ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধ: শান্তি কোন পথে?

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪২, ১২ অক্টোবর ২০২০  
আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধ: শান্তি কোন পথে?

যুদ্ধ কেউ চায় না। তবুও যুগে যুগে যুদ্ধ হয়েছে। অকাতরে মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। হিংসা, বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। তবুও মানুষ যুদ্ধ এড়াতে পারেনি। বারবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। কোনো দেশ আগ্রাসনে নেতৃত্ব দিয়েছে, কোনো দেশ হয়েছে  শিকার- এভাবেই চলছে।

যুদ্ধ চলছে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে। এই যুদ্ধেও মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। তবুও কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। এটি দুই দেশের মধ্যে প্রায় এক দশকের সমস্যা। এখনও সেই সমস্যার সমাধান হয়নি। মাঝেমধ্যেই দুই দেশের সম্পর্ক বৈরী আকার ধারণ করে। এখনও সম্পর্কে স্থিরতা আসেনি। যদিও জাতিসংঘ উভয় পক্ষকে যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানিয়েছে। একই আহ্বান করেছে রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন।

আসলে যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন যুদ্ধ কেবল দুই দেশের মধ্যে সিমাবদ্ধ থাকে না। আঁচ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ১৯৮০ সালের শেষ দিকে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের মুহূর্তে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ১৯৯৪ সালে যুদ্ধ-বিরতির আগ পর্যন্ত এ অঞ্চলে সংঘর্ষে ত্রিশ হাজার মানুষ নিহত হয়। এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত আজারবাইজানের ভূখণ্ড কারাবাখ যা আর্মেনিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নৃগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করছে এ নিয়ে। আর্মেনিয়া তাতে সমর্থন দিচ্ছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এটি একটি বিতর্কিত অঞ্চল। ১৯৯০-এর দশকে যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অঞ্চলটি আজারবাইজান থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও সেটি স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি পায়নি।

২০১৬ সালের পর উভয় দেশের মধ্যে এটিই সবচেয়ে তীব্র লড়াইয়ের ঘটনা। ফলে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ কোনো দেশের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। যুদ্ধ মূলত ঘটেই কোনো না কোনো পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে। এ ক্ষেত্রেও উভয় দেশেরই ক্ষতি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। কথায় আছে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, প্রাণ যায় উলুখাগড়ার। এই উলুখাগড়া হলো জনগণ। জনগণ যুদ্ধ বোঝে না, তারা শান্তি চায়। এর আগে দুই দেশের মধ্যে যতবারই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কয়েকদিন পরেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন বলেই মনে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসছে না। বিরোধ যেন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন আশঙ্কা হলো- দুই দেশের যুদ্ধে আঞ্চলিক শক্তি জড়িয়ে না পড়লেই মঙ্গল। এই সময়ে প্রতিটি দেশ একটি বলয়ে চলতে পছন্দ করে। এই দুই দেশেরও মিত্র দেশ রয়েছে। যদিও তারা এখনই মহাযুদ্ধের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে না। তবে শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তুরস্ক আজারবাইজানের পক্ষে রয়েছে। এখন যদি কোনো দেশ এই দুই দেশের পক্ষাবলম্বন করে তাহলে যুদ্ধ থামানো কঠিন হবে বলেই মনে হয়।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, পরমাণু অস্ত্রের হুমকি। এদিকে আর্মেনিয়াকে সরাসরি সমর্থন না দিলেও তাদের পক্ষেও রয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী দেশ। ফলে এই যুদ্ধ আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। যদিও আশার কথা হলো- সংঘাত নিরসনে আজারবাইজানের সঙ্গে যুদ্ধ বিরতিতে পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে আর্মেনিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সার্বিক শান্তির দিক বিবেচনা করে আজারবাইজানও যদি সাড়া দেয় তাহলে হয়তো এ যুদ্ধ খুব বেশি দূর অগ্রসর হবে না।

এ যুদ্ধ থামাতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধে না জড়িয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত রাখার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বুঝতে হবে বিশ্বের অনেক দেশের হাতেই এখন পারমাণু অস্ত্র রয়েছে। অনেক দেশে সামরিক খাতের ব্যয় অন্যান্য খাতের চেয়ে বেশি। কিন্তু কেন এই প্রতিযোগিতা? আমরা কার কাছ থেকে নিরাপদে থাকতে চাইছি? আমাদের প্রধান শত্রু কে? এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা আবশ্যক। সময় এসেছে আমাদের আত্নবিশ্লেষণ করার। নিজেকে সুরক্ষিত রাখা বা অন্যকে ভয় দেখানো যদি আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয় তাহলে আমরা মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি বলেই আমার মনে হয়। পৃথিবীর অস্তিত্বই যদি হুমকির সম্মুখীন হয় তাহলে নিজেকে সুরক্ষিত করার কোনো অর্থ হয় না। আজকের যে আক্রমণাত্মক প্রবণতা তা অতীতেও ছিল। তখনও রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতো আর উলুখাগড়ার প্রাণ যেত। তারাও যুদ্ধের নতুন কৌশল বের করতো। নতুন অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতো। মানুষকে মারার জন্য মানুষের এত কৌশল! সে সময়ও ছোট ছোট রাজ্যগুলো একজোট হয়ে বড় রাজ্যকে প্রতিহত করতো। সেই কৌশলের আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু রণক্ষেত্রের।

যুদ্ধ এবং শান্তি পরস্পর বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বর্তমান বিশ্বে দুটো বিষয়ই পাশাপাশি চলছে। একদিকে একে অন্যকে আক্রমণাত্মক বক্তব্যে ঘায়েল করতে চাইছে, অন্যদিকে শান্তির বুলি আওড়াচ্ছে। লুকিয়ে প্রত্যেকেই সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অথচ এর চেয়ে অনেক বেশি জরুরি পৃথিবী বসবাসযোগ্য করা। পৃথিবীতে বহু মানুষ আজ আশ্রয়হীন; খাদ্য নিরাপত্তায় ভুগছে। বহু শিশু তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের সংখ্যাও কম নয়। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই বেঁচে থাকবে মানবতা। আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার যুদ্ধ একসময় শেষ হবেই। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধ শেষ হওয়ার চেয়ে শুরুতেই এই আত্মঘাতী যুদ্ধ থামানো উচিত। না হলে এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়