ঢাকা     রোববার   ২৬ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১২ ১৪২৯ ||  ২৫ জিলক্বদ ১৪৪৩

রমজানের জাকাত কেন চ্যারিটি বা ট্যাক্স নয়

এম এল গনি, কানাডা থেকে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০২, ১৫ এপ্রিল ২০২২   আপডেট: ১৭:০৭, ১৫ এপ্রিল ২০২২
রমজানের জাকাত কেন চ্যারিটি বা ট্যাক্স নয়

ফাইল ছবি

চ্যারিটি শব্দের বাংলা অর্থ, দান বা দানশীলতা। অক্সফোর্ড ডিকশনারি চ্যারিটিকে সজ্ঞায়িত করছে এভাবে: 'the voluntary giving of help, typically in the form of money, to those in need.' অর্থাৎ, ‘যাঁরা অভাবগ্রস্ত, তাঁদের স্বেচ্ছায় (সচরাচর) অর্থ সহায়তা প্রদান করা হলো চ্যারিটি।’ 

চ্যারিটি বিষয়টির সাথে ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ শব্দের উপস্থিতি এ ধারণাই পরিষ্কার করে যে, একজন বিত্তশালী মানুষ তাঁর ইচ্ছা হলে চ্যারিটি বা দানশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেন, বা নাও করতে পারেন। এটা পরিপূর্ণভাবে তাঁর ইচ্ছাধীন। এই দান কখন, কাকে, কীভাবে দিতে হবে তাও দাতার ইচ্ছাধীন। চ্যারিটি খেয়ালখুশি মতো যাকে খুশি দেয়া যায়। কিন্তু, রমজানের জাকাত প্রদানের প্রক্রিয়া ভিন্ন। এ বিষয়ে ইসলাম ধর্মে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। যেমন খুশি তেমনভাবে জাকাত দেওয়া যায় না। 

একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা মুসলমান একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের আর্থিক অবস্থা অতিক্রম করলে তাঁর জন্য জাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। এই যে ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা বা স্তর, তার নাম নিসাব (ইংরেজিতে, থ্রেশহোল্ড)। স্বর্ণ এবং রৌপ্য দুটি মান নিসাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

যদি আপনার কাছে টাকা, স্বর্ণ, রৌপ্য, স্টক বা শেয়ার থাকে, যার মূল্যমান ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ বা ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য-এর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে আপনি যাকাত দিতে বাধ্য। কোনো মুসলমান যদি একটি পূর্ণ চন্দ্র বছরের জন্য এই পরিমাণ সম্পদ বা অর্থের মালিক হন, তবে তাঁর জাকাত ১২টি চন্দ্র মাসের শেষে দিতে হয়। জাকাতের হার আড়াই শতাংশ। 

একজন মুসলমান চাইলে অতীতের অপরিশোধিত জাকাতও বর্তমান সময়ে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে, ওই সময়কালে প্রতি রমজানে তিনি কত সম্পদের মালিক ছিলেন তা খুঁজে বের করতে হবে এবং এর আড়াই শতাংশ জাকাত প্রদান করতে হবে।

জাকাত গ্রহণের ক্ষেত্রে কারা উপযুক্ত, সে বিষয়টিও ইসলাম পরিষ্কার করে দিয়েছে। জাকাত প্রদানের আগে যা আমাদের অবশ্যই জেনে নেওয়া উচিত। এছাড়া, জাকাতকে যেন আমরা ট্যাক্স বা করের সাথে গুলিয়ে না ফেলি। সরকারকে যথানিয়মে ট্যাক্স বা কর না দিলে দেশের আইন ভঙ্গ করা হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। তবে, এর সাথে সওয়াব-গুনাহর বিষয় জড়িত নয়। 
অপরদিকে, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জাকাত যথানিয়মে না দিলে একজন মুসলমানের গুনাহ হয়। কেননা, নিসাব-এর অধিক আর্থিক অবস্থা অর্জন হলে একজন মুসলমান জাকাত দিতে বাধ্য। বিষয়টির গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কোরআন-এর বিভিন্ন সূরায়ও বারবার জাকাত প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হয়েছে। 

