ঢাকা     শুক্রবার   ১২ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৯ ১৪৩৩ || ২৭ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

নয়াদিল্লিতে সম্মেলন: যেসব বিষয়ে একমত বিজিবি–বিএসএফ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৩৫, ১২ জুন ২০২৬  
নয়াদিল্লিতে সম্মেলন: যেসব বিষয়ে একমত বিজিবি–বিএসএফ

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানীতে নয়াদিল্লিতে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আরো পড়ুন:

এই সম্মেলনে সীমান্তে হত্যা, পুশইন এবং ভারতীয় গণমাধ্যম প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সংক্রান্ত উদ্বেগসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

শুক্রবার (১২ জুন) বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলামের স্বাক্ষর করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে জানানো হয়, নয়াদিল্লিতে সোমবার (৮ জুন) থেকে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) পর্যন্ত চার দিনব্যাপী ৫৭তম বিজিবি–বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে। সম্মেলনে বিজিবির ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদফতর, যৌথ নদী কমিশন এবং অন্যান্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করেন।

অপরদিকে, ভারতের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।

সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরা হয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। সেগুলো হলো-

সীমান্তে হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধ
সম্মেলন চলাকালে বিজিবির মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা প্রাণঘাতী ও অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে নিরস্ত্র ও নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ উল্লেখ করে সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য বিএসএফ মহাপরিচালককে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

তিনি সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং কঠোর জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে এসব বিষয় আন্তরিক, সৎ ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রচলিত আইন অনুসরণ করে এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হয়ে সমাধান করা যেতে পারে। উভয়পক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, যৌথ টহল বৃদ্ধি, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে সম্মত হয়, যাতে অনুপ্রবেশ, সীমান্ত হত্যা ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা যায়।

তারা আরো সম্মত হন, নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনাগুলো তদন্ত করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুশইনের ঘটনা
রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিকসহ ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পুশইন ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিজিবির মহাপরিচালক, যা সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, পূর্ববর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত পারস্পরিক সিদ্ধান্তগুলো এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি ও প্রটোকলের পরিপন্থি।

তিনি উল্লেখ করেন, সীমান্তে এসব পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের দুর্ভোগ অত্যন্ত ব্যাপক। তাদের অনেকেই চরম দুর্দশায় রয়েছেন। কেউ কেউ ক্ষুধা ও রোগে আক্রান্ত এবং প্রবীণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন যারা জরুরি চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন। বিজিবির মহাপরিচালক পুনর্ব্যক্ত করেন, যেকোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হন, তবে তাকে প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত গ্রহণ করা হবে, প্রচলিত আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

তিনি বিএসএফ মহাপরিচালককে এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার এবং বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া ও প্রটোকল অনুসরণ করার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সব অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাইকরণ বিষয় দ্রুত সম্পন্ন করার এবং তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

উভয়পক্ষই সম্মত হয়, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতি ও বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তারা পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের চেতনায় এসব প্রক্রিয়ার কার্যকর বাস্তবায়নে তাদের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও চোরাচালান
বিজিবির মহাপরিচালক ভারত থেকে বাংলাদেশে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের চোরাচালান বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মাদক বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির উল্লেখ করে এটিকে উভয় দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে ব্যক্ত করেন।

তিনি সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য অবৈধ পণ্যের ক্রমবর্ধমান চোরাচালানের বিষয়টিও তুলে ধরেন এবং বলেন যে এসব কার্যক্রম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিজিবির মহাপরিচালক মাদক পাচার রোধে উভয় দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক মহাপরিচালকদের নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেন। বিএসএফ মহাপরিচালক জানান, ভারত সরকার মাদক, নেশাজাতীয় দ্রব্য এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এবং সব ধরনের চোরাচালান রোধে অঙ্গীকারবদ্ধ।

উভয়পক্ষই মাদকবিরোধী কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং গবাদিপশু চোরাচালান প্রতিরোধের বিষয়েও একমত হয়। তারা সমন্বিত সিমালটেনিয়াস কো-অর্ডিনেটেড পেট্রোল জোরদার করা এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে বাস্তবসম্মত তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মত হন।

অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার ও রোহিঙ্গা বিষয়
বাংলাদেশি নাগরিকদের অবৈধ অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা অবৈধ অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশ সংক্রান্ত বিএসএফ মহাপরিচালকের উদ্বেগের জবাবে বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সুপরিচিত এবং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্বেগের বিষয়।”

তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিকদের তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতে অবৈধভাবে চলাচলের অনুমতি দেয় না।”

