ঢাকা     শুক্রবার   ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২০ ১৪২৯

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ আওয়ামী লীগের জন্য শাপেবর

নিজামুল হক বিপুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৮, ৭ ডিসেম্বর ২০২২  
বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ আওয়ামী লীগের জন্য শাপেবর

হিমালয় ঘেষা দেশের উত্তর জনপদে শীতের কাঁপুনি শুরু হলেও সারাদেশে শীতের তীব্রতা এখনও তেমন একটা পড়েনি। তবে বছরান্তে এই ডিসেম্বরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। ১০ ডিসেম্বর ডেটলাইন ধরে সরকার ও বিরোধীপক্ষ একে অন্যের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় তির্যক মন্তব্য করে যাচ্ছেন।

রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু করতে আগামী ১০ ডিসেম্বর শনিবার ঢাকায় সমাবেশের ডাক দিয়েছে। গত অক্টোবরে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ করার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই শেষ ধাপ হিসেবে ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ করে সরকার পতনের আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণার কথা দলটির। 

বিএনপির এই সমাবেশকে ঘিরে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। বিশেষ করে সরকারি দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এবং বিএনপির শীর্ষ নেতারা তুমুল বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে এই বাকযুদ্ধ। গলাবাজিতে কোনো পক্ষই কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। তার উপর আবার সমাবেশের স্থান নিয়ে শুরু হয়েছে আরেক যুদ্ধ। বিএনপি নিজেদের দলীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে সড়কের উপর সমাবেশ করতে চায়। আর সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, সমাবেশের জন্য নির্ধারিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে সমাবেশ করতে হবে। সেভাবেই ডিএমপির পক্ষ থেকে শর্তসাপেক্ষে বিএনপিকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, সড়কে কোনো সমাবেশ করা যাবে না। সমাবেশ করতে হবে ময়দানে। অপরদিকে নিজেদের অবস্থানে অনড় বিএনপি। তারা নয়াপল্টনেই সমাবেশ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এ অবস্থায় ১০ ডিসেম্বর আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে? এ নিয়ে রাজধানীবাসী তো বটেই, দেশের মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। কিন্তু ১০ ডিসেম্বর কি আসলেই রাজধানীজুড়ে কিছু ঘটবে নাকি শুধুই ফাঁকা বুলি? গলাবাজি? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হয়তো অপেক্ষা করতে হবে ১০ ডিসেম্বর শনিবার পর্যন্ত।  

কিন্তু সেই জবাবের আগেই বিএনপি ও সরকারি দল আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহী নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। দেশের গণমাধ্যমেও বিএনপির সমাবেশ ও স্থান নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্ট কিছুটা হলেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপির অভিযোগ উত্তেজনায় ঘি ঢালছে। তাদের নেতাকর্মীদের সমাবেশে আসতে বাধা দিতেই সরকার গ্রেপ্তারের পথ বেছে নিয়েছে বলছে তারা। তবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বলছে, এটা নিয়মিত অভিযানের অংশ। এ নিয়েও চলছে নানারকম আলোচনা-সমালোচনা।

তবে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ১০ ডিসেম্বর নিয়ে যা হচ্ছে সবই বাগাড়ম্বর। আমরা যদি একটু পিছন দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টির একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। গত অক্টোবর থেকে বিএনপি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ শুরু করেছে। এসব সমাবেশ করতে গিয়ে নানান প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে অন্যতম পরিবহন ধর্মঘট। প্রত্যেকটি বিভাগীয় সমাবেশের আগে শুধু চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ছাড়া আর সব জায়গায় পরিবহন ধর্মঘটের কারণে বাধাগ্রস্ত হয় সমাবেশে জমায়েত। কিন্তু কোনো সমাবেশেই কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। প্রতিটি সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। বরং সমাবেশের নির্ধারিত তারিখের আগেই বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশ স্থলে পৌঁছেছেন। 

