সংসদে রুমিন ফারহানা
তেলের সংকট নেই, তাহলে ৩ কিলোমিটার লাইন কেন
দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই, সরকারের এমন দাবির বিপরীতে মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, পাম্পে সীমিত সরবরাহ এবং গ্রাহকের ভোগান্তি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা নিয়ে। জাতীয় সংসদে এই ইস্যুতে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রকৃত পরিস্থিতি প্রকাশের দাবি জানান। এ সময় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ অধিবেশন।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। গত বছরের মার্চ মাসের সমপরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে চলতি মার্চ মাসে। তবে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।"
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে তিনি আরো বলেন, “একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে তেল মজুদ করছে। এর সঙ্গে জনমনে ভীতি এবং অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।”
প্রশ্নোত্তর পর্বে নেত্রকোণা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা অভিযোগ করেন, সরকারিভাবে সংকট নেই বলা হলেও বাস্তবে পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। মোটরসাইকেলে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে পুনরায় তেল নেওয়া ঠেকানোর ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে জবাবে মন্ত্রী বলেন, “মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়ার বা রং দিয়ে চিহ্নিত করার বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই।”
সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি জানান, কৃত্রিম সংকট নিরসনে সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছে। অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, এ পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় এবং ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরো জানান, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় মজুদ না করার জন্য সচেতন করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল কার্ড’ চালু করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকের জ্বালানি সংগ্রহের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে এবং সফল হলে তা সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
একই অধিবেশনে ৭১ বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে রাস্তায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক ড্রাইভার মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। যদি সংকট না থাকে, তাহলে এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা কী?”
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “সংকট না থাকলে কেন বারবার দাম বাড়ানো হচ্ছে, তা জনগণ জানতে চায়।”
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “মার্কেট রাত ৮টার পরিবর্তে ৭টায় বন্ধের সিদ্ধান্ত অদূরদর্শী। সাধারণ মানুষ মূলত সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করে। অফিস-আদালতের সময়সূচি পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।”
সরকারের দেওয়া তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রুমিন ফারহানা। তিনি সংসদের মাধ্যমে জানতে চান, বর্তমানে দেশে অকটেন ও ডিজেলের প্রকৃত মজুদ কত দিনের, পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ কেন নেই এবং কারা এই মজুদদারির সঙ্গে জড়িত?
তার বক্তব্য চলাকালে সরকারদলীয় সদস্যদের মধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। এ সময় তারা নানা অঙ্গভঙ্গি করতে থাকেন। হট্টগোলের মধ্যেই বক্তব্য চালিয়ে যান রুমিন ফারহানা, তবে শেষ হওয়ার আগেই তার মাইক বন্ধ হয়ে যায়।
পরে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান বিষয়টির নিন্দা জানিয়ে বলেন, “সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের সময় ট্রেজারি বেঞ্চের কিছু সদস্যের আচরণ দুঃখজনক। এমন অশালীন অঙ্গভঙ্গি সংসদের পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।” ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা/এএএম/রফিক