RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২৫ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ১১ ১৪২৭ ||  ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পুঁজিবাজার জোয়ার-ভাটার মতো: গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০৩, ২২ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১১:১৭, ২২ নভেম্বর ২০২০
পুঁজিবাজার জোয়ার-ভাটার মতো: গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া

মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আইআইডিএফসি

মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে কাজ করে আসছেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাসট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানিতে (আইআইডিএফসি)। এর আগে তিনি উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিমিটিডে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া এআইবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এবং বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং আইবিএ থেকে এমবিএ করেন। ব্যাংকিং এবং নন ব্যাংকিং ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট-এ তেত্রিশ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি জেনারেল ম্যানেজার এবং হেড অব কনসালটেন্সি, রিসার্চ ও ট্রেনিং হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন-মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্টেন্স অ্যান্ড সার্ভিসেস (মাইডাস)-এ । এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্মল বিজনেস ম্যানেজমেন্ট' ট্রেনিংয়ের ওপর তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (ক্রেডিস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট) হিসেবেও তিনি মাইডাস ফাইন্যান্সে কাজ করেছেন। এছাড়াও জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানির বাংলাদেশ লিমিটেড-এ তার রয়েছে চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। এসএমই ডেভেলপমেন্ট, করপোরেট ফাইন্যান্সিং, ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, মার্চেন্ট ব্যাংকিং, পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট, সাব-সেক্টর অ্যানালাইসিস, বিজনেস কনসালটেন্সি ও ট্রেনিংয়ের ওপরও কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি রাইজিংবিডিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের ব্যাংকিং খাত, অর্থলগ্নীকারক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার, অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেসবাহ য়াযাদ। 

রাইজিংবিডি: বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, অর্থলগ্নীকারক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা কী?

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজুড়ে অবস্থা খারাপ। আমাদের এখানে প্রথম কভিড ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। চীনে ডিসেম্বরের শেষে এবং ইউরোপ আমেরিকায় জানুয়ারিতে এর সংক্রমণ শুরু হয়। মার্চের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২৩০ দেশের মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। মাঝে আক্রান্তের হার কমে আসলেও বর্তমানে আবার শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ধাপ। গত তিন সপ্তাহে ইউরোপে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। সংক্রমণের হারও মনে হয়, প্রথমবারের চেয়ে বেশি। আমাদের দেশেও এখন প্রতিদিন ২ হাজারের অধিক আক্রান্ত হচ্ছে। যে কারণে আমাদের ব্যবসায়িক খাত, শিল্প খাত, ব্যাংকিং খাত বা অর্থলগ্নীকারক প্রতিষ্ঠান- সব জায়গাতেই এর প্রভাব পড়ছে। অর্থনীতি মূলত পোশাক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। এটা সত্যি যে, রেমিটেন্স বেড়েছে। এর কারণ, যারা প্রবাসে কাজ করতেন, তাদের অনেকে দেশে ফিরে এসেছেন। মহামারির কারণে তাদের আয় এবং জমানো সব টাকা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফলে আপাতত রেমিট্যান্স বেড়েছে। কিন্তু করোনার কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অনেকে আর যেতে পারছেন না। এটাও আমাদের অর্থনীতির জন্য একটা অশনি শংকেত। পরবর্তী বছরে রেমিট্যান্সের এই হার কোথায় দাঁড়াবে, সেটা আমার কাছে পরিষ্কার না। 

