Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ১১ ১৪২৮ ||  ১৭ সফর ১৪৪৩

‘তামিম বিশ্বকাপে থাকলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হতো’

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩০, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৭:০০, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
‘তামিম বিশ্বকাপে থাকলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হতো’

সবুজের সমারোহে বিশাল এক অট্টালিকায় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) প্রশাসনিক বিল্ডিং। সেখানেই কর্মস্থল সাকিব আল হাসান-মুশফিকুর রহিমদের কারিগর নাজমুল আবেদীন ফাহিম। যিনি বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতে ‘ফাহিম স্যার’ নামেই পরিচিত।

তার রুমে যেতে দেখা গেল রাজ্যের ভিড়। খুদে ক্রিকেটারদের দেওয়া হচ্ছে নতুন জার্সি। নাম-নাম্বার মিলিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল খেলার কিট। নিজের চেয়ারে বসে তদারকি করছেন ফাহিম স্যার আর এটা-সেটা নোট করছেন। সালাম দিতেই বললেন, একটু বসো।

ক্রিকেটারদের জার্সি দেওয়া শেষে তার মুখে ফোটে কথার ফুলঝুরি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা, তামিম ইকবালের সরে যাওয়াসহ নানা বিষয় নিয়ে দেন সোজাসাপ্টা বক্তব্য। পাঠকদের জন্য সেটি তুলে ধরেছেন রাইজিংবিডির ক্রীড়া প্রতিবেদক সাইফুল ইসলাম রিয়াদ।   

 

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটুক দেখছেন?

নাজমুল আবেদীন: আমরা ওমানে গিয়ে কীভাবে রি-অর্গ্যানাইজড হই তার ওপর নির্ভর করবে এটা। আমার মনে হয় যে অবস্থায় আমরা থাকতে পারতাম, তা থেকে একটু পিছিয়ে আছি। ওখানে যে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ আছে সেটি আমাদের আত্মবিশ্বাস যোগাবে কোয়ালিফাইংয়ে ভালো খেলার জন্য। ওমান, স্কটল্যান্ড ও পাপুয়া নিউ গিনি; আমার কাছে ম্যাচগুলো সহজ মনে হয় না। যেহেতু ফরম্যাটটি টি-টোয়েন্টি এবং তারাও বিশ্বকাপ খেলতে আসছে, তাদের ফেলে দেওয়া যাবে না। আমার কাছে মনে হয় ওখানে কিছুদিন আগে যাওয়ার যে ব্যাপারটা আছে, সেটার ওপর নির্ভর করবে আমাদের কোয়ালিফিকেশন। আমরা যদি কোয়ালিফাই করতে পারি তাহলে আমাদের ভীষণ কঠিন একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেই কঠিন পরিস্থিতি আমাদের ভালো দল হিসেবে তৈরি করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বিশ্বকাপে গিয়ে (সুপার টুয়েল্ভ) আমরা ভালো করতে পারব।

দুজনকে রিজার্ভ রেখে ১৭ জনের বিশ্বকাপের স্কোয়াড দিয়েছে। এই দল নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট নাকি বাইরে থেকে কাউকে চাচ্ছিলেন?

নাজমুল আবেদীন: আমরা যে প্রক্রিয়ায় গত কয়েক মাস চলেছি, তাতে বাইরে থেকে কাউকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা দেখতে পাইনি। যারা ছিল তাদের মধ্যে আমরা সীমাবদ্ধ থেকেছি। বায়ো-বাবলের বিষয়টিও আছে। আমরা সর্বশেষ যে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ দেখেছি, সেখানে কিছু কিছু খেলোয়াড় ছিল, দুয়েকজন ওপেনার ছিল, দুয়েকজন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ছিল। মিডল অর্ডারে রাব্বির কথা বলতে পারি, ওপেনিংয়ে তাদের নাম মনে করতে পারছি না আর অনূর্ধ্ব-১৯ এর একজন খেলোয়াড় ছিল। আমার মনে হয় ওদের যদি আমরা এই পুলের মধ্যে নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে আমাদের অপশন বাড়ত। যেহেতু আমাদের হাতে অপশন নেই, ভালো হোক মন্দ হোক ওদের নিয়েই খেলতে হবে, সেই হিসেবে দলটি করা। ওরা সবাই প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়, অনেকেই আছে যারা ফর্মে নেই, এটা একটু ভয়ের কারণ। ওরা যদি ফর্ম ফিরে পায় ওখানে গিয়ে, সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সাকিব-মাহমুদউল্লাহ-মুশফিকের সপ্তম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। নিজেদের সবটুকু দেওয়ার এটাই কি তাদের সেরা সময়?

