ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৩ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ১০ ১৪৩১

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি মামলা

পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:১৫, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ০৯:১৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

ফাইল ছবি

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির রাতটি চকবাজারের চুড়িহাট্টাবাসীর জন্য অন্যরকম ছিলো। এক বেদনাবিধুর রাত কেটেছে তাদের। সেখানকার ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৭১ জন নিহত হন। সেই ঘটনায় করা মামলার বিচার পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি।

বিচার চলছে অত্যন্ত শ্লথ গতিতে। বিচার কবে নাগাদ শেষ হবে বলতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগুনে নিহতদের পরিবারগুলো দোষীদের সাজার দাবি করেন।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৭১ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেক। এ ঘটনায় পরদিন নিহত জুম্মনের ছেলে আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে প্রায় তিন বছর পর ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনের মালিক দুই সহোদরসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাইউম। গত বছর ৩১ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়। গত এক বছরের অধিক সময়ে মামলার বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর আসিফ আহমেদ সাক্ষ্য দেন। তবে তার সাক্ষ্য শেষ হয়নি।  এ মামলায় মোট সাক্ষী করা হয়েছে ১৬৭ জনকে। আগামী ২১ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ রেখেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক আমিনুল ইসলাম।

আসামিরা হলেন ভবনের মালিক দুই সহোদর হাসান ওরফে হাসান সুলতান, সোহেল ওরফে শহীদ ওরফে হোসেন, রাসায়নিকের গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল হক, ম্যানেজার মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতির, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফ। এরা সবাই জামিনে আছেন।

নিহত জুম্মনের ছেলে মামলার বাদী আসিফ আহমেদ জানান, প্রতি বছর এদিন আসলেই মানুষজন খোঁজ খবর নেয় বাকি ৩৬৪ দিন আমরা কেমন আছি, কীভাবে চলছে কেউ ঘুরেও দেখে না। কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। বলতে গেলে অন্যদের চেয়ে আমরা অনেকটাই ভালো আছি। তবে অনেক পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে পাঁচ বছর চলে গেলো। এখনো মামলার বিচার ঠিকমত শুরুই হলো না। সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবর মাসে আদালতে সাক্ষী দিয়ে এসেছি। আর কোনো খোঁজখবর নেই। আসামিপক্ষের সময়ের আবেদন জন্য আমার সাক্ষ্যগ্রহণ ঠিকমত শেষও করতে পারলাম না। মামলার পরবর্তী তারিখ কবে তাও জানি না। তাহলে কীভাবে বিচার এগোবে। ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিনগোনা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। তবে আদালত দোষীদের যে শাস্তি দিবেন, তাতেই আমি খুশি।

আসিফ বলেন, বাবা হারানোর পর এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার সরকারি অনুদান পাইনি। সিটি করপোরেশন থেকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেটা দেওয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ৬৬ পরিবারের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক চাকরি পেলে বাকিদের খোঁজ-খবর নেওয়া হয়নি। আর সিটি করপোরেশন থেকে যে চাকরি দিয়েছে সেটা হচ্ছে মাস্টার রোলে। সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের কোনো সংস্থার কাছ থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকাও পাইনি। বর্তমান সিটি করপোরেশন মেয়রের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার দেখা করার চেষ্টা করে লাভ হয়নি বলে অভিযোগ করেন আসিফ আহমেদ।

তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া জায়গাটি আগের মতো হয়ে গেছে। সেই বিল্ডিং দেখে চেনার উপায় নেই। নতুন করে অফিস/দোকান হয়েছে। মাঝখান থেকে আমার বাবাকে হারালাম। ৬৬টি পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জন করার হাতিয়ারটা হারালো। সরকার যেন আমাদের এই বিষয়টি একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখেন। তা হলে আমরা একটু ভালো থাকতে পারতাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, মামলার বিচার দ্রুত শেষ হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার একটা দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। তবে সাক্ষীরা সমন পেয়েও ঠিকমত আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার বিচার শেষ হতে বিলম্বিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষের কাজ সাক্ষীদের সমন পাঠানো। সাক্ষীদের হাজির করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের। এখানে উভয়পক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রয়োজনে সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হবে। রাষ্ট্রপক্ষও চায় মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয়, আর ভিকটিমের পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়।

সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারী  পাবলিক প্রসিকিউটর মাজহারুল হক বলেন, বাদী একদিন সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। মাঝে ডিসেম্বর মাসে আদালত বন্ধ ছিল। সাক্ষ্য হয়নি। প্রতি ডেটে সাক্ষীদের আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়। কিন্তু সাক্ষী আদালতে না আসলে কিছু করার নেই। তবে আশা করছি আগামী ধার্য তারিখে সাক্ষী হাজির করে দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হবে। বাদী ন্যায়বিচার পাবেন। 

আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মোস্তফা পাঠান (ফারুক) জানান, মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর মাত্র একজনের জবানবন্দি গ্রহণ হলেও, জেরা এখনো শেষ হয়নি। বর্তমানে এই মামলায় সব আসামিই জামিনে আছেন। ওই ঘটনায় আসামিরাই ভিকটিমাইজড। আসামিরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই ঘটনায় তারা কিভাবে অভিযুক্ত হয় আমার মাথায় আসে না। এখানে আসামিদের কোনো দোষ নেই।

বিচার বিলম্বিত করা প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আরও আন্তরিক হলে মামলার বিচার দ্রুত শেষ হবে। বিচার দেরি হওয়ায় আসামিরাই আর্থিক, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশা করি, মামলার বিচার শেষ হলে, সব আসামিই ন্যায়বিচার পাবেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন নিহত হন। দগ্ধ ও আহত হন অনেকে। এই ঘটনায় আসিফ চকবাজার মডেল থানায় ওই দুই আসামি ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে সোহেল ওরফে শহীদ ও হাসানসহ অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা তাদের ৪র্থ তলা বসতবাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে দাহ্যপদার্থ ক্রয়- বিক্রয়কারীদের নিকট হতে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য নির্মিত ফ্যামিলি বাসাগুলিতে ফ্যামিলি ভাড়া না দিয়ে আগুন লাগিয়ে মানুষের জীবন এবং জানমাল ধ্বংস হতে পারে জেনেও অবৈধ দাহ্য পদার্থ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের ফ্যামিলি বাসাগুলিতে  গোডাইন হিসেবে ভাড়া দেয়।

/এসবি/

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়