২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনে কভিড দেখা দেওয়ার পর রপ্তানি খাত হোঁচট খায়। যদিও তখনও ইউরোপ বা আমেরিকায় সংক্রমণ শুরু হয়নি। কিন্তু দুই-তিন মাসের মধ্যে সেসব দেশেও সংক্রমণ শুরু হয়। রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল আমরা বেশিরভাগই চীন থেকে আমদানি করি। ডিসেম্বরে চীন ব্লক হয়ে যাওয়ার পর আমাদের রপ্তানি খাতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়া শুরু হয়। যদিও সে সময় ইউরোপ আমেরিকায় রপ্তানি বন্ধ হয়নি। কিন্তু কাঁচামালের অভাবে আমরা উৎপাদন করতে পারছিলাম না। মার্চ থেকে সব ধরনের রপ্তানি অর্ডারও বন্ধ হয়ে যায়। জুলাই থেকে কভিডের প্রকোপ কমার ফলে বায়াররা আগের অর্ডারের পাশাপাশি নতুন করে অর্ডার দেওয়া শুরু করলেন। চীনের সাথে কাঁচামাল আমদানির লাইনও খুলে গেল। ফলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর কোয়ার্টারে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য ভালো হয়েছে।  ফ্যাক্টরিগুলো চলমান রাখার জন্য বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় আমাদের রপ্তানিকারকরা অনেক কম মূল্যে কাজের অর্ডার নিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করে অক্টোবরে এসে আবার আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য ধাক্কা খায়। অক্টোবরে আমাদের মূল বায়ার দেশগুলোতে কভিডের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হওয়ায়। এসব কারণে আমাদের আর্থিক আর ব্যাংকিং খাত প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। নতুন করে ব্যবসা করতে পারছি না। গত দুটো ঈদ আর বৈশাখে সবকিছু বন্ধ ছিল। ব্যবসা করতে পারেনি আমাদের রিটেলাররা। পুজার সময় মার্কেট খোলা থাকলেও আশানরুপ কোনো ব্যবসা হয়নি। এর ফলে এসএমই খাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুচরা ছোট ছোট বিনিয়োগকারী আর উদ্যোক্তারা চরমভাবে ব্যবসায়িক মার খেয়েছে। দোকানে, এসএমইতে কাজ করা লাখ লাখ লোকের জীবন জীবিকার ওপর পভাব পড়েছে।

পরিবহন খাত পুরোপুরি বন্ধ ছিল দীর্ঘ সময়। সিনেমা, থিয়েটার, ক্লাব, হোটেল-রেস্টুরেন্ট সব বন্ধ ছিল। পর্যটন খাতেও চরমভাবে ধস নামে। বিয়ে বন্ধ, কমিউনিটি সেন্টার, ডেকোরেটর, ক্যাটারার, আবাসন খাত- মোট কথা প্রায় সব খাতেই করোনার প্রভাব পড়েছে। এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের সুযোগ কমে গেছে। কী করবে মানুষ ঋণ নিয়ে? শোধ করবে কী করে? এর মধ্যে আমরা ক্যাশ ফ্লো মিস করেছি।  আপনি জানেন, কভিডের কারণে  সরকার কতগুলো ইনসেনটিভ ঘোষণা দিয়েছেন। ঋণগ্রহীতারা জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২০ মানে একবছর যারা কিস্তি পরিশোধ করতে পারবে না, তারা অটো রেফারেল সুবিধা ভোগ করবেন। তাতে আমাদের ঋণ আদায়ের গতি অনেক স্লো হয়ে গেল, কমে গেল।  অন্যদিকে, আমাদের ফান্ডের সোর্স হচ্ছে- আমরা ডিপোজিট সংগ্রহ করি। ডিপোজিট যারা করছেন, তাদের ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো রেফারেল নাই। ম্যাচিউরিটি হলেই তাকে প্রাপ্য মুনাফা দিতে হচ্ছে। এসব অনেকগুলো কারণে বিশাল একটা নেগেটিভ প্রভাব পড়ছে আমাদের সার্বিক অর্থ খাতে।

রাইজিংবিডি: করোনাকালীন এবং করোনা পরবর্তী পুঁজি বাজারের অবস্থা নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ-

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: পুঁজিবাজার কিন্তু সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে যে কেবল উর্ধ্ব গতি থাকবে, তা নয়। স্বাভাবিকভাবে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতিতে আপস্ অ্যান্ড ডাউন থাকবে,বাবল থাকবে, ব্রাস্ট হবে। নদীর জোয়ার-ভাটার মতো। এটাই স্বাভাবিক। আর এখনতো রীতিমত অস্বাভাবিক অবস্থা। সরকারিভাবে আমাদের পাবলিক ছুটি ছিল ২৬ মার্চ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত। এই পুরা সময়টাই পুঁজিবাজার বন্ধ ছিল। দুই মাস পর যখন মার্কেট খোলে, তখন আরও খারাপ অবস্থা হয়। তারপরও সরকারিভাবে পুঁজিবাজারের ডেভেলপমেন্টের জন্য বিভিন্ন চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা দেখেছি, জুলাইয়ের পর থেকে মার্কেট কিছুটা চাঙা হয়েছে। ভলিউম আর ইনডেক্সও বেড়েছে।