নাজমুল আবেদীন:  যে কোনো সময়ই সেরা সময়। বিশ্বকাপ তো একটা বড় মঞ্চ। সাকিব নিঃসন্দেহে একজন আন্তর্জাতিক মানের টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড়, মাহমুদউল্লাহ-মুশফিক টেস্ট, ওয়ানডে ঘরানার ক্রিকেটার। টি-টোয়েন্টি মানের খেলোয়াড় না। যেহেতু আমাদের টি-টোয়েন্টি বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটার খুব একটা ছিল না, আমরা ওভাবে ভাবিওনি, সেভাবে গড়েও ওঠেনি। আজকাল দেখছি কিছু কিছু খেলোয়াড় উঠছে। আস্তে আস্তে আমাদের সময় আসছে ওদের চেয়ে ভালো খেলোয়াড় তৈরি করার, যারা আছে তাদের নার্সিং করে নিয়ে আসার।  সেরা সময় বলব না, আমার মনে হয় ওদের জন্য এটা শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে; তাই তারাও চাইবে খুব ভালো খেলতে, এতদিন যা খেলেছে তার চেয়েও ভালো খেলতে চাইবে। আমাদের টি-টোয়েন্টি দল আগের তুলনায় একটু ভালো। ওরা যদি ক্লিক করতে পারে তাহলে সম্ভাবনা আছে।

তামিম ইকবালকে কতটা মিস করবেন?

নাজমুল আবেদীন: এখন বোধহয় একটু বেশি মিস করব। কারণ ওপেনাররা ফর্মে নেই। এরকম একটা অবস্থায় বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে যে চাপটা তৈরি হবে, ওটা কাটিয়ে ওঠার মতো দক্ষতা ওদের মধ্যে কতুটুক আছে আমি জানি না। তামিম অত্যন্ত অভিজ্ঞ একজন ক্রিকেটার। বড় মঞ্চে খেলার যে অভিজ্ঞতা আছে সেটা বোধহয় খুব কাজে লাগত। আমি এটা বলছি না তামিম গেলে ম্যাচ জিতেই যেত। কিন্তু এখন যারা গেছে, যে অবস্থায় আছে তার থেকে তামিম ভালো কিছু দিতে পারত। সে যদি দলে থাকত, খেলত তাহলে প্রিলিমিনারি রাউন্ডে আমি খুব স্বস্তি পেতাম।

তামিমকে আরেকটু জোরাজুরি করে খেলানো যেত কী না...

নাজমুল আবেদীন: আমরা শুনে এসেছি তামিম অটো চয়েস, তামিম দলে আছে, তামিমকে নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই। নির্বাচকদের মুখে এটাও শুনেছি, তার ব্যাপারে প্রশ্ন করায় বিরক্ত হয়েছে। যখন তামিম নিজে বলল, ‘আমি আর দলে নেই’। তখন সেভাবে কিন্তু তাকে অনুরোধ করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়নি। অনেকেই যেটা সরাসরি বলতে পারছিলেন না, তামিম নিজে থেকে সরে যাওয়াতে তাদের কাজটা সহজ হয়ে গেছে। এটাই বাস্তবতা। সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাশরাফি-রিয়াদ তাদের যে অবদান, সেটা প্রয়োজন না হলে চট করে ভুলে যাই। এটা খুব দুঃখজনক। তামিমের প্রয়োজন হয়ত ভবিষ্যতে থাকবে না, যে কেউ একজন এসে সেটা নিয়ে নিবে। আমি এখনো মনে করি আমাদের ওপেনারদের মধ্যে যে অবস্থা সেখানে তামিমের জায়গাটা হওয়া উচিৎ ছিল। তার এখানে অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।

