ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

ইতিহাসে মার্চ ও মহানায়ক মুজিব

এন আই আহমেদ সৈকত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২২, ২৫ মার্চ ২০২২  
ইতিহাসে মার্চ ও মহানায়ক মুজিব

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ একসূত্রে গাঁথা তিনটি শব্দ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি দর্শন, একটি চেতনা। যে চেতনা ধারণ করে তরুণ ও যুব প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ হয় দেশ এগিয়ে নিতে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের পেছনের মানুষটির বেড়ে-ওঠা কল্পরাজ্যের গল্পকেও হার মানায়। তাঁর এই ভাষণের যুগান্তকারী ভূমিকা কেবল অবিশ্বাস্য নয়, চমকপ্রদও বটে। তাই এই মানুষ ও তাঁর ভাষণ— দুই-ই ইতিহাসে কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এবং থাকবে। আমরা অবগত আছি যা গল্প ও বাস্তবকে হার মানায়, তা হয়ে ওঠে কিংবদন্তি বা কিংবদন্তিতুল্য। তিনি আর্কেটাইপ নন, লিজেন্ড। ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও  বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব দেওয়া যে কোনো বিচারে অসাধারণ ঘটনা।

বাঙালি জাতির রক্তমাখা সংগ্রামী ইতিহাসের সঙ্গে মার্চ মাসের সম্পর্ক গভীর। বাঙালি জেগেছে মার্চে, স্বাধীন বা মুক্ত হবার ঘোষণাও দিয়েছে মার্চে। বাঙালি নিজেদের জাত চিনিয়েছে অগ্নিঝরা মার্চে। সেই মার্চের ১৭ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুতরাং বাঙালি জাতির জন্য মার্চ মাস গুরুত্ববহ। ৭ মার্চের ভাষণে একজন মুজিব যেভাবে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দিয়েছেন মুক্ত হবার দিকনির্দেশনা। তেমনি শত বছর পূর্বে এই মার্চেই জন্মেছেন নির্মোহ, তেজস্বী এই বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে সফলতম রাজনৈতিক কবি৷  ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গ কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতির কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নেননি। তাঁর এই সতর্ক কৌশলের কারণেই ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও শেখ মুজিবকে ‘চতুর' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলো, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’

বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন মার্চ মাসের ১৭ তারিখ। বাঙালি তাদের এই নেতাকে স্মরণ রাখতে তাঁর জন্মদিনে প্রতি বছরের ১৭ মার্চ জাতীয়ভাবে পালন করা হয় জাতীয় শিশু দিবস। শেখ মুজিব টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ সমাজের নানা সংকট-সংগ্রাম দেখেছেন। শিশুকাল থেকেই ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ করে গরিব ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দুরন্ত মুজিবের সেসময় ছাত্রবাহিনীও ছিল। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলায়ও ছিলেন পারঙ্গম, খেলাধুলাসহ নানা সংগঠন করে তরুণ ও যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। কালের পরিক্রমায় স্বদেশি আন্দোলনে যোগদান এবং শেরে বাংলা ও হোসেন শহীদের সংস্পর্শে এসে যোগ দেন রাজনীতিতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে  ছাত্রলীগ এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ গঠন করেন। যে সংগঠন দুটির সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে।

৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে ৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের।

সবুজ বিপ্লবের কথা আমরা বলছি। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের যে অবস্থা, সত্য কথা বলতে কি - বাংলার মাটি, এ ঊর্বর জমি বারবার দেশ-বিদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ও শোষকদের টেনে এনেছে এ বাংলার মাটিতে। এত ঊর্বর, এত সোনার দেশ যদি বাংলাদেশ না হতো, তবে এতকাল পরাধীন থাকতে হতো না। বাংলাকে নিজের চেতনা দিয়ে, নিজের বোধ দিয়ে বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই বাংলার সক্ষমতা নিয়ে কোনো সংশয়ই ছিলো না তাঁর মাঝে, তাঁর বক্তব্য এবং তাঁর লেখা পড়ে বুঝা যায় যে দেশটির সামগ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর ব্যাপক পরিকল্পনা ছিলো, যা গণমানুষের ভাগ্য এবং সামাজিক উন্নতির জন্য। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের যে অংশটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরু্ত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হচ্ছে, এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ২৬ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু তাঁর সে প্রচেষ্টা রুখতে যে অপতৎপরতা দেশের ভেতরে এবং বাইরে চলেছে তা শুধুমাত্র একটি গোষ্ঠী বাংলা নামক দেশটির স্বাধীনতাকে মানতে না পারার ফলেই। দীর্ঘ সময় সেই ঘোরটোপেই বন্দী ছিল বাংলার উন্নতি, প্রগতি। কিন্তু ‘ইতিহাস ভুলে যাবো আমি কি তেমনই সন্তান/ যখন আমার জনকের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ কবিতার লাইন দুটির মত করেই এ দেশের মানুষ জেগে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে জননেত্রী শেখ হাসিনা নিরলস কাজ করছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আজ বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বের বুকে উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ সময়ের অপেক্ষামাত্র।

লেখক: উপ-তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়