রাইজিংবিডি: পুঁজিবাজারে কী কী বিষয় মাথায় রেখে বিনিয়োগ করা উচিত? নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্যে আপনার পরামর্শ।  

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: করোনায় সব সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছু সেক্টর ভালো করেছে। আইটি সেক্টরের কথা বলা যায়। এর ব্যবহারীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। অনলাইনে স্কুল, কলেজের ক্লাস নেওয়া, বাসা থেকে অনলাইনে অফিস করাসহ বিভিন্নভাবে আইটি খাত ভালো করেছে। ব্যাংক বা আর্থিক খাতের কথা যদি বলেন, ব্যবসা করতে না পারলেও নতুন করে ক্ষতি হয়নি। যদিও লং টার্মে ব্যবসা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু নতুন করে খরচ বাড়েনি। লসও হয়নি। লো কস্টে (৪ থেকে সাড়ে ৪%) সরকারি যে ফান্ড এসেছে, সেগুলো গ্রহণ করেছে। এরকম কিছু কিছু খাত ভালোও করেছে। আবার হোটেল, ট্রান্সপোর্ট, পর্যটন এসব খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ওভার অল রপ্তানি খাত খারাপ করেছে। সবকিছু বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। মনে রাখবেন, বিনিয়োগের সুযোগ কিন্তু সবসময় কিছু না কিছু থাকেই। হুজুগে বা না বুঝে বিনিয়োগ করলে তার খেসারত দিতে হবে। বিনিয়োগের আগে মার্কেটের গতি অবজার্ভ করতে হবে। যে খাতগুলো ভালো করছে- তাদের দিকে খেয়াল রেখে বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোতে ইনভেস্ট করা ঠিক হবে না। 

রাইজিংবিডি: আপনার প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসেবার মান যথেষ্ঠ বলে মনে করেন? গ্রাহক সন্তুষ্টির বিষয় নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা।

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: এটা একটা ভালো দিক উল্লেখ করেছেন। ব্যবসা নির্ভর করছে, আমরা গ্রাহককে কতটা সন্তুষ্ট করতে পারছি-তার ওপর। আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানের কেবল প্রচুর টাকা থাকলেই যে, ভালো ব্যবসা করতে পারবো- তা নয়। এরকম প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই ভালো, অভিজ্ঞ জনবল আছে। সুসজ্জিত অফিস আছে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে-কাস্টমার আমাকে প্রেফার করছেন কি না, তিনি অন্য প্রতিষ্ঠান রেখে আমার এখানে কেন আসবেন। মনে রাখতে হবে, কাস্টমার আমার কাছে আসা মানে আমি তাকে ফেভার করছি না, তিনি আমাকে ফেভার করছেন। অন্য ৪০/৫০টা প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে আমার প্রতিষ্ঠানে এসেছেন। কাস্টমারের ফেভার পাওয়ার জন্য তার সন্তুষ্টির প্রতি সবসময় খেয়াল রাখতে হবে। এই বিষয়ে আমরা খেয়াল রাখি। আমাদের এখানে কাস্টমারের অভিযোগ করার সুযোগ আছে। ওয়েবসাইটে এসেও অভিযোগ, পরামর্শ, মতামত খোলাখুলি জানাতে পারেন। আমার নিজের ফোন নম্বর সব জায়গায় দেওয়া আছে। প্রয়োজনে তারা আমাকে কল বা এসএমএস করতে পারেন। ইমেইলও করতে পারেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আমার সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেন। এসব বিষয়ে আমাদের দরজা কাস্টমারদের জন্য সবসময় খোলা। কাস্টমার আমাদের কাছে সবসময় প্রাধান্য পেয়ে থাকেন। আমরা বিশ্বাস করি, কাস্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট।

