ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৯ ||  ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বসতভিটায় 

ফয়সাল আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৪৬, ২ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৩:২২, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বসতভিটায় 

“বিজ্ঞানলক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিম মন্দিরে
দূর সিন্ধুতীরে
হে বন্ধু, গিয়েছ তুমি; জয়মাল্যখানি
সেথা হতে আনি
দীনহীনা জননীর লজ্জানত শিরে
পরাইছ ধীরে।”

বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চরণগুলো লিখেছেন ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ নামক কবিতায়। জগদীশচন্দ্র বসুর একটি অসাধারণ গ্রন্থ ‘অব্যক্ত’। আমরা অনেকেই বইটি পড়ে বিজ্ঞান সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থটিতে ২০টি প্রবন্ধ রয়েছে। অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় জগদীশচন্দ্র বসু মূলত উদ্ভিদ জগত নিয়ে লিখেছেন গ্রন্থটিতে। বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপনা করার পথিকৃৎ হচ্ছেন জগদীশচন্দ্র বসু। 

বেতার যন্ত্রের আবিষ্কারক ও গাছেরও প্রাণ আছে এই তত্ত্বের আবিষ্কারক হিসেবে তিনি অধিক পরিচিত। ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর বিক্রমপুরের শ্রীনগর উপজেলার রাড়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আমি আগেই ভেবে রেখেছিলাম এবার বিজ্ঞানীর জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে রাড়িখাল যাবো। ভ্রমণসঙ্গী কাউকে পাওয়া যায়নি। তাই একাই রওয়ানা হয়ে গেলোম। গুলিস্তান থেকে চড়ে বসলাম মাওয়াগামী বাসে। বাবুবাজারের পর বুড়িগঙ্গা সেতুতে ওঠার পূর্বে যাত্রী ওঠাতে গিয়ে খানিকক্ষণ সময় নেওয়া ছাড়া দেশের সবচাইতে পরিকল্পিত অত্যাধুনিক সড়ক ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেস ওয়েতে খুব বেশি সময় লাগেনি। সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যেই নেমে যাই শ্রীনগরের ফেরিঘাট নামক স্থানে। 

দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোওয়ালাকে বলি বাড়িখাল জগদীশচন্দ্র বসুর বসতভিটায় যাবো। তিনি প্যাসেঞ্জারের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। যাত্রা শুরুর পূর্বে আমি একটি চায়ের দোকানে বসি। পরিচয় হয় বেশ আমুদে দোকানদার হক মোল্লার সঙ্গে। তিনি বেশ মজার মজার গল্প বলেন। শুধু ক্রেতা ধরে রাখার জন্য নয়, হয়তো এটা তার স্বভাবজাত। আমার চা পর্বটা হক মোল্লার গল্পে বেশ আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।  

আমি রওয়ানা হয়ে গেলাম রাড়িখালের উদ্দেশ্যে। শ্রীনগর উপজেলা বাইপাস সড়কে ধরে অটো মৃদু গতিতে এগিয়ে চলেছে। গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া শ্রীনগর-দোহার সড়ক ধরে চলেছি আমরা। খুব দূরে নয়, খানিকক্ষণ পরেই পৌঁছে যাবো ভুবনবিখ্যাত একজন বিজ্ঞানীর বাড়িতে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই পৌঁছে যাই রাড়িখালে একেবারে জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়ির আঙ্গিনার সামনে। জেসি বোস ইনস্টিটিউশন ও কলেজের দুটো অংশ। প্রথম অংশটি এখন মূলত পার্ক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ২০ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে অনেকেই প্রবেশ করছেন। এখানেই রয়েছে স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর নামে ছোট্ট একটি জাদুঘর। এটি অবশ্য নামেই জাদুঘর। বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত নেই। এর তত্ত্বাবধায়ক শেখ বাহাদুর জানালেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ যতোটুকু ব্যয় করতে পারেন সেভাবেই চলছে। সরকারী কোনো অনুদান নেই। আমি ছোট্ট জাদুঘরটি দেখে চলে যাই উন্মুক্ত স্থানে। বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে এর অবস্থান। রয়েছে কয়েকটি বড় পুকুর। শান বাঁধানো ঘাটে বেশ আরাম করে বসাও যায় যতক্ষণ ইচ্ছে। 

