ঢাকা     মঙ্গলবার   ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৭ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ভোটের ছুটিতে ঈদের মতো অবস্থা, তবে ভাড়া ও যানজটে ভোগান্তি

রেজাউল করিম, গাজীপুর ও আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:৪১, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ০৪:৫৬, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভোটের ছুটিতে ঈদের মতো অবস্থা, তবে ভাড়া ও যানজটে ভোগান্তি

সোমবার রাতে সাভার-নবীনগর থেকে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গগামী বাসের কাউন্টারে ঘরমুখো মানুষের এমন ভিড় দেখা যায়, যেন ঈদের ছুটির মতো অবস্থা। ছবি: রাইজিংবিডি।

ঈদের ছুটির মতো অবস্থা। বাসস্ট্যান্ডে দূরপাল্লার বাস ধরতে ঘরমুখো ভোটারদের ব্যতিব্যস্ত। কারো হাতে ব্যাগ, কারোবা মাথায় বস্তা। অনেকেই পরিবার নিয়ে অপেক্ষায় বাসের। আবার দল বেঁধে পিকআপে, ট্রাকে বাড়ির পথে চলেছে মানুষ।

সোমবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অবধি গাজীপুর এবং সাভার হয়ে ‍উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার মহাসড়কগুলোতে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। আর তাতে চিরচেনা যানজটও ভুগিয়েছে যাত্রীদের, যাদের বেশিরভাগই ভোটার। তারা ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছেন। মঙ্গলবার দিনের বেলাতেও ঘরমুখী মানুষের চাপ থাকবে বলে জানা গেছে।

আরো পড়ুন:

চাকরি ও কর্মসূত্রে ঢাকা ও গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখ লাখ মানুষ বসবাস করেন। কর্মজীবী এই বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে, মফস্বল শহরে। তারা নিজ নিজ এলাকার ভোটার। গত ১৭ বছর ধরে ভোট দিতে না পারা বহু মানুষ এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান, যা নির্বাচনি প্রচারের সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ঘিরে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও পোশাক শ্রমিকরা পেয়েছেন চার দিনের ছুটি। এই সুযোগে ঢাকা ও গাজীপুরের অস্থায়ী ঠিকানার ভোটাররা তাদের স্থায়ী ঠিকানার পথে ছুটেছেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রায় দেবেন দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা। এই উপলক্ষে ১১ ফেব্রুয়ারি (বুধবার), ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সাধারণ ছুটি। পরদিন শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। অবশ্য শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, কর্মচারীদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারিও (মঙ্গলবার) ছুটি। এই সূচি ধরে যেমন ভোট দেওয়ার জন্য, তেমনি স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্যও মানুষ বাড়ি ছুটছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যাত্রীর চাপ, যানজট
দেশের সবচেয়ে জনবহুল মহানগর গাজীপুর। এবার ভোট ঘিরে চার দিন ছুটি পাওয়ায় গাজীপুরের পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বাড়ি যাচ্ছেন। প্রায় সব কারখানার শ্রমিকদেরই ছুটি দেওয়া হয়েছে। সোমবার ছুটি শুরুর আগের রাতে বিপুল পরিমাণ শ্রমজীবী মানুষ মহাসড়কে নামায় গাজীপুরে চন্দ্রা ও এর আশেপাশে উত্তরবঙ্গগামী ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। একই অবস্থা দেখা যায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও। 

শ্রমিকরা জানান, ভোটের ছুটিতে ভোট দিতে তারা বাড়ি যাচ্ছেন। সন্ধ্যার পর থেকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত যানবাহন ধরতে পারছিলেন না। ফলে অনেকেই ট্রাক, পিকআপেও ফিরছেন বাড়িতে। সন্ধ্যার পর যাত্রীর চাপ থাকলেও রাত ৯টার পর থেকে যানজট লেগে যায়।

গাজীপুরে কোনাবাড়ি এলাকায় গার্মেন্টসে কাজ করেন মাহবুব আলম। রাত ১০টার দিকে তার সঙ্গে কথা হলে রাইজিংবিডি ডটকমকে তিনি বলেন, “ভোটের জন্য চার দিন ছুটি দিয়েছে। বহুদিন পর ভোট দেব। এজন্য কষ্ট হলেও বাড়ি যাব। তবে গাড়ি পাওয়া কষ্টকর হয়ে উঠেছে।”

মহাসড়ক দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, গাজীপুরের চন্দ্রা দিয়ে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছেন শিল্প কারখানার শ্রমিকেরা, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রার আশেপাশে তাই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ট্রাফিক পুলিশ মহাসড়ক সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে।

পোকার কারখানার শ্রমিক কাওছার হোসেন বলেন, “গাজীপুরের প্রায় সব কারখানা আজ (সোমবার) ছুটি হয়েছে, তাই যানজট লেগে গেছে। আগামীকালও (মঙ্গলবার) যানজট হবে। এজন্য রাতেই রওনা হয়েছি। মূলত ভোটের ছুটি হয়েছে ৪ দিন। ভোটও দেওয়া হবে, গ্রামেও সময় কাটানো যাবে। এককথায় বলতে গেলে ঈদের মতো আনন্দ লাগছে।”

নাওজোর হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম জানান, ভোটের জন্য টানা কয়েকদিন ছুটি হয়েছে শিল্পকারখানায়। এজন্য মহাসড়কে মানুষ ও যানবাহনে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিছু স্থানে যানজটেরও সৃষ্টি হয়েছে।