রাইজিংবিডি: আগের মতো এখন আর ব্যাংকের চাকরির জন্য রিলেটেড বিষয়ে (বিজনেস, ম্যাথ, ইকোনমিক্স, ফিন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং) না পড়েও কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ভালো-মন্দ দিক নিয়ে আপনার মতামত। 

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: ব্যাংক পেশায় আসার জন্য কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ড বা রিলেটেড বিষয়ে পড়াশোনা থাকলে ভালো। কিন্তু এটা একমাত্র ক্রাইটেরিয়া না। এখন সেটা বাধ্যতামূলকও না। তবে একজন ব্যাংকারকে অবশ্যই ম্যানেজমেন্ট অ্যাটিচিউড, বেসিক নলেজ, মানুষের সঙ্গে ডিলিংস, ইন্টারপার্সোনাল কমিউনিকেশন- এই গুণাবলী থাকতে হবে। তাহলে কিন্তু তিনি ভালো করবেন। একটা বয়সের পরে, ধরুন ৪০ বছরের পর তার একাডেমিক কোয়ালিফিকেশন, কোথায় পড়াশোনা করেছে,রেজাল্ট কী ছিল,কী বিষয় নিয়ে পড়েছে- এসব আর ম্যাটার করে না। একটা সময় ছিল, যখন ক্যালকুলেটর নিয়ে হাতে হিসাব করে খাতায় অ্যান্ট্রি দিতে হতো। আবার আইআরআর করতে হতো। ব্যালেন্স শিট মিলাতে হতো। ক্যালকুলেটর টিপে যোগ বিয়োগ করতে হতো। এখন অটোমেশনের যুগ। এখন সব প্রোগ্রাম ডিজাইন করা। দেখতে হবে, আপনার বেসিক নলেজটা আছে কি না। আপনি একজন কাস্টমারকে ম্যানেজ করতে পারছেন কি না। আপনার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আপনি বুঝতে পারছেন কি না, টাকাটা দিলে সেটা সঠিক সময়ে পাওয়া যাবে। আপনি আপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝতে পারছেন কি না। ইন্ডাস্ট্রির সার্বিক অবস্থা ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বুঝতে হবে আপনাকে। এটাই ইম্পর্টেন্ট। খেয়াল করবেন, অনেকে সায়েন্সে, সাহিত্য বা অন্য বিষয়ে পড়াশোনা করে এসেও খুব ভালো করছেন।  সাকসেসফুল অনেক সিইও আছেন ব্যাংকিং খাতে, যারা ব্যাংক রিলেটেড বিষয়ে পড়াশোনা করেননি।  এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে।  এটার কারণ, তাদের নিজেদের জানার আগ্রহ, জ্ঞানের পরিধি, অভিজ্ঞতা, ব্যাংক থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণ নিয়ে সঠিকভাবে সেটা ফলো করা, ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারা। ফলে রিলেটেড বিষয়ে না পড়েও যে কেউ ব্যাংকিং পেশায় এসে ঘাটতিগুলো পূরণ করতে পারেন। সারকথা হচ্ছে, ব্যক্তিগত বেসিক ইন্টেলিজেন্সি থাকলে আপনি সফল হবেনই। 

রাইজিংবিডি: অনলাইন ব্যাংকিং (বিকাশ, শিওরক্যাশ, কিউক্যাশ, নগদ ইত্যাদি) এবং অর্থলগ্নীকারক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে জেনারেল ব্যাংকিং কার্যক্রম কী সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন?

