের অন্যান্য আর্থিক উৎসের দিকেও নজর দিচ্ছে বলে সূত্রটি রয়টার্সকে ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যেকার শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও শনিবার (৬ জুন) মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের একজন মন্ত্রী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেনির জন্য একটি চিঠি নিয়ে তেহরান সফর করেছেন বলে ইরানের বার্তা সংস্থা আইএসএনএ জানিয়েছে।
ইরানের সম্পদ স্থানান্তরের এই হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে নতুন একটি অস্বস্তি বা উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, যা এই সপ্তাহান্তেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মতে, সমুদ্রপথের যাতায়াতে হুমকি সৃষ্টি করা ইরানের ড্রোনগুলো ভূপাতিত করার পর, শনিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত গোরুক এবং কেশম দ্বীপের ইরানি উপকূলীয় রাডার সাইটগুলোতে আঘাত হানে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী শনিবার জানিয়েছে, তারা আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে যাওয়া সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করেছে, যার ফলে বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বাহরাইনে সাইরেন বেজে ওঠে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কুয়েত ও বাহরাইন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ইরান পরবর্তীতে দাবি করে যে, তারা উভয় দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করা হয়েছে এবং সপ্তমটি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির লক্ষ্যে মূলত পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়গুলোকে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য তুলে রাখবে।
কিন্তু উভয় পক্ষ পর্যায়ক্রমে ছোটখাটো সংঘর্ষে লিপ্ত থাকায় চুক্তিটি এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তেহরানে পৌঁছেছেন। আইএসএনএ জানায়, নকভি বলেছেন- তিনি তার দেশের সেনাপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির জন্য একটি ‘বিশেষ চিঠি’ নিয়ে এসেছেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হতো, যা ইরান বর্তমানে প্রায় অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
জ্বালানি তেলের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দেশে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। মার্কিন জনগণ এই অপ্রিয় যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার দাবি জানাচ্ছে। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের বেশিরভাগ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা ধ্বংস করেছি। তবে এখনো তাদের কাছে প্রায় ২১ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র অক্ষত রয়েছে। এটি সংখ্যায় অনেক, তবে যুদ্ধের শুরুর তুলনায় খুবই সামান্য।”
ঢাকা/ফিরোজ