ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

‘আগামী ৫ বছরে বিআইডব্লিউটিসিকে মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবো’ 

সাজ্জাদ চিশতী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২০, ১৯ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১৮:২২, ১৯ আগস্ট ২০২২
‘আগামী ৫ বছরে বিআইডব্লিউটিসিকে মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবো’ 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের নদীসমূহে জাহাজ বা ফেরি পরিচালনা এবং নদীবন্দরসমূহের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো পরিবর্তন, জাহাজ নির্মাণ, ফেরি নির্মাণ, নতুন ফেরিঘাট তৈরি, পরিচালনাসহ নানাবিধ পরিবর্তন, পরিমার্জন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন বিআইডব্লিউটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব আহমদ শামীম আল রাজী। বিআইডব্লিউটিসি নিয়ে তার বিবিধ পরিকল্পনা এবং আগামী ৫ বছর পর প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি কোথায় নিয়ে যেতে চান সেই রোডম্যাপ রাইজিংবিডিকে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠানটির কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছেন।

শামীম আল রাজী বলেন, ‘যে মানের সেবা আমরা সব সময় দিতে চেয়েছি সে মানের সেবা দিতে পারিনি। এ জন্য কিছু ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা চেয়েছিলাম সুশৃঙ্খলভাবে ফেরিঘাটে কার্যক্রম চলবে কিন্তু ঘাট এক জায়গায় স্থির থাকে না। বর্ষাকালে এক রকম, শীতকালে অন্যরকম। অর্থাৎ প্রাকৃতিক কারণে অনেক সময় অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ছাড়াও এ খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা দরকার ছিল সেই পরিমাণ বিনিয়োগ কখনো হয়নি। তবে বর্তমান সরকার এ দিকে মনোযোগ দিয়েছে। 

২০২১ সালের নভেম্বরের ১০ তারিখ চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হয়েছেন শামীম আল রাজী। দায়িত্ব নেওয়ার পর নদীবন্দরসমূহের উন্নতির লক্ষ্যে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তিনি। বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে এখন পর্যন্ত চেষ্টা করে যাচ্ছি বিআইডব্লিউটিসির আমূল পরিবর্তন আনার। এটিকে একটি মডেল প্রতিষ্ঠানে রূপদান করার ওপর আমি জোর দিয়েছি। বিশেষ করে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা খুব প্রয়োজন ছিল, সেটি এখন অনেকটা ফিরে এসেছে। ব্যয় সংকোচন প্রয়োজন ছিল, সেটাও এখন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। পুরনো জাহাজগুলোকে পরিবর্তন করে বা পরিমার্জন করে নতুন ফেরি, নতুন জাহাজ- এ বিষয়গুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি।  আমাদের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামীতে যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চেয়েছি সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই অগ্রসর হয়েছি।  

এদিকে নতুন আরও ১৪টি রুটে ফেরিঘাট করার পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান  আহমদ শামীম আল রাজী আরো বলেন, আমরা অত্যন্ত আনন্দিত পদ্মার মতো একটা নদীর উপর সেতু তৈরি হয়েছে। যদিও সেখানে আমাদের মাওয়া ঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আমার প্রতিষ্ঠান বড় একটা রেভিনিউ মিস করবে। মাওয়া ফেরিঘাট যেহেতু বন্ধ রয়েছে, সেখানে যে আমাদের ফেরিগুলো রয়েছে, এ ছাড়াও আরো নতুন ১২টি ফেরি আমরা আমদানি করবো। সারাদেশে মোট ১৪টি রুট আমরা চিহ্নিত করেছি যেখানে এই ফেরিগুলো চলাচল করবে। তবে এ জন্য কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী নভেম্বরে আমরা চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ ফেরি পরিচালনা করব। নতুন ১৪টি রুটের মধ্যে চরফ্যাশন ভোলা মনপুরা লক্ষীপুর ও চট্টগ্রাম একটি রুট আমরা পরিচালনা করব। এটি বাস্তবায়ন হলে নোয়াখালী কুমিল্লা চাঁদপুরের লোকজনকে কষ্ট করে আর ঢাকা দিয়ে ঘুরে যেতে হবে না।  

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শরীয়তপুর মাদারীপুরের হাইওয়ের কাজ চলছে। হয়ে গেলে চাঁদপুর থেকে শরীয়তপুর যে ফেরিগুলো যায় তা চারগুণ ট্রাফিক বাড়বে। এ ছাড়াও রৌমারী চিলমারী একটি রুট পরিচালনা করবো। কারণ চিলমারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। চিলমারী থেকে রৌমারীর কোনো যোগাযোগ ছিল না। আমি গত মাসখানেক আগে রৌমারী চিলমারী বন্দর দেখেছি। ওখানে আমাদের সব উপাদান রয়েছে। শুধু দুটো জিনিস আমাদের লাগবে, একটি হচ্ছে সংযোগ সড়ক, আরেকটি হচ্ছে ড্রেসিং করানো। নাব্যতা, ঘাট পরিবর্তন, পানির উচ্চতা বৃদ্ধিসহ নানাবিধ কারণে আমাদের মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়তে হয়। এ ছাড়াও আরও একটি সমস্যা হচ্ছে সংযোগ সড়ক। এই কয়েকটি বিষয় আমরা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য কাজ করছি। এ ছাড়াও বিআইডব্লিউটিসি'র ঢাকার যে অফিস রয়েছে সেটিকে ১৫তলাবিশিষ্ট  সদরদপ্তর হিসেবে গড়ে তোলার কাজ হচ্ছে। চট্টগ্রামে নতুন করে দুটি টার্মিনাল হবে, খুলনায় আঞ্চলিক অফিস হবে। নারায়ণগঞ্জে আমাদের কিছু জায়গা রয়েছে সেখানে অত্যাধুনিক ব্লক তৈরি করা হবে। আমাদের সঙ্গে কোরিয়ার একটি কোম্পানির চুক্তি হয়েছে।  

