দুবাই বসে টিপু হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
বহুল আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর জাহিদুল ইসলাম টিপু ও কলেজছাত্রী সামিয়া আফরান প্রীতি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারীসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
শনিবার (২ এপ্রিল) র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- ওমর ফারুক, আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ, মো. নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির এবং মো. মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশ।
খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই ছায়া-তদন্ত শুরু করে র্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার রাতে রাজধানীর মুগদা, শাহজাহানপুর ও মিরপুর এলাকা থেকে ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ওমর ফারুক, আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ, মো. নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির এবং মো. মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, নগদ টাকা ও মোবাইলসহ অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।’
দীর্ঘদিন ধরে টিপু ও হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে বিরোধ ছিল উল্লেখ করে খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘মতিঝিল এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, স্কুল-কলেজের ভর্তি বাণিজ্য, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল। এ ছাড়া এলাকার আধিপত্য বিস্তারসহ মামলা সংক্রান্ত বিষয়েও টিপুর সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃতদের দ্বন্দ্ব ছিল। আর এসব কেন্দ্র করেই তাকে হত্যা করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে রাজধানীর গুলশান শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে মিল্কী হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। এ ঘটনার সঙ্গে টিপু জড়িত ছিলেন বলে গ্রেপ্তারকৃতরা সন্দেহ করতেন। তখন মিল্কী হত্যায় যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল সেখানে এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন টিপু। কিন্তু বিচারিক কার্যক্রমে তার (টিপু) নাম বাদ পড়ে।’
‘পরবর্তীতে গ্রেপ্তারকৃতরা টিপুর অন্যতম সহযোগী রিজভী হাসানকে হত্যা করে। মামলাটি বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তাদের ধারণা, টিপুর কারণেই রিজভী হাসান হত্যাকাণ্ড মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়েছে। মামলার বাদীর (রিজভীর বাবা আবুল কালাম) সাথে গ্রেপ্তারকৃতরা ৫০ লাখ টাকায় বিষয়টি মিমাংসার চেষ্টা করে। কিন্তু টিপুর কারণে তা সম্ভব হয়নি। কারণ টিপু সবসময় কালামকে সঙ্গে নিয়ে চলতো। একপর্যায়ে তারা কালামকেই হত্যার পরিকল্পনা করে, তবে সেটাও সম্ভব হয়নি।’
‘কালামের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর গ্রেপ্তারকৃতরা টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করে, যাতে মামলা পরিচালনা ধীরগতি করা যায়। তাদের ধারণা ছিল, কালাম একা মামলাটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে না।’
র্যাব জানায়, রিজভী হাসান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সাক্ষী গ্রেপ্তারকৃত মো. মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশকে তারা টাকার বিনিময়ে সাক্ষ্য প্রদানে বিরত থাকতে বলে। সেই প্রস্তাবে মোরশেদুল আলম রাজী থাকলেও টিপুর কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে মোরশেদুল তাদের সাথে যুক্ত হয়ে টিপুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়।
‘মোরশেদুল আলম হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য ওমর ফারুক ও মুসাকে (রিজভী হাসান হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভূক্ত ৩ নম্বর আসামি) ফোনে কয়েকজন সন্ত্রাসীর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন। হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সমন্বয়ের জন্য মুসা গত ১২ মার্চ দুবাই যায়। সেখানেই চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। হত্যাকাণ্ড দেশে সংগঠিত হলেও নিয়ন্ত্রণ করা হয় দুবাই থেকে। দেশ থেকে নাছির উদ্দিন, মোরশেদুল আলম পলাশসহ আরো কয়েকজন টিপুর অবস্থান সম্পর্কে মুসার কাছে তথ্য পাঠাতো। ঘটনার দিন নাছির উদ্দিন চার বার টিপুর অবস্থান সম্পর্কে মুসাকে অবহিত করে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, টিপু গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় পলাশ তাকে নজরদারিতে রাখেন এবং তার অবস্থান সম্পর্কে ফ্রিডম মানিককে জানান। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে টিপুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। টিপুকে হত্যার জন্য ১৫ লাখ টাকা বাজেট করেন পরিকল্পনাকারীরা। মুসার ওপর দায়িত্ব আসে টিপুকে হত্যার। দুবাই বসে তিনি কিলার নিয়োগ করা থেকে শুরু করে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় দুষ্কৃতিকারীর গুলিতে জাহিদুল ইসলাম টিপু নিহত হন। এসময় টিপুর গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী প্রীতিও মারা যান। ওই ঘটনায় টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি শাহজাহানপুর থানায় একটি মামলা করেন।
মাকসুদ/কেআই