এসব সমাবেশের কথা বিবেচনায় নিলে এটা স্পষ্ট যে, বিএনপি কিংবা সরকারি দল আওয়ামী লীগ কোনোরকম সহিংসতায় জড়াতে চায় না। রক্তারক্তি পরিস্থিতি তৈরি হোক এটা কোনো দলই চায় না। তবে যেহেতু ঢাকা দেশের রাজধানী, আর ঢাকা থেকেই সকল আন্দোলনের সূত্রপাত্র হয়, সে কারণে কিছুটা হলেও বাড়তি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। তার উপর আবার বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতারা ঢাকার সমাবেশকে ঘিরে যে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন সেটাও অস্থিরতার একটা কারণ হতে পারে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা ১০ ডিসেম্বর দলীয় কার্যালয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। একইভাবে আওয়ামী লীগের নেতারা শনিবার রাজধানীর মোড়ে মোড়ে পাহারার কথাও বলছেন। বিএনপি নেতারাও কোনো ছাড় দিতে নারাজ। এসব কারণে হয়তো বিএনপির ঢাকা সমাবেশকে ঘিরে উদ্বেগটা একটু বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তবে আমার বিশ্বাস, যত হুমকি, হুঙ্কার উভয়পক্ষ থেকে আসুক না কেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নিজেদের স্বার্থেই সংঘাত পরিহার করে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দলীয় কর্মসূচি শেষ করবেন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কেন মনে হচ্ছে যে, ১০ ডিসেম্বর কোনোরকম সহিংসতা ঘটবে না। তার কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। প্রথমত ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্ববাধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ওই সময়ে ক্ষমতা হারানো বিএনপি রাজনৈতিকভাবে বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।

দীর্ঘ ১৪ বছরে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দিলেও রাজপথে নিজেদের দলীয় নেতাকর্মীদের নামাতে পারেনি বললেই চলে। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সরকার পতন ও নির্বাচন বাতিলের দাবিতে বিএনপি ও তাদের শরিক জামায়াতে ইসলামী সারাদেশে ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। লাগাতার অবরোধের নামে ওই সময়ে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে পেট্রোল বোমা, অগ্নিসন্ত্রাস, অতর্কিত হামলার কারণে। কিন্তু বিএনপি সেই সময়ের আন্দোলন থেকে কোনোরকম ইতিবাচক ফল ঘরে তুলতে পারেনি। বরং রাজনৈতিকভাবে বিএনপি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় দলটি। সে ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই তারা ভুলে যায়নি। 

তারপর থেকে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে সরকার পতন আন্দোলনের কথা বললেও কার্যত কোনোরকম আন্দোলনই রাজপথে গড়ে তুলতে পারেনি। এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এইবার বিএনপি সারাদেশে বিভাগীয় সমাবেশের মধ্য দিয়ে দলের কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ নেয় তাতে বেশ ইতিবাচক ফল পেতে শুরু করে। গত কয়েকটি সমাবেশের মধ্য দিয়ে মাঠ পর্যায়ে ঝিমিয়ে পড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা চাঙ্গাভাব এসেছে। যা আগামী দিনে দলের আন্দোলন সংগ্রামে কিংবা আগামী নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া বিএনপির জন্য এটা খুবই ইতিবাচক এবং বড় প্রাপ্তি।  

অপরদিকে বিএনপির সমাবেশের কারণে সরকারি দল আওয়ামী লীগও লাভবান হয়েছে। ১৪ বছরে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা নানাভাবে নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত থাকলেও দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করা কিংবা সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে চাঙ্গা করার কাজে দেখা যায়নি। বরং হাইব্রিড ও নব্য আওয়ামী লীগারদের ক্ষমতার দাপটে দলটির প্রকৃত নেতাকর্মীরা বলতে গেলে গত ১৪ বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে আছেন। গত প্রায় দুই মাস ধরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ঘুম ভাঙ্গাতে একটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এটা আওয়ামী লীগের জন্য শাপেবর! কারণ আর এক বছর পর দেশে জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে এসে বিএনপি সমাবেশ করে কার্যত আওয়ামী লীগেরই উপকার করেছে। ক্ষমতার আষ্টেপৃষ্ঠে ডুবে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জাগিয়ে তুলতে এটি বড় ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করি।    

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের জবাবে আওয়ামী লীগ যশোর ও চট্টগ্রাম সমাবেশ করেছে। এসব সমাবেশে সরকার প্রধান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বক্তব্য রেখেছেন। প্রত্যেকটা সমাবেশে লোকসমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। বুধবার কক্সবাজারেও সমাবেশ করছে আওয়ামী লীগ। সামনের দিনগুলোতে দেশের আরও অনেক জায়গায় সমাবেশ করবে দলটি।

এসব কারণে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি সংঘাতের পথে যাবে বলে মনে হয় না। কারণ দুই দলের নেতাকর্মীরাই এখন চাঙ্গা। দলকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার কাজে ব্যস্ত। তবে এটা নিশ্চিত যে, ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা সমাবেশকে ঘিরে দেশের রাজনীতি বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাতে যে রাজনৈতিক উত্তাপ, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সমাবেশ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেটি বহাল থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক
 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়