আমি এখন থেকেই স্বপ্ন দেখি পাঁচ বছর পরে বিআইডব্লিউটিসিকে কোথায় দেখতে চাই। সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী। এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম অর্জন করছে, ভবিষ্যতে আরো লাভ করবে। বলেন প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান। তিনি আরো জানান, রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিআইডব্লিউটিসি একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান যে প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। এ ছাড়াও সরকার থেকে ভর্তুকি গ্রহণ না করে নিজস্ব অর্থায়নে চলছে। 

আহমদ শামীম আল রাজী বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। তবে কিছুটা বিনিয়োগ করতে হবে সরকারকে, সেটা যদি আমরা করি তাহলে বিআইডব্লিউটিসিকে খুব সহসা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এক মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। শুধু যে যাত্রী সেবায় মনোযোগী তা নয়, যাত্রীর সঙ্গে স্টাফরা কেমন আচরণ করছে সেসব ইন্টার্নাল ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বিআইডব্লিউটিসি। ঘাটে স্টাফ যারা আছে তারা যেন মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করে এর জন্য আমরা ট্রেনিং করিয়েছি। ইতোমধ্যে যারা সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভালো ব্যবহারকারীদের পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছি। অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় প্রত্যেকটা জাহাজে বা ফেরিতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন আমরা আর আগের মতো অব্যবস্থাপনার মধ্যে নেই।  

শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, নদীপথকে কাজে লাগিয়ে বিনোদনের জন্য নৌভ্রমণেরও পরিকল্পনার কথা জানান বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব যেসব জাহাজ রয়েছে সেগুলো নিয়ে পর্যটন কর্পোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে পর্যটন খাতে আমাদের ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে এমডি মাসুদ নামে একটি জাহাজ সাজিয়েছি যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অপারেশনের যাবে। এটি মাওয়া অথবা নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিচালনা করব। আপনার জানেন নৌযাত্রায় অন্যতম ভোগান্তি হচ্ছে সদরঘাট পর্যন্ত পৌঁছানো। তাই মানুষ সহজে যেন ভ্রমণের আনন্দ পায় সেজন্য আমরা এমন একটি জায়গার সন্ধানে আছি যেখানে মানুষ অতি সহজে পৌঁছাতে পারে এবং প্রতিদিন বিকেলবেলা জাহাজটি ছেড়ে যাবে। ভ্রমণ বিনোদনের জন্য প্রথমে এমডি মাসুদ জাহাজ দিয়ে শুরু করবো, পরে আরো কয়েকটি জাহাজ যুক্ত হবে বিশেষ করে যে জাহাজগুলো পুরনো হয়ে গিয়েছে। সেগুলোকে শর্ট জার্নি করার জন্য আমরা এই খাতে ব্যবহার করতে পারি।

বিআইডব্লিউটিসির সবচেয়ে বড় একটি স্বপ্নের প্রকল্প হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে নৌপথে হজ করতে যাত্রী পাঠানো। এ বিষয়ে শামীম আল রাজী বলেন, আমরা একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব তৈরি করেছি। সেটি হচ্ছে আগামী বছর থেকে হজ যাত্রী পরিবহন। আমরা যদি এটি সরকার থেকে অনুমোদন নিতে পারি তাহলে বাংলাদেশ থেকে হজ যাত্রীদের ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা কম খরচে আমরা হজ করাতে পারবো। তবে এ জন্য আমাদের বড় শিল্পের প্রয়োজন হবে। আমাদের ৮-১০ তলা জাহাজ আমদানী করতে হবে যেখানে ১০ হাজার হাজী হজ করতে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম মন্ত্রণালয়ও আমাদের সহযোগিতা করছে। আমরা শুধু এখন সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছি। 

আমি আমার স্বপ্নের বিআইডব্লিউটিসি বির্নিমানে মাননীয় মন্ত্রী ও সরকারের খুবই আন্তরিকতা ও সহযোগিতা পাচ্ছি। আমাদের মাননীয় মন্ত্রী সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেন, সহযোগিতা নিয়ে পাশে আছেন। ব্যক্তি জীবনে আমি তিন সন্তানের জনক। টিএনও থেকে ডিসি, সরকারের নানা জায়গায় কাজ করেছি, নিজে সৎ থেকে কাজ করেছি, জনপ্রতিনিধিদের ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছি। আগামী বছর চাকরি শেষ হবে, কাজের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে সারাজীবন বেঁচে থাকতে চাই। বলেন বিআইডব্লিউটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান। 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়