ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

ব্রিটেনে টালমাটাল রাজনীতি, লিজ ট্রাসের পর কে?

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৪৯, ২৪ অক্টোবর ২০২২  
ব্রিটেনে টালমাটাল রাজনীতি, লিজ ট্রাসের পর কে?

আর্থিকনীতি বিষয়ক তীব্র সমালোচনার মুখে অবশেষে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রিটেনের দায়িত্ব নেওয়া লিজ ট্রাস। গত কয়েক বছর ধরেই যেন ব্রিটেনের রাজনীতি টালমাটাল। স্থির হয়ে বসতে না বসতেই অনাস্থার জন্ম দিচ্ছেন এবং ফলশ্রুতিতে বিদায় নিতে হয়েছে। 

বেক্সিট বিষয়ক নীতিতে থেরেসা মে, এরপর বেক্সিট পারি দিলেও লক ডাউনের ভেতর পার্টির আয়োজন করে তীব্র সমালোচনার মুখে ক্ষমতা ছাড়েন বরিস জনসন এবং এরপর মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় সরে দাঁড়ালেন লিজ ট্রাস। যদিও মিনি বাজেটে ভুল আর্থিকনীতি গ্রহণের কথা স্বীকার করে ক্ষমা চান ব্রিটেনের সদ্যবিদায়ী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। নিজ দলের ভেতরেই তিনি চরম অনাস্থায় চলে যান। তিনি যেমন ছিলেন ব্রিটেনের তৃতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী, একইভাবে তিনিই আবার ব্রিটেনের সবচেয়ে কম সময়ের প্রধানমন্ত্রী। এখন আবার নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও লেবার পার্টি নির্বাচন আহ্বান করেছে। 

লিজ ট্রাসকে পরীক্ষা দিতে হবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। অর্থনীতি পরীক্ষা এর মধ্যে অন্যতম। অর্থনীতি বিষয়ক সিদ্ধান্ত ছিল তার জন্য এসিড টেস্ট। সেই টেস্টে তার সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচিত হয়। কর কমিয়ে উন্নয়ন ও বেশি মজুরির নীতি ছিল তার। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে লিজ ট্রাস বলেছিলেন, তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি বিল মোকাবেলা এবং সরবরাহ বাড়ানোর জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মাত্র কিছুদিনেই তার অবস্থান বেশ নড়েবড়ে যায়। তার আর্থিক নীতির কারণে ভেতরে বাইরে বেশ চাপের মুখে পরে যান তিনি। 

বরিস জনসনের স্থলে ব্রিটেনের তৃতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মসনদে বসেন লিজ ট্রাস। এর আগে তিনি স্থবির প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে ব্রিটেনের অর্থনীতি মুক্ত করতে বিপুল পরিমাণ কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ের ওপর কর ও করপোরেশন কর কমানোর প্রস্তাব ছিল। সেখান থেকেই তিনি গত ২৩ সেপ্টেম্বর সাবেক অর্থমন্ত্রী কোয়াসি কোয়াটেং মিনি বাজেট পেশ করেন। সেখানে চার হাজার পাঁচশ কোটি পাউন্ড কর কমানোর পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছিল। এরপর থেকেই তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। নিজ দলের কয়েকজন এমপিও তার পদত্যাগ দাবি করেন। এরপর হাউস অব কমন্সে ফ্রাকিং ভোটের পর তীব্র পদত্যাগের চাপের মুখে পরেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে তিনি অর্থমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন। নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান জেরেমি হান্ট। তিনি জানিয়েছেন, কর কমানো এবং সরকারের ব্যয়ে কাটছাট করা হবে। 

দেশটিতে আগামী দুই বছরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এখন ব্রিটেনের হাল কে ধরতে পারেন তার আলোচনাও চলছে।  আলোচনায় অনেক নাম রয়েছে। রয়েছে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের নামও। তাছাড়া ঋষি সুনাক যিনি ট্রাসের সাথে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে ছিলেন তিনিও প্রার্থী হতে পারেন। ব্রিটেনের রাজনীতি যেন অনেকটাই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সম্প্রতি ইউগভের জরিপে দেখা গেছে, জনপ্রিয়তায় সদ্যবিদায়ী বরিস জনসন লিজ ট্রাসের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫৫ শতাংশই বলেছেন এই মুহূর্তে ভোট হলে তারা ঋষি সুনাককে ভোট দেবেন। আর লিজ ট্রাসকে ভোট দেবেন জানিয়েছেন মাত্র ২৫ শতাংশ। তারা মনে করেন লিজ ট্রাসের এখন পদত্যাগ করা উচিত। আর বিপরীতে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান ৩৮ শতাংশ। 
প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে ট্রাসের সঙ্গে ছিলেন ঋষি সুনাক। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কিছু কারণে তিনি পিছিয়ে পরেন। এখন আবার ঋষি সুনাকের নাম জোর আলোচনায় এসেছে। ২০১৬ সালের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভোট দেয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক ক্ষেত্র বেশ ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। থেরেসা মে থেকে লিজ ট্রাস কেউই তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। এখন ব্রিটেনে এমন একটি দক্ষ নেতৃত্ব দরকার যে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবেন। 

বিশ্বের জন্য বর্তমান সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৃথিবী একটি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে। খোদ ব্রিটেনও এই সংকটের আগুনে পুড়ছে। এই সংকটের বাইরে নেই ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোও। তারপর আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। বিশ্ব এখন একটি বিভক্তিকরণের মধ্যে অগ্রসর হচ্ছে। নতুন নতুন জোট গঠিত হচ্ছে। বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি বিষয় পূর্বেই স্পষ্ট ছিল যে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর পদে যিনিই আসুন না কেন তার প্রধান কাজ হবে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। সেখানে আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়েই তিনি সমালোচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। 

এখন সেখানে চ্যালেঞ্জিং হলো দেশে মুদ্রাস্ফীতি কমানো এবং জনগণের ওপর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার কমানো। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে বাইরের নানামুখী সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি তাকে নিজের ঘরও দেখতে হবে। নিজ দলের ঐক্যবদ্ধতা আনতে হবে। ফলে সময়টা হবে কঠিন। কারণ ১৯৮০ সালের পর দেশটিতে খাদ্যের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।  দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে প্রবেশ করে। এর আগে জুলাইয়ে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছে।  এই অতিরিক্ত ব্যয় এবং আয়ের সাথে সমন্বয় রেখে জীবনযাত্রার মান ঠিক রাখার কাজটি বেশ দক্ষ হাতেই করতে হবে। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই কাজটি দক্ষ হাতে সামাল দিতে সক্ষম হলেই ব্রিটেনের জনগণের কাছে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। এই নানামুখী সংকট সামাল দিতে কে ব্রিটেনের হাল ধরে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

প্রাবন্ধিক ও মুক্তগদ্য লেখক

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়