সৌম্যরা বাদ পড়ে, আবার দলে ফেরে। তাদের নিজেদেরও প্রমাণ করার কোনো জায়গা থাকে না, এটা একজন ক্রিকেটারকে মনস্তাত্বিকভাবে কতটা পিছিয়ে রাখে?

নাজমুল আবেদীন: এটা তো অবশ্যই। কেউ যদি একটা কঠিন পরিস্থিতিতে পারফর্ম না করে আসে, তার আস্থার যে ব্যাপারটা সেটা কিছুটা তো আঘাত পায়, মানে নেগেটিভ অবস্থায় যায়। সে কারণে বোধহয় আমরা যদি বলি, বিশেষ করে সৌম্যের কথা, সে জিম্বাবুয়েতে খুব ভালো খেলেছে। কিন্তু সে খেলাটা কেমন করে খেলেছিল আমার মনে হয় সৌম্য নিজেও তা ভুলে গেছে। কারণ গত দুটি সিরিজে ওকে খেলানো না খেলানো বা খেললেও ভালো না করতে পারা, সবকিছু মিলে আমার মনে হয় সেটুকু হয়তো সে ভুলেও গেছে। তারপরেও হয়ত সিলেক্টররা আশা করছে যে ও ভালো উইকেটে ভালো খেলে। যদিও এটা সব সময় বড় যুক্তি হতে পারে না। যে ভালো খেলে, সে সবখানেই ভালো খেলতে পারে। তবুও আমরা আশা করব নিশ্চিতভাবে ও ভালো করবে। ও যদি খেলে, ওর ফর্মে ফিরে আসাটা জরুরি।

দশ ম্যাচে সাত জয়, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি, কতটুকু আত্মবিশ্বাস নিয়ে যেতে পারছে বাংলাদেশ?

নাজমুল আবেদীন: জয় থেকে দল তখন উপকৃত হয়, যখন সেখানে অর্জন থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে বেশিরভাগ জয়ের ক্ষেত্রে কোনো অর্জন ছিল না। এটাই বোধহয় পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক ব্যাপার। যদি এমন হতো যে আমরা কষ্ট করে জিতেছি, দুয়েকটা ম্যাচ কিন্তু আমাদের কষ্ট করে জিততে হয়েছে তাহলে ওখান থেকে আমাদের অর্জন হতো।

৯৪ রানের লক্ষ্যে পাঁচ বল আগে জিতছি, ওটাকে কি আপনি অর্জন বলবেন?

নাজমুল আবেদীন: হ্যাঁ, সেখানে কিন্তু অর্জন আছে। কারণ ৯৪ রান করতে গিয়ে আমরা পাঁচ বল আগে জিতেছি, শেষের দিকে যারা ছিল, মাহমুদউল্লাহ ছিল, তাদের কিন্তু কষ্ট করে জিততে হয়েছে। তো ওই যে কষ্টটা করতে হয়েছে, এটাই একটা অর্জন। কিন্তু ওভারঅল আমাদের ব্যাটিংয়ের যে ক্ষতিটা হয়ে গেছে, তা এই সিরিজের আগের ম্যাচগুলোতে হয়েছে। সেটারই বহিঃপ্রকাশ হয়ে ৯৪ রান করতে গিয়ে আমাদের এতগুলি উইকেট হারাতে হলো। যে প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলাম আমরা, তার মধ্যে যে ভুল ছিল সেটারই হিসাব মিলল।

কাল আপনারই একজন ছাত্র বলছেন এরকম উইকেটে ১০-১৫টা ম্যাচ খেললে ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যাবে, এ প্রসঙ্গে আপনি কী মনে করেন?

