ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

বাস ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছে

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০০, ৯ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৮:০৮, ৯ নভেম্বর ২০২১
বাস ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছে

রাজধানীর গণপরিবহনে বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বাড়তি ভাড়ার কারণে বাস স্টাফদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন যাত্রীরা। ক্ষুব্ধ এসব যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে বাসে ভাড়া আদায়ের নামে হরিলুটের মতই মচ্ছব চলছে।

গত ৪ নভেম্বর থেকে দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বেড়েছে। সড়ক পথে তিনদিন এবং নৌপথে দুদিন বন্ধ রাখার পর অবশেষে সরকারিভাবে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর প্রেক্ষিতে সোমবার (৮ নভেম্বর) থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি।

সরকারিভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই ভাড়া বাড়ানো কেবল ডিজেলচালিত বাসের জন্য কার্যকর হবে। রোববার (৭ নভেম্বর) পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় সরকারের তরফ থেকে। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে, পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে উল্টো চিত্র।

মঙ্গলবার (৯ নভেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা গেছে, ডিজেলচালিত বাসের পাশাপাশি সিএনজিচালিত বাসগুলো ভাড়া বাড়িয়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ২ টাকার বেশি পড়ছে। কোথাও কোথাও আবার তা সাড়ে ৩ থেকে ৪ টাকা। অথচ সরকারিভাবে শহরের অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

মিরপুর ১২ নম্বর থেকে বিমানবন্দরের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। এই রুটে চলাচলকারী বাস- বসুমতি, পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহন। এসব বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে ৪০ টাকা। হিসাব মতে এই রুটে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া নিচ্ছে ৩ টাকা ৩৩ পয়সা। অথচ এই রুটে আগে ভাড়া ছিল ৩০ টাকা।

আবার মিরপুর ১২ নম্বর থেকে যমুনা ফিউচার পার্কের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। এই রুটে চলাচলকারী বাস নুরে মক্কা, অছিম পরিবহন নতুনভাবে ভাড়া নিচ্ছে ৩০ টাকা করে। এরা প্রতি কিলোমিটারে নিচ্ছে ৩ টাকা। ভাড়া বাড়ানোর আগে এই রুটের ভাড়া ছিল ২৫ টাকা।

মিরপুরে নিয়মিত যাতায়াতকারী তারেকুল ইসলাম বলেন, লোকাল বাস কিংবা সিটিং বাস যাই বলুন, যে যার মতো করে ভাড়া নিচ্ছে। আমরা জিম্মি হয়ে আছি। আপনি যেখানে যাবেন, তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট ভাড়া দিতে হচ্ছে। রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে চেক পোস্টের দোহাই দিয়ে যাত্রীদের পকেট কাটছে বাস কর্তৃপক্ষ।

মিরপুর ১২ নম্বর থেকে গুলিস্তানের দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। এই পথের ভাড়া ছিল ২৫ টাকা। এখন নতুনভাবে ভাড়া নিচ্ছে ৩৫ টাকা। এই রুটে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া পড়ছে ১ টাকা ৮৪ পয়সা।

একইভাবে মিরপুর ১২ নম্বর থেকে নিউমার্কেটের দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার। এই রুটে ভাড়া ১০ টাকা বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে ৩৬ টাকা। যা আগে ছিল ২৬ টাকা। এই রুটে প্রতি কিলোতে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২ টাকা ৭৬ পয়সা।

অপরদিকে বাড্ডা থেকে কারওয়ান বাজারের এফডিসি মোড়ের দূরত্ব ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার, এই রুটে বর্তমানে ভাড়া নিচ্ছে ২০ টাকা। ফলে প্রতি কিলোতে ভাড়া পড়ছে ৩ টাকা ২২ পয়সা। আগে এই রুটে বাস ভাড়া ছিল ১৫ টাকা।

