ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৩ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ১০ ১৪৩১

বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে মোড়কের আদলে তৈরি সীমানা প্রাচীর

রুমন চক্রবর্তী, কিশোরগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৩৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৭:৩৫, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে মোড়কের আদলে তৈরি সীমানা প্রাচীর

রাকিব হাসানের বাড়ির দেয়ালে লাগানো বইয়ের নাম পড়ছেন কয়েকজন পথচারী

মোবাইল, গেমস ও মাদক থেকে দূরে সরিয়ে এনে বর্তমান প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে অভিনব এক চিন্তার ফসল মোজাম্মদ রকিব হাসানের বাড়ির সীমান প্রাচীর। প্রধান ফটকের পাশের প্রাচীরে শোভা পাচ্ছে বরেণ্য মানুষদের লেখা বিভিন্ন বইয়ের মোড়ক। কালজয়ী ৩৩টি বইয়ের মোড়কে নিজের বাড়ির প্রাচীরটি দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজিয়েছেন তরুণ বইপ্রেমী রকিব হাসান। বইকে ভালোবেসে ও বইয়ের প্রতি মানুষের উৎসাহ বাড়াতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

রকিব হাসানের বাড়ির নাম আনন্দধারা। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়নের তালেখাঁর ভান্ডা গ্রামে এই বাড়িটির অবস্থান। ২০২৩ সালে বাড়িটির সীমানা প্রাচীর প্রস্তুত হয়। এরপর থেকেই দূর-দূরান্তের মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এছাড়া, ভাষার মাসে বাড়িটির সীমানা প্রাচীরের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় তা দৃষ্টি কাড়ে সবার। বইপ্রেমী প্রয়াত বাবার প্রতি শ্রদ্ধা আর বর্তমান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে বই পড়ায় উৎসাহ দিতে রকিব হাসান এই কাজটি করেছেন। তার ব্যতিক্রমী এমন উদ্যোগ প্রশংসা পাচ্ছে এলাকার সবার কাছে।

বাড়িতে প্রবেশের প্রধান গেটটি ঠিক বইয়ের মতো। গেটের দুই পাশের সীমানা প্রাচীর দেখলে মনে হবে যেন বিশাল বুকসেল্ফ। যেখানে সাজানো রয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, জসীম উদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, আনিসুল হকের ‘মা’, হিসাম আল আওয়াদির ‘বি স্মার্ট ইউথ মুহাম্মদ’, স্যার সৈয়দ আমীর আলীর ‘দ্য স্পিরিট অব ইসলাম’, ‘ইসলামী ফাউন্ডেশনের ‘সীরাতে ইবনে হিসাম’, সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভধারিণী’, সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’, ‘হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’, আরিফ আজাদের ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’, খালেদ হোসেইনির ‘দ্য কাইট রানার’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’, জীবনানন্দ দাসের ‘বনলতা সেন’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ট্রাইটন একটি গ্রহের নাম’ ও ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, আলেক্সান্দর বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’, জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’, হুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’র মতো ৩৩টি কালজয়ী পাঠকনন্দিত বই।

নবম শ্রেণির স্কুল শিক্ষার্থী তাহমিনা সহপাঠীদের নিয়ে প্রতিদিনই বাড়িটির সামনে দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করেন। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে বাড়িটির সামনে এমন বইয়ের মোড়ক দেখে তারা বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এমন গুণিজনদের বইয়ের মোড়কগুলো দেখতে দেখতে এখন বইগুলোর নাম তাদের মুখস্ত হয়ে গেছে। এখন বইগুলোর মোড়ক নয়, ভেতরের কাহিনীগুলোকে তারা জানতে চান। শুধু পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ না থেকে তারাও বিভিন্ন কালজয়ী বই পড়তে চান।

দোতলা বাড়িটি নির্মাণের পর ২০২০ সালে বইয়ের মতো করে সীমানাপ্রচীর নির্মাণের কাজে হাত দেন রকিব হাসান। প্রথমে ইটপাথর দিয়ে প্রাচীরের কাঠামো তৈরি করে তার ওপর বসানো হয় স্টিলের পাত। যেখানে বুকসেল্ফের মতো করে সাঁটানো হয় বিভিন্ন বইয়ের মোড়ক। 

জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত শামছুল হক ভূঁইয়ার ছোট ছেলে রকিব হাসান বইপাগল মানুষ। তার বাবার ছিল বইয়ের প্রতি দারুন অনুরাগ। ছয় ভাই-বোনের সবারই রয়েছে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা। বইপড়া ও জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহ দিতেই অভিনব উদ্যোগটি গ্রহণ করেন তিনি।

সরারচর শিবনাথ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক মো. শাহজাহান রাকিব হাসানের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রকিব আমার প্রাক্তন ছাত্র। আজ মনে হচ্ছে তাকে বিদ্যান বানাতে আমার যতটুকু শ্রম ছিল তা স্বার্থক। আসলে সে ছোট থেকেই পড়ালেখায় বেশ উদ্যমী। মানুষকে বইয়ের প্রতি আসক্ত করার তার যে প্রয়াস, সেটি অতুলনীয়। আমি আশা করি, তার এমন উদ্যোগের ফলে বর্তমান প্রজন্ম অনেক কিছুই জানতে পারবে এবং তাদের মধ্যে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

এমন সুন্দর কাজটি করতে ঢাকা থেকে প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেন এবাদত হোসেন। তিনি জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন ধরনের কাজ তিনি আগে কখনো করেননি। রকিব হাসান যখন তার সঙ্গে দেখা করেন এবং এমন একটি পরিকল্পনার কথা বলেন, তখন থেকেই কাজটি কিভাবে করা যায়, সে বিষয়ে ভাবতে থাকেন। ধীরে ধীরে সব পরিকল্পনা শেষে প্রায় ছয় মাসে কাজটি এখন প্রায় শেষের পথে। কিছু কিছু কাজ বাকি রয়েছে।

রকিব হাসানের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, বইয়ের প্রতি একটা মানুষের যে এমন আসক্তি, তার সঙ্গে দেখা না হলে বুঝতেই পারতাম না। 

মোহাম্মদ রকিব হাসান জানান, বুকসেল্ফের মতো সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে দক্ষ কারিগর পেতে অন্তত ছয়মাস খোঁজাখুজি করতে হয়েছে তাকে। তাদের (শ্রমিকদের) সঙ্গে দিনরাত লেগে থেকে অবশেষে কাঙ্খিত অবয়ব পায় দেয়ালটি। তবে এখানে থেমে থাকতে চান না তিনি। তার বাড়িতে বড়সড় একটি লাইব্রেরি করার ইচ্ছা রয়েছে। যেখানে বিনা খরচে এলাকার তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী লোকজন বই পড়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারবে। ইতোমধ্যে সে কাজটিও শুরু করেছেন তিনি। বই আর বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম নিয়ে সুদূরপ্রসারী ভাবনা রয়েছে রকিব হাসানের। তিনি চান এক সময়ে মানুষের বইয়ের প্রতি যে অনুরাগ ছিল, তা আবারো ফিরে আসুক সবার মধ্যে।

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়