আমি এরপর চলে যাই স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর নামে প্রতিষ্ঠিত স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন ও কলেজের মূল কম্পাউন্ডে। মাঠের মাঝখানে বেশ পুরনো জীর্ণ দালান দেখতে পাই। এটিই ছিলো বিজ্ঞানীর পৈর্তৃক বসতবাড়ি। পিতা ভগবানচন্দ্র বোস ছিলেন ডেপুটি মেজিস্ট্রেট। তার আগে শিক্ষকতা করেছেন। অবস্থাপন্ন মানুষ ছিলেন। পিতার অনুপ্রেরণাতেই জগদীশচন্দ্র বসু বাংলা মাধ্যমে সরকারী জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর আইসিএস পরীক্ষা না দিয়ে স্বাধীনভাবে নিজে কিছু করার জন্য পিতার পরামর্শমতো বিলেতে চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়তে গিয়েছিলেন। যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞান তাঁর ভালো লাগেনি। এরপর তিনি ক্যাম্ব্রিজে পদার্থ বিজ্ঞানে ভর্তি হন এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে বিস্মকর ফলাফল করেন। 

মূল বাড়িটি বড়ো অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। আজ জন্মদিনে কলেজের উদ্যোগে আলোচনা সভা হচ্ছে। গতানুগতিক অনুষ্ঠান। দায়সারা বলা যায়। অধ্যক্ষ মহোদয় তার বক্তব্যে জানালেন, এতো বড়ো বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর নামে কলেজ অথচ বিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়েছে মাত্র ২ বছর হলো। তারপরও ভালো, বেটার লেট দেন নেভার। অবশ্য বিজ্ঞান বিভাগ চালু করলেই তো আর বিজ্ঞানী তৈরি হয় না। তবে যথাযথ সুযোগ সুবিধা দিতে পারলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্র হতে পারতো। মহান ঐতিহ্য ও ব্যক্তির বিশাল অবদান অনেক সময় অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানী বসু অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস হওয়ার মতো একজন বড়ো মাপের মানুষ। 

জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম মাইক্রোয়েভ প্রযুক্তির ওপর সফল গবেষণা করেন। পরবর্তীতে এই গবেষণার ভিত্তিতে আবিষ্কৃত হয় রেডিও। আমরা সকলে জানি, বিজ্ঞানী বসু সময়মতো প্যাটেন্ট জমা দিতে না পারায় একই সময়ে বেতারতরঙ্গ নিয়ে গবেষণারত ইতালির বিজ্ঞানী মার্কনি বেতারযন্ত্রের আবিষ্কারক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যান। 
জগদীশচন্দ্র বসুর উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে মাইক্রোয়েভ রিসিভার ও ট্রান্সমিটারের উন্নয়ন। তিনি আবিষ্কার করেন ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্র যা দিয়ে গাছের বৃদ্ধি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা যায়। উদ্ভিদের জীবনচক্র তিনিই প্রমাণ করেছিলেন। এছাড়াও এই বিজ্ঞানী আরো বহু মৌলিক আবিষ্কার করেছেন যা নতুন প্রজন্মের জন্য জানা জরুরি। 

“বিজ্ঞানও যে একটা সংস্কৃতি সেটা প্রমাণ করে গেছেন জগদীশচন্দ্র বসু” বলেছেন প্রখ্যাত উদ্ভিদবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা। দ্বিজেন শর্মার ভাষায়, “তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সেই অর্থে একটা বিরাট মূল্যবান সাংস্কৃতিক অবদান।”

বিবিসি’র জরিপে শ্রেষ্ঠ ৭ম বাঙালি হিসাবে নির্বাচিত এই বিজ্ঞানী মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। ছিলেন প্রতিবাদী ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ক্যাম্ব্রিজ থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ভারতে ফিরে এসে অনেক প্রতিকুলতার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। কিন্তু ভারতীয় হিসেবে তাকে অর্ধেক বেতন দেওয়া হতো। জগদীশচন্দ্র বসু এর প্রতিবাদে বেতন নেওয়া বন্ধ করে দেন। বিনা বেতনেই ছাত্রদের পড়ানো অব্যাহত রাখেন। এ সময়ে তিনি চরম অর্থকষ্টে পড়েন। অবশেষে ৩ বছর পর কর্তৃপক্ষ অন্য ইংরেজ শিক্ষকদের সমান বেতন প্রদান করতে বাধ্য হয়।