নাজমুল আবেদীন: না ক্যারিয়ার শেষ হবে না। কিন্তু যা হয়, সেটা হলো সবাই তো এসব আয়ত্ত করতে পারে না। লাগাতার ব্যর্থতা। এবং শুধু ব্যর্থতাই না, আমি যদি বলি আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়কে এই ব্যর্থতা সংশয়ী করে তুলবে। অনেকেই হয়তো ধারণা নিতে পারে, তাকে হয়ত বদলাতে হবে। সুতরাং সে যে এতদিন যেভাবে খেলে আসছিল সেখানে পরিবর্তন নিয়ে আসার চেষ্টা করলে সেটা তার জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। খুব শক্তিশালী যারা, অনেক অভিজ্ঞ, তারা হয়তো বুঝতে পারবে ভালো সময় আসলে আগের জায়গায় ফিরে যাবে। কিন্তু যারা নতুন এবং যারা এই খারাপ খেলার কারণে দল থেকে বাইরে যাবে তাদের জন্য ফিরে আসাটা খুব কঠিন হবে। কারণ তারা যখন বাইরে যাবে, যে কন্ডিশনে খেলানো হচ্ছে সেটা ব্যাটিং উপযোগী নাও হতে পারে। ভালো উইকেট হলে হয়তো তাদের এমন হতো না।

বিশ্বকাপে ২৫ ম্যাচ খেলে মাত্র এক ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছে মূল পর্বে, সেটাও ২০০৭ সালে। বড় দলের বিপক্ষে জয় নেই, আমরা হংকং, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে হেরেছি। এরপর কতদূর যেতে পারব?

নাজমুল আবেদীন: ওটা বলা খুব কঠিন। আমরা যখন কোয়ালিফিকেশনে, সেটাও তো একটা বড় ব্যাপার। আমি তো মনে করি আমরা যদি কোয়ালিফাই করতে পারি সেটা একটা বিরাট ব্যাপার হবে। দল হিসেবে টি-টোয়েন্টি খেলা খুব কঠিন, কারণ যে কোনো দলেই কিন্তু অন্তত ২-৩ জন খেলোয়াড় থাকে, যারা ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে। তাদের হাতে যদি আমরা পড়ি, তাহলে ম্যাচ জেতা কঠিন হয়ে যাবে। বড় দল যাদের আমরা বলি, তাদের হয়তো ৭-৮ জন খেলোয়াড় আছে। কিন্তু ছোট দলেও আছে ২-৩ জন, যারা ম্যাচ জেতাতে পারে। আমরা যদি আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ইংল্যান্ডের খেলার কথা মনে করি, আয়ারল্যান্ডের কেভিন ও’ব্রায়েন যে খেলাটা খেলেছে একাই কিন্তু ম্যাচ জেতাল। তারপর ওয়ানডে ম্যাচ বোধহয়। যাই হোক এজন্য আমাদের সাবধান হতে হবে, টিম হিসেবে ভালো খেলতে হবে।

পরের রাউন্ডে যাওয়ার কথা আমরা অনেকেই বলে যাচ্ছি। আমরাই যদি এটা ভাবি, তাহলে পরের রাউন্ডে যাওয়ার যোগ্যতা যেসব দলের আছে তারা কী ভাববে? আমরা হতে পারি র‌্যাংঙ্কিয়ে ছয় নম্বর দল, কিন্তু শক্তিমত্তায় আমরা কোথায় আছি, এটা বোধহয় আমাদের জানাটা জরুরি।

সবার স্কোয়াড তো দেখেছেন, কাকে ফেভারিট মনে হচ্ছে?

নাজমুল আবেদীন: আমরা মনে হয় দুই তিনটা দেশ নিশ্চিতভাবে (ফেভারিট) আছেই। ভারত তো নিশ্চিতভাবে আছে, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াও চলে আসতে পারে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আছে। তবে ওরা যেমন খুব ভালো করতে পারে, খুব খারাপও করতে পারে।

ঢাকা/ফাহিম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়