জাকাতকে কোনোভাবেই গরিবদের প্রতি ধনীদের অনুগ্রহ বা করুনা প্রকাশ হিসেবে গণ্য করা যায় না। এটা বরং ধনীদের সম্পদের ওপর গরিবের অধিকার বা হক। কোন অর্থেই এটি স্রেফ দাতব্য কর্মকাণ্ড বা চ্যারিটি নয়। জাকাত প্রদান না করার অর্থ গরিবদের ন্যায্য প্রাপ্য হতে বঞ্চিত করা। যে ব্যক্তি যাকাত দেন তিনি প্রকৃতপক্ষে তাঁর আহরিত সম্পদ থেকে দরিদ্রদের অংশ আলাদা করে নিজের বাকি অংশকে পরিশুদ্ধ করেন। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম জাকাত। আরেকটু বিশদভাবে বললে বলা যায়, ঈমানের পর নামাজ এবং তার পরই জাকাতের অবস্থান।

যাকাত ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভই শুধু নয়, এটি বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের অর্থ-কষ্ট লাঘবের একটি বৈপ্লবিক ধারণাও। জাকাত হলো সমাজের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর কাছে সম্পদ পুনঃসঞ্চালনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। বিত্তশালীরা যে যার জাকাত যথাযথ নিয়মে আর্থিক দুর্দশাগ্রস্তদের সঙ্গে সহভাগ করলে সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি বলে কিছু থাকে না। 

উল্লেখ্য, ইসলাম ধর্ম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে। কারণ, ভিক্ষাবৃত্তি মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ তথা, মানুষ হিসেবে তার শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট করে দেয়। তাই জাকাত গ্রহণকারীর আত্মসম্মানে কোনোপ্রকার আঁচড় না লাগে তেমন পরিবেশে জাকাত দিতে হয়। ধনীদের সম্পদের ওপর গরিবের হক কোনো করুনার বিষয় নয়, এটি তাঁদের অধিকার। অথচ, আজকের দিনে ফেসবুকে চোখ বুলালেই দেখা যায়, একজন হতদরিদ্রকে সামান্য দামের একটি শাড়ি বা লুঙ্গি দিতেও ওই ব্যক্তির দুই পাশ হতে বিপুল সংখ্যক ‘দাতার দল’ একে অন্যের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দৃষ্টিকটু এক মানব শেকল তৈরি করেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের লোক দেখানো মানবসেবা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। এতে সাময়িক লোক দেখানো বাহবা পেলেও ধর্মীয় বিবেচনায় সওয়াব অর্জনের অবকাশ থাকে না।

জাকাত প্রদানে চলমান দৈন্যদশার চিত্র ও এ রুগ্ন পরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা এ লেখায় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 

২০১৪ সালের একটি দুঃখজনক ঘটনা এ প্রসঙ্গে আলোচনায় আনা যায়। মানিকগঞ্জে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে ঘটনাস্থলেই পদদলিত হয়ে মারা যান দুই বৃদ্ধা। গুরুতর আহত হন অনেকেই। মানিকগঞ্জে শহরের গার্লস স্কুল রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দেশের এক ধনাঢ্য পরিবারের পক্ষ হতে সেদিন সকালে দরিদ্রদের মাঝে জাকাতের কাপড় বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। খবর পেয়ে আগের রাত থেকে শহরের গার্লস স্কুল রোডে অবস্থিত সেই শিল্পপতির বাসার সামনে ভিড় করেন অনেক নারী-পুরুষ। ভোর চারটার দিকে বাসার মূল ফটক খুলে দিলে হুড়োহুড়ি করে সবাই একসাথে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এসময় ভিড়ের মধ্যে ওই দুই বৃদ্ধা পদদলিত হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণত্যাগ করেন। আহত হন অনেকেই।

