ঢাকা     মঙ্গলবার   ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৭ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ব্রায়ান লারা, ক্রিকেটে সৌন্দর্য্য যেখানে শেষ কথা

ক্রীড়া ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৫১, ২ মে ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
ব্রায়ান লারা, ক্রিকেটে সৌন্দর্য্য যেখানে শেষ কথা

ব্রায়ান চার্লস লারা ব্যাট হাতে যখন মাঠে নামে, তখন যেন অপার্থিব সৌন্দর্য্য ভর করে সেই ক্রিকেট মাঠে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মানুষ ঘোরে পড়ে থাকে লারার দারুণ সব আঁকিবুকির। ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার আজ ১৩ বছর পরেও তাই লারাতে মুগ্ধ অগণিত ক্রিকেট ভক্তরা। আজ ক্রিকেটের এই বরপুত্রের জন্মদিন।

ক্রিকেট মাঠে ব্রায়ান লারা খেলতেন রাজার মতো। ব্যাট হাতে প্রবল দাপট এবং ঔদ্ধত্যের সাথে অসাধারণ দৃষ্টনন্দন শট করার ক্ষমতা তাকে বাকী সবার থেকে আলাদা করে তুলেছে। ১৯৯০ সালে স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস অবসর নেওয়ার পর থেকে মরতে বসে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট। উইন্ডিজদের মনের মধ্যে তাই ক্রিকেট বাঁচাতে এমন কাউকে দরকার ছিল যিনি দর্শকদের আটকে রাখতে পারবেন। আর তখনই ব্রায়ান লারার আবির্ভাব। যিনি পরবর্তী সময়ে আধুনিক ক্রিকেটে পৃথিবীর সেরা তারকা হয়ে ওঠেছিলেন। শুধু ক্যারিবিয়ান না, লারার নেশায় মত্ত হয়েছে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব।

যা তাকে এনে দিয়েছে সর্বকালের সেরা ক্যারিবীয় ক্রিকেটারের মর্যাদা। যদিও অনেকে বলে থাকে ক্যারিবীর ক্রিকেট মানে স্যার ভিভ, গর্ডন গ্রিনীজ, ক্লাইভ লয়েড এমন আরও অনেকে। তবে এদের সাথে লারার পার্থক্য, এসব কিংবদন্তিরা প্রায় একই সময়ে স্বর্ণালী একটা দল পেয়েছিলেন। আর লারা ভগ্নদশা এক রাজ্যের একাকী নায়ক ছিলেন। যার ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় কেটেছে একাকী যুদ্ধ করে। আর সে যুদ্ধ জয় করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। লারার তেমনই কিছু ইনিংসে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

অজিদের বিপক্ষে দ্বিশতকে লারার উত্থান

১৯৯৩ সালে সিডনিতে প্রথম দ্বিশতকের জন্য লারা যখন মাঠে নামেন তখন তাঁর নামের পাশে ৫ টেস্টে ৬৪ সর্বোচ্চতে মাত্র ২৪৪ রান লেখা। আর সিডনীর ওই এক ইনিংসে লারা নাড়িয়ে দিয়েছেন সবকিছু। ৩৮ বাউন্ডারিতে ৭৫ স্ট্রাইক রেটে ২৭৭ রান করেছিলেন লারা। ক্রিকেটে নতুন পা রাখা কারো জন্য এটা গর্বের সর্বোচ্চ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় লারাকে। কারণ রান আউটে কাঁটা পরেন তিনি। তবে সেদিনই নিজের উত্থান জানান দেন লারা। এরপর থেকে ভঙুর উইন্ডিজকে একা কাঁধে টেনে নিয়েছেন লারা।

অ্যান্টিগায় বিশ্বরেকর্ডের চূড়ায় আরোহণ

১৯৫৮ সালে স্যার গ্যারি সোবার্স পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৬৫ রানের ইনিংস খেলে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস নিজের দখলে রেখেছিলেন ৩৬ বছর। এরপরে লারা ম্যাজিক। ১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠ অ্যান্টিগায় ছাড়িয়ে গেছেন স্বদেশী সোবার্সকে। করেছেন রেকর্ড ৩৭৫ রান।

রেকর্ড করার পথে ব্যাটিং করেছেন আড়াই দিনের মতো। প্রথম দিন যখন মাঠ ছাড়েন তখন নামের পাশে ১৬৪ রান। দ্বিতীয় দিনে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি। তবে ৩২০ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন সেদিন।

তৃতীয় দিন ক্যারিবীয় সুর বাজাতে অ্যান্টিগা ছিল পরিপূর্ণ। সোবার্সও চলে এসেছিলেন মাঠে। জানতেন ছন্দে থাকা লারা ছাড়িয়ে যাবেন তাকে। ভুল হয়নি কারোই। নিজের ট্রেডমার্ক পুল শটে ছাড়িয়ে যান সোবার্সকে। মাঠের সব দর্শক মাঠে ঢুকে যায় তাকে অভিনন্দন জানাতে। এই রেকর্ড টিকে ছিল ১০ বছর।

প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ৫০১* মাইলফলক ছোঁয়া

১৯৯৪ সালেই ব্যাট হাতে অমরত্ব পাওয়ার মতো আরেক কীর্তি গড়েন লারা। কাউন্টি দল ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে ডারহামের বিপক্ষে হাঁকান ৫০১ রান। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ও একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে এই কীর্তি নিজের করে নেন তিনি। এই অনন্য অর্জনে এখনো আছেন একা।