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: বাইরে থেকে এটাকে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। আসলে এটা কিন্তু পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন ব্যাংকেরই প্রোগ্রাম কিন্তু এগুলো। ধরুন একটা ব্যাংকে আপনার অ্যাকাউন্ট আছে। হঠাৎ করে কোনো বিপদে অসময়ে আপনার টাকার দরকার পড়লো। কাউকে জরুরিভাবে টাকা পাঠাতে হচ্ছে। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই অথবা আশেপাশে ব্যাংক নেই। খেয়াল করবেন, প্রত্যন্ত এলাকায় আজকাল এসব এজন্ট রয়েছে। যাদের মাধ্যমে খুব সহজে এবং দ্রুত সময়ে লেনদেন করতে পারছেন। এমনও হতে পারে, হাসপাতালে জরুরিভাবে আপনার টাকার দরকার। এরকম পরিস্থিতিতে নন ব্যাংকিং এসব বিকল্প পন্থায় আপনি অনায়াসে লেনদেন করে প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। এজন্য তেমন কিছুর দরকার হয় না। আপনার হাতে থাকা মোবাইল ফোনে একটা অ্যাকাউন্ট থাকলেই হবে। অ্যাকাউন্ট করাটাও খুব সোজা। আর এ পদ্ধতিতে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা লেনদেন করতে পারছেন। যে সার্ভিসটা ব্যাংক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারছে না, সেই সার্ভিসটাই খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এই পদ্ধতির মাধ্যমে। সুতরাং এসব লেনদেনের মাধ্যম ব্যাংকিং ব্যবসার সঙ্গে মোটেও সাংঘর্ষিক নয়।

রাইজিংবিডি: একটা সময় আমরা দেখেছি, টেলকো কোম্পানিরা প্রতি কলের ওপর তাদের খেয়াল খুশি মতো চার্জ নিতো। পরে অন্য কোম্পানি মার্কেটে মূল্য কমিয়ে দেওয়ার পর তারাও কমাতে বাধ্য হয়। সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা আর্থিক লেনদেন কোম্পানি আগের কোম্পানির চেয়ে অর্ধেক রেটে সেবা অফার করছে। রেটের এই তারতম্যের কারণে কাস্টমার বিভ্রান্ত হওয়া বা সার্ভিসে বিরুপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: আপনি যদি কেবল প্রাইসের কথা বলেন, তাহলে দেখবেন প্রাইস কিন্তু সব সময় ডমিনেট করে না। এক কাপ চায়ের কথাই মনে করুন। পাঁচ টাকার চা যেমন পাওয়া যাচ্ছে, পঞ্চাশ টাকার চাও পাওয়া যায়। পাঁচতারকা হোটেলের চায়ের দামের কথা বাদই দিলাম। এটা আসলে নির্ভর করছে একজন কাস্টমারের চাহিদা, সময় আর সন্তুষ্টির ওপর। কাস্টমারের প্রয়োজন মতো সে যদি নির্বিঘ্নে সার্ভিসটা পায়। আবার এমনও হতে পারে সামান্য টাকা বাঁচাতে সার্ভিসটা নিতে গিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করতে হলো আপনাকে। এতে আপনার সময় এবং টাকা দুটোরই অপচয় হলো। তাই একটু বেশি টাকা খরচ করেও আপনি নির্ঝঞ্জাট সেবাটা পেতে চাইবেন। তবে এটা ভালো দিক যে, একজনের চেয়ে আরেকজন কম অফার করছে। সমান সুবিধা সম্বলিত সেবা পেলে অবশ্যই আপনি বেশি খরচের সেবা নেবেন না। ব্যবসায় এই প্রতিযোগিতা থাকা ভালো।

রাইজিংবিডি: আমাদের দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, নাগরিকদের জীবনযাপনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গড়ে উঠা বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা বেশি বলে মনে করেন কী?

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হবে বেশি। এটা সত্যি,দেশের অনেক লোকজন ইচ্ছে থাকার পরও জেনারেল ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসতে পারেনি। সব মানুষ চাহিদামত ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসলে কিন্তু বেশি মনে হবে না। পাশাপাশি এটাও সত্যি, এত ব্যাংক পরিচালনার জন্য দক্ষ আর অভিজ্ঞ জনবলের বেশ অভাব রয়েছে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়া, গভর্নেস না থাকা, ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সামলানোর মতো দক্ষ লোকের অভাব,সততার ঘাটতি-এসব কারণেও আমরা বেশ সাফার করছি। এসব এখন বিবেচনায় আনা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন কোনো ব্যাংকে অনুমোদন দিচ্ছে, তখন কিন্তু সেই ব্যাংকের প্রটেনশিয়ালিটি দেখে তবেই দিচ্ছে। যারা ভালো করছে, যাদের জনবল, অপারেশন, স্কিল ভালো, তারা কিন্তু ভালো ব্যবসাও করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি জনসংখ্যার কত ভাগকে এই সার্ভিসের আওতায় আনতে পরেছেন-এর ওপর নির্ভর করবে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি না কম। তবে এটাও ঠিক, কিছু কিছু ব্যাংক সব মিলিয়ে খারাপ করছে, সেদিক বিবেচনা করলে বেশি। আবার আপনি যদি মনে করেন, দেশের টোটাল জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনবেন, তাহলে কিন্তু বেশি না। 