আরেক রুট আগারগাঁও থেকে মহাখালী। দূরত্ব ৬ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। যার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। এখানে প্রতি ভাড়া পড়ছে ৩ টাকা ৬৭ পয়সা। এই রুটের আগের ভাড়া ছিল ২০ টাকা।

তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে গুলিস্তান ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার রাস্তার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। প্রতি কিলোতে বর্তমানে ভাড়া নিচ্ছে ৪ টাকা ১৬ পয়সা। আবার একই বাস খিলক্ষেত থেকে গুলিস্তান ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য ভাড়া নিচ্ছে ৪০ টাকা। এখানে আবার কিলোপ্রতি ভাড়া পড়ছে ২ টাকা ৭৫ পয়সা।

ঢাকার পাশের জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি বাস চলাচল করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ। এই রুটে যাত্রী বহনকারী বাসের মধ্যে উৎসব ও বন্ধন অন্যতম। এই দুটি বাসে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ১৫ কিলোমিটার দূরত্বের আগে ভাড়া ছিল ৩৬ টাকা। কিলোপ্রতি ২.৪ টাকা। বর্তমানে ১৪ টাকা বাড়িয়ে তারা নিচ্ছে ৫০ টাকা। অর্থাৎ কিলোপ্রতি ৩.৩৩ টাকা। অন্যদিকে সরকার নিয়ন্ত্রিত বিআরটিসি ডাবল ডেকার বাসের ভাড়া ছিল ৩০ টাকা। কিলোপ্রতি ২ টাকা। বর্তমানে তারা ১০ টাকা বাড়িয়ে নিচ্ছে ৪০ টাকা। অর্থাৎ কিলোপ্রতি ২.৬৬ টাকা।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা বিষয়ে বলাকা, শিকড়, অছিম, বসুমতি, মক্কা, প্রজাপতিসহ বিভিন্ন বাসের চালক ও হেল্পারদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের সবাই প্রায় একই কথা বলেছে, 'মালিক আমাদের যেভাবে ভাড়া নিতে বলেছে আমরা সেভাবেই নিচ্ছি। চার্টে কী আছে, কিলোতে কত টাকা সেসব আমাদের জানা নেই।'

বিভিন্ন রুটের বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, 'রাজধানীতে চলাচলকারী গণপরিবহনের বড় একটা অংশ সিএনজিতে চলে। অথচ তারা ডিজেলের মূল্য বাড়ানোর সুযোগে বেশি ভাড়া আদায় করছে। আবার যদি গ্যাসের দাম বাড়ে, তখনো এরা ভাড়া বাড়াবে। বাস মালিক ও শ্রমিকদের কাছে প্রশাসন জিম্মি। গণপরিবহনের এসব অনিয়ম রোধে বা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ কেবল চটকদার বক্তৃতা ও বিবৃতির মধ্যেই থাকেন। ভাড়া বাড়িয়ে কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থবিরোধী ভূমিকায় অবস্থান নিয়েছে।'

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, 'বাস ভাড়া বাড়ানোর আগে যে আলোচনা হয়েছে, সে আলোচনায় আমাদের কোনো প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। ভাড়া বাড়ানোর আগে শহরের মধ্যে কতগুলো বাস গ্যাসে চলে, আর কত বাস ডিজেলে চলে তার হিসাব বের করা দরকার ছিল। তা না করে ১ টাকা ৪২ পয়সার ভাড়া বাড়িয়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। সঠিক হিসাব-নিকাশ করলে নতুন ভাড়া বড়জোর ১ টাকা ৬০ পয়সা করা যেত। তা না করায় সব বাস মালিকরাই এই সুযোগটা নিয়েছে।'

উল্লেখ্য, বাস মালিকদের দাবির প্রেক্ষিতে দূরপাল্লায় বর্তমান বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে।

আর রাজধানীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ১৫ পয়সা করা হয়েছে। মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৬০ পয়সার স্থলে ২ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দূরপাল্লার বাস ভাড়া ২৭ শতাংশ আর রাজধানীতে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভাড়া সরকারিভাবে বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়