নিজেকে প্রমাণ করা দ্বিশতক

১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে অনেকে লারার পতন দেখে ফেলেছিল। আর তাদের এমন ভাবনাও অমূলক ছিল না। ১৯৯৫ সালে্র পর চার বছর উদযাপন করার মতো এমন কোনো মুহূর্ত পাননি লারা। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজও পার করছিল সবচেয়ে বাজে সময়। এমন সময় অজিদের বিপক্ষে মাঠে নামা লারার উইন্ডিজের।

বোর্ড থেকে বলা হয়েছে খারাপ খেললে অধিনায়কত্ব হারাবেন লারা। আর তখনই লারার ঝুলি থেকে আসে ২১৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস। একা হাতে সে ম্যাচে খেলেছিলেন তিনি। মাঠে যখন নামেন তখন উইন্ডিজ স্কোরবোর্ডের চিত্র ৫/২। অল্প সময়ের মধ্যে যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৪/৪। সেখান থেকে হাঁকান দ্বিশতক। এমন ইনিংস প্রমাণ করে লারার দৃঢ়তা, প্রবল চাপেও ভেঙে না পরার ক্ষমতা। লারা এই ইনিংসকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা ইনিংস মানেন।

সর্বকালের সেরা টেস্ট ইনিংসের মঞ্চায়ন

স্টিভ ওয়াহ ও রিকি পন্টিংয়ের সেঞ্চুরিতে ব্রিজটাউন টেস্টে শুরু থেকে চালকের আসনে ছিল অস্ট্রেলিয়া। সেটা ধরে রাখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে লারা মাঠে নামার আগে পর্যন্ত। লারা যখন মাঠে নামে তখন উইন্ডিজদের সামনে ৩০৮ রানের জয়ের লক্ষ্য। যা টপকাতে ৭ উইকেটে ক্যারিবীয়দের করতে হবে আরও ২২৩ রান।

এক প্রান্ত থেকে অজি বোলারদের পিটিয়ে লারা এক পর্যায়ে সমীকরণ দাঁড় করান উইন্ডিজের প্রয়োজন ৭০ রান। আর অজিদের ৫ উইকেট। পর মুহূর্তে ম্যাকগ্রার দ্রুত ৩ উইকেট শিকার বিপাকে ফেলে দেয় ক্যারিবীয়দের। কিন্তু কিছু কিছু দিন থাকে পাহাড়সম চাপও বিনা বাধায় অতিক্রম করে যায় নায়কেরা। লারা সেদিন ছিলেন তেমনই নির্বিকার। অজি বোলারদের সকল পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে বাউন্ডারি মারছিলেন সমানতালে। শেষ ব্যাটসম্যানকে যাতে পরীক্ষায় না পড়া লাগে তাই শেষ বলে নিচ্ছিলেন সিঙেল। শেষ পর্যন্ত ১৫৩ রানের এক অপরাজিত ইনিংস খেলে জয় ছিনিয়ে নিয়ে মাঠ ছাড়েন লারা। যে ইনিংসকে বলা হয় সর্বকালের সেরা টেস্ট ইনিংস। সে সিরিজের পরের দুই টেস্টেও ম্যাকগ্রা, লি, ওয়ার্নদের নিয়ে গড়া অজি বোলিং আক্রমণকে পাড়ার বোলিং বানিয়ে ফেলেছিলেন লারা। পরের টেস্টে ৮২ বলে করেছেন সেঞ্চুরি। এরপরের টেস্টে অ্যাডিলেকে হাঁকিয়েছেন ১৮২ রানের আরেকটি মহাকাব্যিক ইনিংস। আসলে লারার মাহাত্ম্য এখানেই, তিনি যখন খেলেন প্রতিপক্ষকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়েই খেলেন।

নিজের রাজত্ব ফিরে পাওয়ার লড়াই

২০০৪ সালে ম্যাথু হেইডেন যখন ৩৮১ রান করে লারার রেকর্ড ভাঙেন। হয়ত কল্পনাও করেননি ছয়মাসের মধ্যে লারা আবার ফিরিয়ে নিবেন নিজের আসন। লারা ফিরিয়ে নিয়েছেন নিজের আসন। অ্যান্টিগায় আবার ইংল্যান্ডকে সাক্ষী রেখে টেস্ট ইতিহাসের চূড়ায় উঠেছেন। নিজের করে নিয়েছেন ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। এবার আর ট্রিপল নয় প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে কোয়াড্রাপল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। অপরাজিত ৪০০ রান করে মাঠ ছেড়ে জানিয়েছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব।

ক্রিকেটকে দুই হাত ভরে দিয়ে গেছেন লারা। ৫৩ গড়ে টেস্টে করেছেন ১১৯৫৩ রান। ২৯৯ ওয়ানডেতেও আছে ১০৪০৫ রান। আর এর মাঝে লুকিয়ে আছে অনেক স্মরণীয়, অসাধারণ সব হৃদয় নাড়িয়ে দেওয়া মুহূর্ত। আর ক্রিকেটানুরাগীদের এসব মুহূর্তের আবেগে ফেলবেন বলে এইদিনে পৃথিবীতে এসেছেলিন ত্রিনিদাদের রাজপুত্র, ব্রায়ান চার্লস লারা।

 

ঢাকা/কামরুল

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়