তিনি আরো বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করা রোহিঙ্গাদের বিজিবি সীমান্ত বাহিনী আটক করেছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, “রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং বাংলাদেশ কেবল মানবিক কারণে কঠোর তত্ত্বাবধানে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। উভয়পক্ষই অবৈধ আন্তঃসীমান্ত চলাচল প্রতিরোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সম্মত হন। তারা মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের সময় মতো উদ্ধার, পুনর্বাসন ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হন।”

সীমান্ত বেড়া ও অবকাঠামো
বিএসএফ মহাপরিচালকের সীমান্ত বেড়া ও সিকিউরিটি রিলেটেড ওয়ার্কস সংক্রান্ত বিষয়ে জবাব দিতে গিয়ে বিজিবির মহাপরিচালক বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে পাঠানো নোট ভারবালের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন,“নির্মিত এআরএফ প্যাচগুলোতে বেশ কিছু বিচ্যুতি লক্ষ্য করা হয়েছে। মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনার সময় ৩৯টি ক্ষেত্রে বিএসএফ বা ভারতীয় নাগরিকরা ১৫০ গজ আন্তর্জাতিক সীমার মধ্যে অননুমোদিতভাবে এআরএফ বা গবাদিপশু বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করেছে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো এআরএফ বা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেয়া আবশ্যক।”

বিজিবির মহাপরিচালক সংশ্লিষ্ট নোট ভারবালে উল্লিখিত বিচ্যুতিগুলো সমাধান ও সংশোধনের আহ্বান জানান। তিনি গত ৮ জুন ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনে পাঠানো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নোট ভারবালের কথাও উল্লেখ করেন এবং এতে উল্লিখিত নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের অনুরোধ জানান।

তিনি আরো প্রস্তাব করেন, এআরএফ সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ সব নির্মাণ কার্যক্রম কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনা করা উচিত।

জাল মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান
বিএসএফ মহাপরিচালকের সীমান্ত পারাপারে জাল ভারতীয় মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান সংক্রান্ত উদ্বেগের জবাবে বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, “এফআইসিএন ও স্বর্ণ চোরাচালান উভয় দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।”

তিনি জানান, বিজিবি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন ইন্টিগ্রেটেড চেক পোস্ট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জাল মুদ্রা শনাক্তকরণ যন্ত্র স্থাপন করেছে এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে।

উভয়পক্ষই আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্র সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা এবং এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধে জড়িত কার্টেল ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সম্মত হয়।

পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম
বিজিবি মহাপরিচালক ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন।

জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক জানান, ভারত সরকার জাতীয়তা নির্বিশেষে সব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এবং নিজেদের ভূখণ্ড এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। উভয়পক্ষ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিজ নিজ ভূখণ্ডে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করতে না দেওয়া, সতর্কতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়।

সীমান্ত নির্ধারণ ও সীমান্ত পিলার সংক্রান্ত সহযোগিতা
বিজিবির মহাপরিচালক মুহুরী চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং উল্লেখ করেন যে যৌথ জরিপ ও পরিদর্শনের মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারণ এরই মধ্যে পারস্পরিকভাবে সম্মত ও চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি অনিশ্চয়তা এড়ানো এবং কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান অস্থায়ী চিহ্নগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব স্থায়ী সীমান্ত পিলার দ্বারা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিজিবির মহাপরিচালক কুষ্টিয়াসহ অন্যান্য সেক্টরে অনুপস্থিত সীমান্ত পিলার নির্মাণ ও পুনঃস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন এবং বিশেষ করে নদীভিত্তিক এলাকায় আন্তর্জাতিক সীমান্তের অবশিষ্ট অনির্ধারিত অংশগুলোর দ্রুত নির্ধারণের আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে তিনি দুই দেশের ভূমি জরিপ কর্তৃপক্ষের মধ্যে বর্ধিত সহযোগিতার প্রস্তাব দেন, যাতে বকেয়া সীমান্ত নির্ধারণ বিষয়গুলো সমাধান করা যায় এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী হয়। উভয়পক্ষই সম্মত হয় যে সীমান্ত নির্ধারণ ও সীমান্ত পিলার সংক্রান্ত বিষয়সমূহ যৌথ সীমান্ত সম্মেলন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অব্যাহতভাবে সমাধান করা হবে। তারা আরো সম্মত হয় যে নদীভিত্তিক ও অন্যান্য সংবেদনশীল এলাকাসহ বকেয়া সীমান্ত নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমিক ও সহযোগিতামূলকভাবে সমাধান করা উচিত।

সীমান্তবর্তী নদীর পানি ব্যবহার ও তীর সংরক্ষণ
বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০২২ সালের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী উভয় দেশ শুষ্ক মৌসুমে কুশিয়ারা নদীর অভিন্ন অংশ থেকে প্রতিটি পক্ষ সর্বোচ্চ ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলনে সম্মত হয়েছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, “পানি গ্রহণের ইনটেক চ্যানেল (রহিমপুর খাল) খননের জন্য সম্মতি দিতে বিলম্বের কারণে বাংলাদেশের ন্যায্য পানি প্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে।”