বিবিসি'র একটি প্রতিবেদনে লিখেছে, “আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে তাঁর আবিষ্কার নিয়ে ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্বখ্যাত বহু বিজ্ঞানীকে চমকে দিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। লন্ডনের একটি দৈনিক পত্রিকা ডেইলি এক্সপ্রেস তাঁকে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি দিয়েছিল।”

জগদীশচন্দ্র বসু ভারতে বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার প্রসার ঘটাতে কলকাতায় ১৯১৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। এই বিজ্ঞানমন্দির ভারতের বহু বিজ্ঞানীকে গবেষণা কাজে অনুপ্রাণিত করেছে। এঁদের মধ্যে সিভি রমন, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, আচার্য প্রফুলল চন্দ্র রায়ের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীও আছেন। 

জগদীশচন্দ্র বসু মারা যান ১৯৩৭ সালের ২৩শে নভেম্বর কলকাতায়। জগদীশচন্দ্র বসুকে বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার জনক। সমসাময়িককালে ভারতবর্ষে বিজ্ঞান চর্চা বিকাশে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কেও (১৮৬১-১৯৪৪) আমরা স্মরণ করবো।  মহান এই বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। 

আজ সারাদিনই আমি বিজ্ঞানীর স্মৃতিধন্য রাড়িখালে কাটাই। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। আমি দীর্ঘক্ষণ জেসি বোস ইনস্টিটিউশনের উদ্যানে বসেছিলাম। বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, জগদ্বিখ্যাত এক বিজ্ঞানীর স্মৃতিধন্য এই রাড়িখাল গ্রামের কথা। অধ্যাবসায়, কর্মের প্রতি ভালোবাসা, মানুষ এবং দেশের প্রতি গভীর মমত্বই এমন জগদীশচন্দ্র বসুর মতো মহৎ মানুষ সৃষ্টি করতে পারে। 

রাড়িখালের আরেক কৃতি সন্তান কবি, ভাষাবিজ্ঞানী ও লেখক হুমায়ুন আজাদের বসতবাড়ি ও সমাধিক্ষেত্র দেখে ঢাকার ফিরতি পথ ধরি। ফেরার পথে একজন অটোরিকশা চালকের মুখ থেকে হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে একটা কথা শুনে চমকে উঠলাম! তার ভাষ্য স্যারের বিশ্বাস থেকে তিনি লিখেছেন। স্যারের ভুল থাকলে তোরা লেখা দিয়ে জবাব দে! কিন্তু স্যারকে কেনো এভাবে নির্মমভাবে আঘাত করা হলো? এটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না। শেষে এ কথাও বললেন, ঢাকা শহর বলে স্যারকে এভাবে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে। আমাদের এখানে যদি স্যার থাকতেন, আমরাই রক্ষা করতাম স্যারকে! কোনো বাপের ব্যাটার সাধ্য ছিল না স্যারকে আঘাত করে! 
মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি নিয়ে উজ্জ্বল চোখে যখন আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি কথাগুলো বলছিলেন তখন বিস্মিত হয়েছিলাম। আসলে সাধারণ মানুষকে জাগাতে পারলে সকল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি চূর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সাধারণ মানুষকে উল্টো প্রতিক্রিশীলরাই ব্যবহার করছে এই দেশে। বুদ্ধিজীবীরাও বরাবর সাধারণ মানুষ থেকে দূরেই থেকেছেন!

স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিনে আমারও একটি অসাধারণ দিন কাটে। যাকে বলে কোয়ালিটি টাইম। ঢাকা শহরের একেবারে সন্নিকটে রাঢ়িখালের দু’জন কৃতি সন্তানের স্মৃতিধন্য স্থান দেখা এবং সেখানকার মানুষের সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসাটা আমার জন্য দারুণ একটি অভিজ্ঞতা বটে!

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়