অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখতে পুলিশের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের অপরাধী হিসেবেই দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সরকারের আপসহীন অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় আপনাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয়। আমি আজ পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, কারো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করবেন না। যে অপরাধ করবে, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করবেন। আইনের প্রয়োগ সবার জন্যই সমান। আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে।”
সোমবার (১১ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের সঙ্গে কোনো আপস করতে চায় না।”
তিনি বলেন, “এ মুহূর্তে সারা দেশের মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুলিশ সরাসরি ভূমিকা রাখছে। তাই পুলিশ সদস্যরা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালনে সক্ষমতার পরিচয় দিলে বর্তমান সরকারও নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।”
প্রযুক্তির কারণে অপরাধের ধরন বেড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেহেতু অপরাধের ধরন পরিবর্তন হয়েছে, ফলে পুলিশ প্রশাসনের কার্যক্রমের পরিধিও ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে পুলিশি কার্যক্রম এখন আর কয়েক দশক আগের মতো শহর নগর কিংবা জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”
তিনি আরো বলেন, “বর্তমানে ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম’ বৈশ্বিক বাস্তবতা। এ কারণে বিশেষ করে আমাদের প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে বহুমুখীভাবে দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। এটি এখন সময়ের দাবি। এমন বাস্তবতায় পুলিশ প্রশাসনে নির্দিষ্ট কিছু পদ নয়, প্রতিটি পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং প্রশাসনের সকল পদেই কাজ করার পেশাদারি মানসিকতা থাকা জরুরি।”
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শুধু পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হয়তো সাময়িক তুষ্টি লাভ করেন, তবে সেটি পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করা হয়। সুতরাং আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, পুলিশ প্রশাসনে আপনাদের ওপর যার যেখানে দায়িত্বভার অর্পিত হয়, সেই কাজটি গুরুত্বসহকারে পালন করবেন। তাহলেই আমরা একটি দক্ষ গতিশীল এবং পেশাদার পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।”
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই সরকার পাঁচ বছরের জন্য। একইভাবে জনপ্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের কোনো পদও কারো জন্য চিরস্থায়ী নয়। এ কারণে আমি আজকের এই সভাটিকে কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এই সভাটি হয়ে উঠুক দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আগামী দিনের পথনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের মুহূর্ত।”
পুলিশ বাহিনীর কল্যাণেও সরকার কাজ করে যাবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের মূলনীতি। আমরা জানি, পুলিশের দায়িত্ব কখনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।”
একটি সরকারের সাফল্যের জন্য দক্ষ, সাহসী, সৎ ও নিরপেক্ষ পুলিশ প্রশাসনের বিকল্প নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিপদে পড়লে মানুষ কিন্তু প্রথমে পুলিশের কাছেই যায়। আমি বিশ্বাস করি, পুলিশ আন্তরিকভাবে চাইলে আইনি এবং কৌশলী ভূমিকা নিয়ে অনেক ঘটনা শুরুতেই নিষ্পত্তি করতে পারে।”
চব্বিশের ৫ আগস্ট–পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, “গত দেড় বছরে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতি পুলিশ কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।”
সরকার পুলিশকে সত্যিকারের জনবান্ধব বাহিনীতে রূপ দিতে চায় জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “এ সরকার এমন একটি পুলিশ প্রশাসন চায়, যেটি হবে জনবান্ধব ও জনগণের আস্থাভাজন। কারণ, যেকোনো দেশেই জনগণ সাধারণত পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের আয়না হিসেবেই বিবেচনা করে। সুতরাং পুলিশ প্রশাসন সফল হলে সেটি কার্যত সরকারের সফলতা হিসেবেও বিবেচিত হয়।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। অন্য সকল কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও আপনাদের পুলিশি কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়। এটিও আপনাদের দায়িত্বের একটি অংশ। বর্তমান সরকার অবশ্যই জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত রাখতে চায়। তবে কেউ যেন সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কিংবা কোনো রকমের নাশকতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হতে না পারে, এটিও আমাদের সকলকে লক্ষ রাখতে হবে।”
দল-মতনির্বিশেষে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যেক মানুষকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের উদ্দেশ্য—এ কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ সদস্যদের সবার আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। এজন্য তাদের যেখানে যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতে হবে।”
সরকারকে জনগণ কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার অনেকটাই পুলিশের আচরণ ও কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “রাষ্ট্র পুলিশের কাছে সততা, দক্ষতা, সেবা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাদারত্ব ও মানবিকতা প্রত্যাশা করে।”
তিনি বলেন, “আপনারা যদি এসব গুণ যথাসম্ভব ধারণ করতে পারেন, তাহলে ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’-এই স্লোগানটি সত্যিকার অর্থে সফল ও সার্থক হবে। আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশ, জাতি ও মানুষের জন্য যতটুকু সম্ভব ছাড় দিয়ে সামনে এগিয়ে যাই।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম আউলাদ হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এ সময় পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ সব সময় সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তারা।
অনুষ্ঠানে পুলিশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা/নজরুল/সাইফ
লাইফ সাপোর্টে অভিনেতা আতাউর রহমান