ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

গোতাবায়ার পতন, জনগণের জয়, তবুও অনিশ্চিত লঙ্কার ভবিষ্যৎ

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১০, ১৪ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১৫:২৫, ১৪ জুলাই ২০২২
গোতাবায়ার পতন, জনগণের জয়, তবুও অনিশ্চিত লঙ্কার ভবিষ্যৎ

গত কয়েক মাস শ্রীলঙ্কা সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে। এই পরিস্থিতিতে সে দেশের জনগণ রয়েছে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে। মৌলিক চাহিদার প্রায় সব কিছুরই অপর্যাপ্ততা জনগণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। ফলে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যবহার কমিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এখন দেশবাসীর প্রধান সমস্যা খাবারসহ অন্যান্য নিত্যদ্রব্য কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলা। পরিবারে খাদ্যের নিশ্চয়তা না থাকা, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, জ্বালানি না থাকাসহ মৌলিক চাহিদাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সে দেশে জনগণের দিন-রাত কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে তলানিতে ঠেকা এবং ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেশটিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন মাসে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির হার পৌঁছেছে ৫৪.৬ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৮০.১ শতাংশ, পরিবহণ খরচ বেড়েছে ১২৮ শতাংশ।

ইউনিসেফ এক বিবৃতিতে বলেছে, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ৭০ শতাংশ পরিবার খাদ্য কমিয়েছে। অর্থাৎ কম খেতে বাধ্য হচ্ছে। ইউনিসেফ বিবিসিকে জানিয়েছে, সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কা এখন মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে। এই দ্বীপরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক সংকটও প্রচুর। বস্তুত দেশটি এখন কোন দিকে যাবে তা অনুমান করা সম্ভব নয়। ব্যয়ের সব লাগাম টেনে ধরেও শেষ রক্ষা করা যাচ্ছে না। 

বলাবাহুল্য এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। কয়েক দিন আগে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঢুকে পড়ে। সেই ছবি গণমাধ্যমের সৌজন্যে বিশ্ববাসী দেখেছে। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের বিলাসবহুল বাড়ি থেকে কয়েক মিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে আন্দোলনকারীরা। এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

এ পরিস্থিতিতে দেশটির রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগ করতে রাজি হন। যদিও মাত্র কয়েকদিন আগেও তিনি পদত্যাগ করতে সম্মত হননি। হলে পরিস্থিতি হয়তো এতো দূর গড়াতো না। কিন্তু আন্দোলনের গতি এবং পরিস্থিতি তার মনোভাব পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। গত মঙ্গলবার তিনি পদত্যাগপত্রে সই করেছেন। এরই মধ্যে তার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার খবরও এসেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্মরণাতীতকালের মধ্যে খারাপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই মুহূর্তে সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?  

সুখের খবর হলো, অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ভারত শ্রীলঙ্কাকে ৩৮০ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে শ্রীলঙ্কার একটি সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে ঐক্যমতে পৌঁছেছে বিরোধী দলগুলো। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া ও রনিল বিক্রমাসিংহের পদত্যাগের ঘোষণার পর এই বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছান তারা।

বর্তমান সংকটের জন্য রাজাপাকসের পরিবারকেই দুষছে সাধারণ মানুষ। মজার ব্যাপার আজ যে গোতাবায়া বিদ্রোহীদের তোপের মুখে নিজের ভবন ছেড়ে পালিয়েছেন এবং পদত্যাগে রাজি হয়েছেন সেই তিনিই ২০১৯ সালের নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। একসময় জনগণের কাছে তিনি এবং তার ভাই রীতিমতো নায়ক। ২১ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন গোতাবায়া। দুই দশক তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তারপর যান যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে, ৯ জানুয়ারি ২০২০ সালে প্রেসিডেন্টের আসনে বসেন তিনি। ক্ষমতায় এসে বেশ কিছু ব্যয়বহুল অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেন। কিন্তু বিভিন্ন উৎস থেকে তিনি ঋণ নেন। যার পরিমাণ কমপক্ষে দুই হাজার একশ কোটি পাউন্ড। এই অর্থনৈতিক সংকট কাটাতেই হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। 

প্রাচীনকাল থেকেই দেশটি ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ সে দেশে বাণিজ্য করতো। ২ কোটি ২২ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে গত ২ বছরের করোনা মহামারীর কারণে অর্থনীতির গতি স্লথ হয়ে পড়ে। এরপর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরকারের বিগত কয়েক বছরের কিছু সিদ্ধান্ত বর্তমান পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে দেশটিকে। অবস্থা এমন যে শ্রীলঙ্কার মানুষকে এখন বিদ্যুতের অভাবে একটি বড় সময় পার করতে হচ্ছে। 

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, সাগর পাড়ের চমৎকার এই দেশটি এখন মারাত্মক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। সমস্যা কতটা তীব্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদেই অনুধাবন করা যায়। অবস্থা এমন যে কাগজ আমদানির অর্থ না থাকায় দেশটিতে পরীক্ষা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। চালের কেজি ৫০০ টাকা বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের সংকট। কিন্তু মনে রাখতে হবে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিস্থিতিও সুবিধার নয়। একটি দেশের উন্নয়নের বিপরীতে প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দুঃখজনক সত্য এই যে, সেখানে সব কিছুই এখন অস্থিতিশীল। অথচ দেশটি কোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি পারি দিচ্ছে না। 

যাই হোক, জনগণের তীব্র আন্দোলন আপাতত সফল হয়েছে কিন্তু এরপর কী ঘটবে? যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তাকে এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। তাকে জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলোর সংকট দূর করতে হবে। ক্রমেই জনগণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে হবে। কাজগুলো সহজ হবে না। এমন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কাকে একটি নতুন দিনের সন্ধান যে দিতে পারবে ইতিহাসের পাতায় নিঃসন্দেহে বীর হিসেবেই আখ্যায়িত হবেন তিনি।   

লেখক: প্রাবন্ধিক ও মুক্তগদ্য লেখক            
  

 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়