ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৯ ১৪২৭ ||  ০৬ সফর ১৪৪২

মুজিববর্ষ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

এম এ কবীর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ১২ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
মুজিববর্ষ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

আজ থেকে শতবর্ষ আগে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে ‘বাংলাদেশ’ নামে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়তো সম্ভব হতো না। বাঙালি জাতি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে পিছিয়ে ছিল না। অভাব ছিল শুধু নিজস্ব রাষ্ট্রের। বঙ্গবন্ধু এই অগ্রসর জাতির সেই অভাব পূরণ করেছেন। এ কারণে আমরা তাকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলি।

আমি মনে করি, সরকার এই বছরটিকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। কেন এই মুজিববর্ষ? কী হবে এ বছর? জানার কৌতূহল হয়তো অনেকেরই আছে। যদিও করোনার কারণে মুজিববর্ষের অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করতে হয়েছে। তারপরও কিছুদিন আগে গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় দেখেছি, অনেকেই জানেন না মুজিববর্ষ কী এবং কেন পালন করা হবে! সাধারণ মানুষ প্রায় সবাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। তখনই মনে হলো, মুজিববর্ষ সম্পর্কে কিছু লিখি। স্বল্প পরিসরে অনেক কিছুই লেখা সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে উল্লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে শুধু এটুকু বলতে পারি, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই বঙ্গবন্ধু এ ভাবনা হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিলেন; তখনই তাঁর মনে হয়েছিল ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি দেশ থাকবে শুধু বাঙালির জন্য।

সেই লক্ষ্যে তিনি সৃষ্টি করলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন। ধীরে ধীরে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলেন প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ে। প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি সব বাঙালিকে এক কাতারে নিয়ে এলেন। ঐক্যের পতাকার নিচে দাঁড় করালেন। এক সুরে একটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টির জন্য সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করলেন এবং একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে মুক্তির কথা, স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করলেন। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অতর্কিত অমানবিক বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছড়িয়ে দিলেন ইথারের মাধ্যমে মধ্যরাতে বন্দি হওয়ার আগ মুহূর্তে।

তাঁর সেই ঘোষণায় জাতির দামাল ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। আজ সবারই জানা, ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর; ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বাধীনতা। এভাবেই শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পিতা। আর এই মহান পুরুষকে যথাযথ সন্মান প্রদর্শন, তাঁর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ, আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর নীতি-আদর্শ সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যেই আমরা উদযাপন করবো মুজিববর্ষ। 

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ- কথাটি তরুণ প্রজন্মের মনে গেঁথে দিতে হবে। তাদের জানাতে হবে বঙ্গবন্ধু কেন একটি স্বাধীন দেশ চেয়েছিলেন, কেন তিনি জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে শুধু একটি পতাকার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, কেন তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে অবিচল থেকেছেন, কেন তিনি বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তা করেছেন এবং সব ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিলেন।

তরুণরা জানতে চায় সঠিক ইতিহাস, সঠিক তথ্য। স্বাধীনতাবিরোধীরা এখনও সক্রিয়; তারা চুপ করে বসে নেই। তারা সুযোগ পেলেই অতীতের মতো ইতিহাস বিকৃত করবে। মৃত বঙ্গবন্ধুকে এখনও তারা ভয় পায়! তারা সর্বদা চেষ্টা করবে বঙ্গবন্ধুর কীর্তি ম্লান করতে। অথচ বঙ্গবন্ধুর কীর্তিই বাঙালি জাতিকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কীর্তিই আমাদের বুক ফুলিয়ে কথা বলার অধিকার দিয়েছে, শির উঁচু করে চলার সুযোগ করে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অমর কর্মপ্রেরণা প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, তরুণ মনে সাহস জোগাবে। কিন্তু তার আগে সঠিক ইতিহাস তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে। আর এ জন্যই মুজিববর্ষ পালন করা গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের আশা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘রূপকল্প’ অনুযায়ী  বাংলাদেশ মধ্যম-আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। বিশ্বব্যাংককে অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে অনন্য-সাধারণ সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে এবং পদ্মাবক্ষে সেই সেতুর অবয়ব এখন দৃশ্যমান। যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে জাতির জনক পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন, দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তারই সুযোগ্য উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে অর্থনৈতিক সর্বসূচকে এগিয়ে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এই পাঁচটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার আজ মানুষের দোরগোড়ায়।

এক সময়ের অন্ধকার গ্রামবাংলা আজ আলোকিত। পিচঢালা পথ, সেই পথে সশব্দে ছুটে চলছে যাত্রীবাহী বা মালবাহী গাড়ি। বাজারগুলো সরগরম। গ্রামগুলো এখন শহরে রূপান্তরিত হচ্ছে। অনেক সুযোগ-সুবিধা এখন গ্রামেও পৌঁছে গেছে। এ সবই সম্ভবপর হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করেছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। কিন্তু এগুলো তা একদিনে অর্জিত হবে না। এর অতীত রয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হয়েছে। অনেক বাধা এসেছে। সেই বাধা দূর করতে হয়েছে বিপুল বিক্রমে। এই ইতিহাসও তরুণদের জানাতে হবে। উন্নয়নের এই যে যোগসূত্র, এই স্বপ্ন বা অনুপ্রেরণা আমরা পেয়েছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে। সুতরাং তাঁর ঋণ শোধ করতে হলেও আমাদের বিনম্রচিত্তে মুজিববর্ষ পালন করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়