অথচ, যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে জাকাত বিতরণের ব্যবস্থা নিলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। দাতা পরিবারটি চাইলে আগে থেকে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কীভাবে গরিবদের মাঝে জাকাতের কাপড় ও অন্যান্য দ্রব্য ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশে বিতরণ করা যায় তার পরিকল্পনা করতে পারতেন। বাংলাদেশের মতো দেশে হাজারো দরিদ্রকে এক সাথে দরজা খুলে দিলে এমনটি যে ঘটতে পারে তা অনুমান করতে খুব বেশি মেধা বা প্রজ্ঞা দরকার হয় না। জাকাত প্রদানের অজুহাতে দুটি মূল্যবান প্রাণহানিসহ অসংখ্য হতাহতের সে মর্মান্তিক ঘটনায় ওই প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে সরকারের প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা তা আর জানা যায়নি। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্মুখেরা বলে থাকেন, কোন পরিবারের জাকাত বিতরণে কতজন আহত বা নিহত হলেন তা নাকি ওই পরিবারের বড়লোকি মাপের একপ্রকার মাপকাঠি। এভাবে, সাধারণের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির কোটিপতির এমন করুন উপহাস সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। 

এমনও দেখা গেছে, জাকাতের মালামাল আছে বড়োজোর ২০০ মানুষের। অথচ, মাইকে ঘোষণা দিয়ে জড়ো করা হয়েছে হাজারো মানুষ। বেশি মানুষ জড়ো করতে না পারলে যেন জাকাত দাতার আত্মসম্মানে লাগে। এমনই অবস্থা। জাকাতের কাপড়-সামগ্রী বিতরণের নামে মাইকিংয়ের মাধ্যমে লোক জড়ো করে নিজেকে জাহির করার মাঝে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পান অনেকে। অথচ, ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, ‘দান করতে হবে এমনভাবে যাতে ডান হাত দিয়ে দান করলে বাম হাত তা না জানে।’ আমাদের সমাজের বাস্তবতা একেবারেই বিপরীত। অনেকে জাকাতের দানদক্ষিণার ছবি কেবল ফেসবুকে নয়, পরবর্তীতে নির্বাচনে পর্যন্ত কাজে লাগান। 

কোভিড মহামারীর কারণে কিছু কোটিপতি গজানোর পাশাপাশি অতি দরিদ্র মানুষের পয়দাও হয়েছে বিস্তর। এ কারণে, অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে জাকাত গ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। তাই, জাকাতের অর্থ বা দ্রব্যসামগ্রী বিতরণে আগে থেকেই যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ২০১৪ সালের ঘটনার চেয়েও মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে, যারা বড়ো আকারে জাকাত প্রদানের ব্যবস্থা নেবেন তাঁদের বাধ্য করতে হবে জাকাত গ্রহীতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে। তারা এ কাজে প্রয়োজনে পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় বসে জাকাত বিতরণের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারেন।

মাইকে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে কেউ জাকাত বিতরণের ব্যবস্থা নিলে তিনি বা তারা ঠিক কতজনকে সহায়তা দেবেন তাও যেন ঘোষণাকালে মানুষকে জানিয়ে দেন। অন্যথায়, অহেতুক মাত্রাতিরিক্ত জনসমাগম ঘটে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। বয়োবৃদ্ধ বা শিশুদের ক্ষেত্রে কীভাবে জাকাত বণ্টনপ্রক্রিয়া সহজতর ও সহজলভ্য করা যায় তাও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখতে হবে। নিজ দায়িত্বে জাকাত কর্মকান্ড পরিচালনা করায় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায়দায়িত্ব জাকাত দাতাকেই নিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে জাকাত দাতাকে বাধ্য করতে হবে। সার্বিক বিষয়ে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে জাকাত কর্মকাণ্ড পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান অব্যবস্থা ও অনিয়ম এর অবসান ঘটাবে এমন প্রত্যাশা রইলো। 

লেখক : এম এল গনি, আরসিআইসি 
কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ও কলামনিস্ট।

ঢাকা/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়