সাভারে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়, বাস সংকট, বাড়তি ও যানজটে ভোগান্তি
কোলে ১৬ মাস বয়সি সন্তানকে নিয়ে বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বসে ছিলেন সুলতানা নাসরিন। যাবেন বগুড়ায়। তবে গাড়ি পাননি প্রায় ৩ ঘণ্টায়ও, পেলেও চাওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। সড়কের পাশে বসেই শিশুকে দোকান থেকে খাবার কিনে খাওয়াচ্ছিলেন তিনি, বসে থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ। ভোটের কারণে পাওয়া চার দিনের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যেতে এসে এমন পরিস্থিতি সুলতানার। 

শুধু সুলতানার নয়, ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় গিয়ে সোমবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আরো বহুজনের ক্ষেত্রে দেখা যায় এমন দৃশ্য। ঈদের মতো ঘরমুখো মানুষের মধ্যে পথের ক্লান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো।

সরেজমিনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কালামপুর, ঢুলিভিটা, নবীনগর, সাভার বাসস্ট্যান্ড, আমিনবাজার ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ, বাইপাইল, আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের আশুলিয়া, জামগড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দেখা যায় ঘরমুখো যাত্রীর চাপ।

বিকেলে সাভার, আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী ধামরাইয়ের বিভিন্ন কলকারখানা ছুটির পরপরই দেখা যায় ঘরমুখো যাত্রীদের ঢল। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকে একাই আবার কেউ পরিবারসহ যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে। 

গাইবান্ধা যেতে কন্যা সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষা করছিলেন নাসিমা বেগম। তখন রাত ১০টা। ঈদযাত্রার মতো ভিড় হওয়ায় গাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির কারণে ভোগান্তিতে পড়েন তারা। সেই সঙ্গে তখনো বেতন না হওয়ায় বাড়ি যাওয়া নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় ছিলেন।

কথা হলে রাইজিংবিডি ডটকমকে তিনি বলেন, “দেশে (গ্রামে) তো ইলেকশনের উদ্দেশ্যেই যাইতেছি। কিন্তু এভাবে তো ভোগান্তি হইতেছে। ৫টা বাজে ছুটি হইছে, এখনো স্যালারি পাই নাই। স্যালারি যাওয়ার কথা, কিন্তু এখনো বেতন উঠতেছে না। বিকাশ থেকে টাকা বের করা যাচ্ছে না। বাচ্চারা রাতে খুব খারাপ অবস্থায় আছে। আজকেও টাকা পাব না। ভাড়া আরো বেশি হইতেছে। এই অবস্থায় আর যাইতে পারতেছি না।”

তিনি বলেন, “বাড়িতে মা-মুরুব্বি আছে, সবাই তাকায়া আছে যে কবে আসব। তাহলে কীভাবে আমরা যাব, বলেন? এই যে দুইটা বাচ্চা নিয়ে পথের মধ্যে বসে আছি; ভাড়া ৫০০, ৭০০, ১২০০, ১৫০০ বলতেছে। কীভাবে কি করব?”

ছুটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেতে বাসের অপেক্ষায় থাকা হাসান আলী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “টিভিতে বারবার দেখানো হচ্ছে, নিরাপদে যাওয়া যাবে, ভাড়া কম নেবে, বেশি নেবে না। কিন্তু কই সেই নিরাপত্তা? পুলিশ তো নাই। কোনো পুলিশ দেখতেছি না। আইনের লোক- কোনো আইনের লোকই দেখলাম না।”

ভোট উপলক্ষে গাজীপুরে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া পোশাক শ্রমিক আজিজুল ইসলাম বলেন, “আমি অটো দিয়ে আইতেছি। আমি থাকি আশুলিয়ায়। তিন দিনের ছুটি পাইছি- দুই দিন কোম্পানি দিছে, আর এক দিন এমনিতেই বাড়ির জন্য। এই ছুটিতেই তো বাড়ি যাওয়ার কথা।”

অতিরিক্ত ভাড়া ও বাস সংকটের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কেউ কেউ। 

ইমান আলী নামে এক যাত্রী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “এখন বাড়ির উদ্দেশ্যেই যাইতেছি। যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো ভোট দেওয়া। ভোটের উপলক্ষেই যাওয়া। কিন্তু গাড়ি তো পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক লোক যাচ্ছে এবার ভোট দেওয়ার জন্য। সবাই আগ্রহী।”

আবুল কালাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, “আমি পরিবার নিয়ে গাইবান্ধায় গ্রামের বাড়ি যাইতেছি। প্রায় ২০ মাইল অটো দিয়ে আইছি। এই পর্যন্ত আসার পর যে কোনো কাউন্টারে গেলেই সিট নাই, ভাড়া ১০০০ টাকার নিচে নাই। যেদিকেই যাই, ১০০০ টাকা লাগবেই। এই পর্যন্ত আসছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসন, কোনো খবর- কিছুই নাই। গাড়িও কম। গাড়ি তো নাই বললেই চলে। ক্যামেরা ধরেন, দেখেন গাড়ি আছে নাকি।”

তিনি আরো বলেন, “এখন এই অবস্থা হলে কেমনে যাব? অফিসে ডিউটি করি। বিকাশ, রকেট, নগদ- সব ক্যাশ আউট বন্ধ। টাকা আছে কিন্তু বের করতে পারতেছি না। আজকে ৫টার দিকেও টাকা বাইর করতে পারি নাই। হাওলাত করে নিয়া চলতেছি। বলছি, ভাই শনিবার বা রবিবার আইসা আপনার টাকা দিয়া দিমু।”

যাত্রীদের নানা অভিযোগ এবং সড়কে যানজটের বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার হাইওয়ে থানার ওসি শেখ শাজাহান বলেন, “সড়কে তেমন যানজট নেই। তবে কিছুটা ধীরগতি আছে। ছুটিতে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে এমনটি হয়েছে। ধীরে ধীরে এটি কমে যাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এজন্য কাজ করছেন।”

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়