রাইজিংবিডি: কিছু কোম্পানি খুব সহজে ঋণ পাচ্ছে। এর মধ্যে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি বা দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন। কারো কারো শাস্তি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আটকে যাচ্ছে ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যক্তি ঋণ পাওয়া এবং তা আদায়ে ব্যাংকের কঠোর নীতি– এ বিষয়ে আপনার মতামত? 

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: আসলে খেলাপিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যে পলিসি বা দেশের যে আইন, তা কিন্তু সবার জন্য সমান। সেটা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-যাই বলুন না কেন। ব্যক্তির জন্য খুব কড়াকড়ি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ছাড়- এরকম কিন্তু না। কয়েকটা বিষয় খেয়াল করুন। প্রতিষ্ঠান বা বড় বড় ঋণখেলাপি  যারা আছেন, তাদের কেউ কেউ হয়তো বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে বা আইনের ফাঁক-ফোঁকর খুঁজে সময় চেয়ে নিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। আলটিমেটলি বেশিরভাগই সফল হতে পারেন না। এসব ঋণ আদায়ে হয়ত সময় লাগবে ২-৪ বছর। বড়জোর ৫ বছর। কিন্তু একটা সময় আপনাকে (ঋণখেলাপি) কিন্তু ধরা দিতেই হবে। আর ব্যক্তি যারা ঋণ নেন, সে টাকার অংক অনেক ছোট। তাদের ক্যাপাসিটি থাকে না, আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবার। তারা কোর্টে গিয়ে রিট করা বা স্টে অর্ডার নিতে পারেন না। যে সুযোগটা বড় ঋলখেলাপিরা নিয়ে থাকে। যে কারণে ব্যক্তি ঋণগ্রহীতার প্রতি ব্যাংক বেশি প্রভাব খাটাতে পারে। কিন্তু নিজে একজন ব্যাংকার হিসেবে যদি বলি, আমার কাছে সব ঋণগ্রহীতাই সমান। আমি কাউকে লিবারেলি আবার কাউকে কড়া ভাবে দেখি-তা কিন্তু না। তবে এটা ঠিক ব্যবসায়িক কারণে প্রাইসিংয়ের ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে কিছু তারতম্য ঘটে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি ঋণগ্রহীতার রিস্ক বেশি, অপারেটিং মনিটরিং কস্ট বেশি বলে তার ক্ষেত্রে হয়তো রিস্ক প্রিমিয়াম অ্যাড করে ১ পারসেন্ট বেশি দিচ্ছি।  কিন্তু ঋণ আদায় বা কড়াকড়ির ক্ষেত্রে উভয়ের জন্যই সমান ব্যবস্থা নেই আমরা। 

ঋণখেলাপি কেন হচ্ছে, এটা আমাদের জানতে হবে। কেবল আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের অনেকে দেশেই হচ্ছে। আমাদের তুলনায় তাদের হার অনেক কম। ঋণ দেওয়ার সময় আমরা যদি সঠিকভাবে রিস্ক অ্যাসেসমেন্টটা না করতে পারি, যদি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী অসৎ হয়, অসাধু পন্থায় যদি ঋণগ্রহীতার সাথে হাত মেলায়, বা কোনো প্রভাবের কারণে ঋণ দিতে বাধ্য হয়- সেক্ষেত্রে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে যায়। 

রাইজিংবিডি: অনেক ব্যস্ততার মাঝেও রাইজিংবিডিকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া: আপনাকেও ধন্যবাদ। রাইজিংবিডির সাফল্য কামনা করছি।

মেসবাহ/সাইফ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়