ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

ই-বর্জ্যে পৃথিবীর নতুন বিপদ   

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৭, ১৯ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৭:২৯, ১৯ জানুয়ারি ২০২১
ই-বর্জ্যে পৃথিবীর নতুন বিপদ   

মানব সভ্যতা এগিয়ে চলার পাশাপাশি প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। মানব জীবন সহজ হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। ডিজিটালাইজেশন হয়েছে দ্রুত গতিতে। পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে।

এসব সুবিধা যেমন মানুষকে আরাম-আয়েশ দিতে সক্ষম হয়েছে, বিপরীতে মানুষের সামনে নতুন সমস্যাও তৈরি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বর্জ্য সমস্যা। যা সমাধানের জন্য মানুষ প্রতিনিয়ত পরিকল্পনা করছে। উন্নত দেশগুলো তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়ে বর্জ্য থেকে রিসাইকেলের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো এ সমস্যা নিয়ে ভুগছে। শহরগুলোতে প্রতিদিন বর্জ্য বাড়ছে যা পরিবেশের ক্ষতি করছে। তবে আধুনিক বিশ্বে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য।

কেন ই-বর্জ্য ঝুঁকিপূর্ণ বা দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলছে আমাদের কপালে? এর সহজ উত্তর হলো- এই অতি আধুনিক সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রসার হচ্ছে ই-পণ্য। নিত্যনতুন সুবিধাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যগুলো প্রতিদিন আপডেট সুবিধা নিয়ে বাজারে আসছে। এক্ষেত্রে রয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যে যত বেশি সুবিধা দিতে পারবে গ্রাহক সেই পণ্য তত কিনবে। এমন ধারণা থেকেই ক্রেতা টানতে প্রতিযোগিতায় নামছে কোম্পানিগুলো। ফলে ক্রেতাই আজ একটা তো কাল অন্য আরেকটা পণ্য কিনছে। কিন্তু তার পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক্স পণ্য বর্জ্য হয়ে থেকে যাচ্ছে। দিন দিন এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে।

ই-বর্জ্য কেবল আমাদের দেশের সমস্যা নয়, বরং গত কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বে এটি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা গেছে, ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে ৫২.৭ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। সেগুলোর মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ রিসাইকেল করা হয়। ২০১৯ সালে বিশ্বে যত ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য তৈরি হয়েছিল সেগুলোর ওজন ইউরোপের সমস্ত পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়েও বেশি। আবার বর্জ্যগুলো এক সারিতে রাখলে তা ৭৫ মাইলের চেয়েও দীর্ঘ হতো। আরও জানা যায়, গত ২০১৪ সালের পর ৫ বছরে বিশ্বে ই-বর্জ্য বেড়েছে ২১ শতাংশ। জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে ২০৩০ সালে বিশ্বে ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য হবে ৭২.৮ মিলিয়ন টন।

মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই ই-বর্জ্য। কারণ পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক্স পরিবেশে ক্ষতিকর উপাদান ছড়িয়ে দেয়। বিশ্বে মোট ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় এশিয়ায়। বলা যায়, ই-বর্জ্য নিয়ে এক রকম বিপদেই আছে এশিয়ার দেশগুলো। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এক্ষেত্রে অনেকটাই দায়ী। এ সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের একটি ভালো উপায় হতে পারে রিসাইক্লিং। রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে অন্যান্য বর্জ্য সমস্যা যেভাবে সমাধান করা হয়, সেভাবেই ই-বর্জ্যর পরিমাণ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

পৃথিবী আজ গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে প্রযুক্তির অবদান। প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা যাবে না। প্রযুক্তি মানুষের কায়িক পরিশ্রম অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। গত ১০ বছরে প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ গুন। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশনের (ইএসডিও) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্য খুব কম অংশই রিসাইকেল হচ্ছে। বাকিটা পরে থাকছে উন্মুক্ত পরিবেশে। এশিয়ার ই-বর্জ্য নিয়ে ইউনাইটেড ন্যাশনস ইউনিভার্সিটি গত বছর এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এশিয়ায় ই-বর্জ্য বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। ১২টি দেশের ওপর তারা গবেষণা চালিয়েছে। এদের মধ্যে চীনের অবস্থা ভয়াবহ! যা পুরো এশিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ বিবেচনা করা হচ্ছে।

ই-বর্জ্য সমস্যা সমাধানে তাহলে সমাধান কোথায়? আমাদের একটি পণ্য দীর্ঘদিন ব্যবহারের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো সচেতনতা তৈরি করা। কারণ ই-পণ্য আজ গ্রামেও পৌঁছে গেছে। ফলে সেখানেও যেখানে-সেখানে পরিত্যক্ত ই-পণ্য ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ বাঁচাতে এখনই নিতে হবে পরিকল্পিত উদ্যোগ। 

 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়