তিনি আরো বলেন, “একাধিক পাম্পের মাধ্যমে একতরফা পানি উত্তোলন সংক্রান্ত উদ্বেগ বিদ্যমান, যা জরুরি ভিত্তিতে সমাধান প্রয়োজন। তিনি যৌথ নদী কমিশনের আওতায় পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা এবং যৌথ মনিটরিং টিমের পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করেন এবং জানান, প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির সেচ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

তিনি রহিমপুর খালের অবশিষ্ট খনন কাজ দ্রুত সম্পন্নের জন্য সম্মতি দেওয়ার আহ্বান জানান এবং অননুমোদিত পানি উত্তোলনের বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ করেন।

নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম প্রসঙ্গে বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, “কুশিয়ারা ও কুলিক নদীসহ কয়েকটি অনুমোদিত প্রকল্প পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত পর্যায়ের সমঝোতা থাকা সত্ত্বেও আপত্তির কারণে বিলম্বিত হয়েছে।”

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “বিভিন্ন সীমান্ত জেলায় বন্যা ও ভাঙন প্রতিরোধে ১৭টি জরুরি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের সম্মতির বিষয়টি এখনো বাকি রয়েছে এবং দ্রুত সহযোগিতার মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।”

উভয়পক্ষই সম্মত হয় যে কুশিয়ারা নদী থেকে পানি উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সংক্রান্ত বিষয়সমূহ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ সমঝোতা স্মারকের আওতায় গঠিত যৌথ মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। তারা আরো একমত হয় যে নদীতীর সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়সমূহ যৌথ নদী কমিশনের পর্যায়ে উপযুক্ত ফোরামে আলোচনা করা হবে।

অননুমোদিত নির্মাণ ও সীমান্ত অবকাঠামো সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ
বিজিবির মহাপরিচালক পূর্ববর্তী আশ্বাস সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বেড়া, গবাদিপশুর বেড়া এবং অন্যান্য কাঠামোর নির্মাণ অব্যাহত থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সীমান্ত রেখার নিকটবর্তী এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি, স্ট্রিট লাইট, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং অন্যান্য অবকাঠামো স্থাপন সম্পর্কেও উদ্বেগ জানান, যা বিদ্যমান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে বলে উল্লেখ করেন।

তিনি অননুমোদিতভাবে চলমান ডিউটি পোস্ট, ধাতব সড়ক ও কংক্রিট কাঠামো নির্মাণের ঘটনাও তুলে ধরেন এবং ১৯৭৫ সালের ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত কর্তৃপক্ষ সংক্রান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান।

জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন,“বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কাজ মূলত সীমান্তবর্তী ভারতীয় জনগণের নাগরিক সুবিধার জন্য এবং তা বাংলাদেশের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে নয়।”

তিনি আরো বলেন, “নজরদারি সংক্রান্ত সরঞ্জাম আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধের জন্য স্থাপন করা হয়। উভয়পক্ষই সম্মত হয়, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো অননুমোদিত নির্মাণ কার্যক্রম থেকে তাদের নিজ নিজ মাঠ পর্যায়ের ইউনিটগুলোকে বিরত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিদ্যমান নিয়ম ও প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। উভয়পক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার গুরুত্ব স্বীকার করে এবং বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের সময় যৌথ সমন্বিত টহল জোরদার করার বিষয়ে সম্মত হয়। এছাড়া অপরাধের ধরণ পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়মিত (প্রতি ছয় মাসে) পর্যালোচনার বিষয়েও একমত হয়।”

গণমাধ্যম প্রতিবেদন ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ
বিজিবির মহাপরিচালক বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি, ধর্মীয় বর্ণনা, রাজনৈতিক বিষয় এবং সীমান্ত-সম্পর্কিত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও বিকৃত সংবাদ, গুজব এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “এ ধরনের অপপ্রচার বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এ ধরনের তথ্যের বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য বিএসএফকে অনুরোধ জানান।”

তিনি সীমান্ত-সম্পর্কিত ঘটনার সময়োপযোগী ব্যাখ্যা দেওয়ারও অনুরোধ জানান, যাতে বিভ্রান্তিকর বর্ণনার সৃষ্টি না হয়।

উভয়পক্ষই তাদের নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অপপ্রচার বা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত রাখার জন্য নির্দেশনা দিতে সম্মত হয়।

সম্মেলন শেষে উভয় মহাপরিচালক বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয় প্রতিনিধিদল আগামী নভেম্বরে ঢাকা পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত করার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়।

ঢাকা/মাকসুদ/সাইফ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়