Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২২ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ১০ ১৪২৮ ||  ১০ জিলক্বদ ১৪৪২

নাড়ির টানে পরাজিত করোনা ঝুঁকি

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪২, ১১ মে ২০২১  
নাড়ির টানে পরাজিত করোনা ঝুঁকি

গত বছরের মতো এবারো করোনা অতিমারির মধ্যেই ঈদ উদযাপিত হতে যাচ্ছে। মানুষের আয় সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি এবং মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েনের মধ্যেই আনন্দের এই ক্ষণ উপস্থিত। একদিকে পাশের দেশে লাশের মিছিল, অন্যদিকে জীবন-সংগ্রাম—সব মিলিয়ে চারদিকে  প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে টালমাটাল। প্রতিদিন হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় চার লাখ আক্রান্ত হচ্ছে দেশটিতে। গণমাধ্যমে সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখছি আমরা। শ্মশানে মৃতদেহ পোড়ানোর কাঠ সংকট হচ্ছে। আবার দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও মৃতদেহ দাহ করা যাচ্ছে না। অপেক্ষমান মৃতদেহ নিয়ে কুকুরের টানাটানির ছবিও আমরা পত্রিকায় দেখেছি। এর চেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতি আর কি হতে পারে!

শুধু ভারত নয়, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালের অবস্থাও ভালো নয়। ছোট্ট এই দেশটিতে করোনা মহামারি সংকট তৈরি করেছে। পাকিস্তানেও খারাপ হচ্ছে করোনা পরিস্থিতি। এরই মধ্যে আমাদের দেশে ভারতের করোনা ভ্যারিয়েন্ট কয়েকজনের দেহে শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। ঈদ মানে আনন্দ, আর এই আনন্দের একটি অংশ হলো বাড়ি ফেরা। গ্রামে সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা  আমাদের বহু বছরের রীতি। নাড়ীর টান। গ্রামে থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তো বটেই, এই নাড়ীর টান গ্রামের সঙ্গে, গ্রামের মানুষের সঙ্গেও রয়েছে। সেই টানেই নিষেধ অগ্রাহ্য করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ফিরছে মানুষ। ফলে বারবার যার যার অবস্থানে থেকে ঈদ উদযাপনের কথা বলা হলেও বাস্তবিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে, দ্বিগুণ তিনগুণ ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরছে। ঠেকানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। কথা হলো মানুষ মরিয়া হয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে ঘরে ফেরার জন্য—এটি আগামী করোনা পরিস্থিতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

গত এপ্রিল মাস থেকেই দেশে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মৃতের সংখ্যা একশ পেরিয়েও গিয়েছিল। যদিও এখন করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ওঠা-নামা করছে। আক্রান্তের সংখ্যা কমছে। সুতরাং এই মুহূর্তে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে বলা যায়। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে একটুও সময় লাগে না। এই শিক্ষা আমরা পেয়েছি। যখন মনে করেছি করোনা বিদায় নিচ্ছে, তখন করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার বেড়েছে। স্বাস্থ্যসচেতন জাতি হিসেবে আমাদের খুব বেশি সুনাম নেই। বারবার সচেতন করার পরেও স্বাস্থ্যবিধি মানার অভ্যাস করানো যায়নি। ঈদের বাজারে ঢুকলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং ভারতে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

ভারতের এমন অবস্থা তৈরির পেছনে সেখানকার নির্বাচনী সমাবেশ, ধর্মীয় মেলা অর্থাৎ বিপুল মানুষ সমাগম হয় এমন সিদ্ধান্তগুলোকেই দায়ী করা হচ্ছে। এই একই ভুল কিন্তু আমরাও করছি। আমরা বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করতে চেয়েছি। এর পরিণতি কী হবে তা এখন বলা সম্ভব না। আমরা এক অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছি। সেই অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে কীভাবে লড়াই করা যায় বিজ্ঞানীরা আমাদের জানিয়েছেন। প্রধান অস্ত্র হলো মাস্ক পরা। অথচ গত দুই বছরেও সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করা যায়নি।

করোনা সংক্রমণ এখন পর্যন্ত শহরাঞ্চলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। সেই সংক্রমিত এলাকা থেকে যখন প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষ ছড়িয়ে পড়ছে তখন সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পরার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এখানে সমস্যা হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে করোনা রোগীর চিকিৎসা নেওয়া অনেক কষ্টসাধ্য। আমরা জেনেশুনে এই ঝুঁকি তৈরি করেছি। বাড়ি ফেরার আবেগের কাছে পরাজিত হয়েছে আমদের স্বাস্থ্য সচেতনতা। কেবল বাড়ি ফেরার আবেগই নয় শপিং মল, মার্কেটগুলোতে যে স্বাস্থ্য সচেতনতার নমুনা দেখছি সেটাও দুঃশ্চিন্তা তৈরি করছে। এর ফলে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়। সংক্রমণের লাগাম টানতে লক ডাউন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কতবার এভাবে লকডাউনে দেশকে রাখা যায়, জনজীবন স্থবির কতবার করা যায়?

এর ভোগান্তি তো আমরা সাধারণ জনগণই ভোগ করি। জীবিকা এবং ফলশ্রুতিতে জীবনের ওপর খড়গ নেমে আসে। কিন্তু সংক্রমণের লাগাম টানতে এর বিকল্পও থাকে না। লক ডাউন দেওয়ার ফলেই সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরা যায়। সব দেশেই এটা হয়। এখন আমরা যদি অসচেতন হই তাহলে বারবার আমাদের এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। যা জীবন জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারি না। 

আমাদের অসচেতনতার জন্য যে তৃতীয় ঢেউ আসবে না বা এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি আসবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দেবে না। এখন গণপরিবহন বাদে সবই চলছে। সেটাও চলতে শুরু করবে। কারণ এই পেশার সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষ। তাদেরও পরিবার রয়েছে। সুতরাং জীবন থামিয়ে রাখার উপায় নেই। মোট কথা সবকিছুই প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায়ই চলবে। কিন্তু এর মধ্যেই বহু মানুষ প্রাণ হারাবে। এরই মধ্যে ভাবাচ্ছে করোনার নতুন স্ট্রেইন। পশ্চিমবঙ্গ পাওয়া গেছে ট্রিপল-মিউট্যান্ট স্ট্রেইন। যা বর্তমান স্ট্রেইনের চেয়েও অনেক বেশি প্রাণঘাতী বলে সতর্ক করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই অবস্থায় সচেতন হওয়া, নিজেকে নিরাপদে রাখা এবং অন্যকে সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে দৃঢ় থাকতে হবে। আর তা না হলে আমাদের আরও খারাপ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ঢাকা/শান্ত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়