ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

মইসি হত্যাকাণ্ড এবং হাইতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৮, ১০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৬:৪৯, ১০ জুলাই ২০২১
মইসি হত্যাকাণ্ড এবং হাইতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

জোভেনেল মইসি

স্পেনিয় এবং পরে ফরাসি উপনিবেশে থাকা পশ্চিম ভারতীয় দীপপুঞ্জের রাষ্ট্র হাইতি লাতিন আমেরিকার প্রথম স্বাধীন দেশ। ১৮০৪ সালে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। মূলত সেই সময়ে দাসপ্রথা থেকে মুক্তির যে আন্দোলন সেটাই ছিল হাইতির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার। কিন্তু বহু আগে স্বাধীনতা পেলেও হাইতি কাঙ্খিত অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। ঔপনিবেশিক শাসন মুক্ত হলেও হাইতি আজও বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে দেশটির জনগণকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে।

সম্প্রতি দেশটি আলোচনায় এসেছে। গত কয়েকদিন ধরেই আন্তর্জাতিক খবরে হাইতি নামের ক্ষুদ্র দেশটি আলোচনায় রয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মইসিকে তার বাসায় বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় তার স্ত্রী মার্টিন মইসি আহত হয়েছেন। সন্দেহভাজন চার ব্যক্তি এ ঘটনার পর পুলিশের হাতে নিহত হয়েছে। কারা তাকে হত্যা করেছে সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ক্লোদ জোসেফ বলেছেন, হত্যাকারীরা উচ্চ প্রশিক্ষিত। তাদের কয়েকজন স্প্যানিশ ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলছিল।

কেন মইসিকে হত্যা করা হলো এবং এরপর হাইতিতে কী ঘটতে চলেছে এসবই এখন আলোচনায় রয়েছে। হাইতি দরিদ্র রাষ্ট্র। তবে এই দেশেই পাশাপাশি দুটি চিত্র দেখা যায়। দারিদ্র্যের বিপরীতে এখানে রয়েছে এক শ্রেণীর অভিজাত ব্যক্তি; যারা সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। এতে স্পষ্ট যে হাইতির জনগণ বিভক্ত। এই বৈষম্য এবং দারিদ্র্য দেশে সহিংসতা এবং ক্ষোভের জন্ম দেয়। সন্ত্রাসও একটি বড় সমস্যা। তবে আমি বলবো প্রথম সমস্যা দারিদ্র্য। এখান থেকেই শিক্ষা এবং সম্পদের সুষম বন্টণজনিত সমস্যার উৎপত্তি। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যোগ হলে দেশটির জন্য উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট মইসির শাসনামল ছিল অস্থির। তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের বহু অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে রাস্তায় বিক্ষোভও হয়েছে।

দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বড় ইতিহাস রয়েছে। স্বৈরশাসনে হাইতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও সেখানে বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতার চিত্র রয়েছে। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট হত্যার মধ্য দিয়ে আবারো সেই অস্থিরতার চিত্রই প্রকাশ পেলো এবং এই অরাজনৈতিক অবস্থা আরো দীর্ঘ হলো। একুশ শতকের প্রারম্ভে হাইতি একটি গ্রহণযোগ্য সরকার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের চেষ্টা করছে। বিগত ২০১৫ সালের নির্বাচনে মইসি জয়লাভ করলেও সেটি বাতিল করে দুই বছর পরে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনেও তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয়ী হন। দায়িত্ব নিয়ে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে পরিস্থিতি খুব বেশি স্থির ছিল না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একনায়কতন্ত্রস্বরূপ আচরণ করতে শুরু করেন। বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ আনেন। ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। এভাবেই তার ক্ষমতার সময় অতিবাহিত হচ্ছিল।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে মইসি সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর থেকে ডিক্রি জারির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করছিলেন। মইসির শাসন অবৈধ ঘোষণা করে বিরোধীরা তাদের পছন্দমতো অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করে। কিন্তু মইসি ক্ষমতায় থাকার অনড় অবস্থানে থাকেন। গত ফেব্রুয়ারিতে সেই বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। এর মধ্যেই ঘটে যায় এই নৃশংস ঘটনা।

যদিও এই হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে যে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মইসি হত্যাকাণ্ডের পর সংকট সহসাই কাটবে না। এরপর যে ক্ষমতায় আসবে তাকেও পরতে হবে চ্যালেঞ্জের মুখে। যে সমস্যাগুলোর সঙ্গে মইসি লড়াই চালিয়েছে সেই জায়গাগুলোতে তাকেও সংগ্রাম করতে হবে।

হাইতির সমস্যাগুলো যেমন দারিদ্র্য, দুর্নীতি, শিক্ষা, জীবনমান উন্নয়ন প্রভৃতি মৌলিক সমস্যাগুলোর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি তাকে অবশ্যই রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। এই কঠিন কাজটিই চালিয়ে যেতে হবে হাইতির পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে। এ জন্য দায় দেশটির সব রাজনৈতিক নেতাদের নিতে হবে। অন্যথায় হাইতির এই অস্থিরতার চিত্র কেবল দীর্ঘই হবে। 
 
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়