ঢাকা     রোববার   ২৭ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৯ ||  ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

সাগর ও বোকা মানুষ 

ড. মইনুর রহমান  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৫৩, ২৩ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১২:১২, ২৪ নভেম্বর ২০২২
সাগর ও বোকা মানুষ 

প্রথমেই বলে নিই, আমি সাঁতার পারি না। পানি আমি প্রচণ্ড ভয় পাই, আর সাগরকে যমদূতের মত। ডিসকভারি চ্যানেলে সাগরের অতলে মানুষের চাইতেও তিনগুণ বড় বিদঘুটে দর্শন জেলিফিশ দেখে ছোটবেলায় গোসল করতে ভয় পেতাম। যাইহোক, কথাগুলো বলা গল্পের প্রসঙ্গে। অপ্রাসঙ্গিকও হতে পারে, কী জানি! 

মাছ ধরার ভূত আমার মাথায় ছোটবেলা থেকেই মোটামুটি ছিল। ঢাকার ইব্রাহিমপুরের সাবার্বান এলাকায় বৃষ্টিভেজা বিকেলে যখন অন্য বাচ্চারা ফুটবল খেলায় ব্যস্ত, বোকাসোকা ধরনের একটা ছেলে মাঠের পাশে জমে থাকা পানিতে তাকিয়ে মাছ খোঁজায় তখন নিবিষ্ট। ওইটাই আমি। 

বড় হলাম (যদিও আমার সন্দেহ)। কত বর্ষাকাল চলে গেল। ভুলেই গেছি প্রায়, মাছ ধরা আমার নেশাজাতীয় কিছু একটা ছিল। বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসে এতকাল পর হুট করে রুমমেটের গাড়ির ট্রাঙ্কে হাতজাল দেখে নেশাটা যেন আবার চেপে বসলো। না দেখলেই হয়ত ভাল ছিল। পানি দেখলে এখন যেমন মন মাছ মাছ করে, তখন হয়ত পানিকে পানি হিসেবেই দেখতাম। সেটা যে খুব ভাল করেই হয়নি, তা হয়ত অনেকেরই জানা। কিন্তু এইটা হয়ত আমারও জানা ছিল না, যা আমি ভুতের চাইতেও বেশি ভয় পাই; মাঝ দরিয়ার পানি- সেখানেই গিয়ে হাজির হবো মাছ ধরতে। 

দিন, জুনের ২১ তারিখ। আমার রুমমেট হুট করে এসে বলল, সাগরে মাছ ধরতে যাবে? আমি আগপিছ চিন্তা না করেই বললাম ‘যাব’। সাগর শব্দটা এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বের হয়ে গেয়েছিল। মাথায় রয়ে যায় শুধু মাছ। 

সেদিন আর কথা এগোয়নি। রুমমেট খুশিমনে প্রত্যেকদিন রিমাইন্ডার দিতে লাগল, আসছে শুক্রবার আমি যেন ঠিক সময়ে হাজির হয়ে যাই। হুট করে মনে পড়ল, এইরে! ওকে তো বলাই হয়নি, আমি সাঁতার জানি না। পরে আমতা আমতা করে বলতেই সাদা মুখ তার কাল হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কী জানি চিন্তা করে বলল, ‘এইবার চলো, লাইফ জ্যাকেট পরে চালিয়ে দাও’। কিন্তু তোমাকে সাঁতার শিখতে হবে। কথা দাও, তাহলে নিয়ে যাবো। 

এই বয়সে সাঁতার শিখব? কেমন জানি লাগছে। কিন্তু মাছ ধরার লোভ খুব বেশি। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কোনমতে রাজি করালাম। খুব একটা আশ্বস্ত হলো বলে মনে হলো না। যাইহোক, এসব বিছিন্ন ঘটনা। যার সাথে আসল ঘটনার মিল খুব কম, আবার আছে হয়ত। 

অবশেষে শুক্রবার রাত ৪টার ঘুটঘুটে অন্ধকারে যাত্রা শুরু করলাম। লক্ষ্য, ডলফিন আইল্যান্ড। ওইখানে দের একটি বিচহাউজ আছে। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু। যাওয়ার পথে খুব অদ্ভুত সুন্দর একটা মুহূর্তের মুখোমুখি হই। মেইনল্যান্ড থেকে যে ব্রিজটা ধরে ডলফিন আইল্যান্ড যেতে হয়, সেটার মাঝ বরাবর স্প্যানটা ভাল রকমের উঁচু, জাহাজ যাওয়া আসা করার জন্য। ওই উঁচু স্প্যানের চূড়ায় থাকা অবস্থায় পুরো দ্বীপটাই ভালমত দেখা যায়। আর দু’পাশে অথৈ সাগর। আমি যখন চূড়া পার হচ্ছিলাম, ঠিক তখনি ব্রিজের একপাশে সূর্যোদয় হচ্ছিল। আর অন্য পাশে চাঁদ অস্ত যাচ্ছিল। ব্রিজের একপাশের পানি সূর্যের লাল আবিরে বর্ণিল আর অন্য পাশটা চাঁদের রুপালি আলোয় বিকশিত। কোনও ক্যামেরা-ই হয়ত এই ছবি নিতে পারবে না। কোনও লেখা-ই সেই অদ্ভুত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে না। 

সময়ের আগেই হাজির। এরপর বোট পানিতে নামানো, হাল্কা খাওয়া-দাওয়া, হাসি-তামাশা। আমার রুমমেট জিমি। ওর বাবা আরেক পাগলাটে ‘বাতিকগ্রস্ত’ মানুষ, ঠিক আমার মত। মানুষটাকে যতই দেখি ততই ভাল লাগে। তাঁকে নিয়ে লিখতে গেলে পুরো গল্পের বই হয়ে যাবে। লিখব নাহয় কোনও দিন। 

যাত্রার শুরুটা অনেক শান্তশিষ্ঠ লেজবিশিষ্ট টাইপ। নিস্তরঙ্গ জলে বোটের পানি কেটে কেটে যাওয়া। তেমন ভয় লাগছিল না। ফুরফুরেই লাগছিল। আমার সফরসঙ্গী জিমি, ওর বাবা, জেফ্রি আর জেরেমি। দ্বীপের শান্ত চ্যানেল পারি দিতে দিতেই টোপের জন্য বেইট ফিশ ধরা হল (ক্রোকার)। পানি থেকে তোলার পর কক কক করতে থাকে, এজন্য বোধ হয় এই নাম। 

এই পর্যন্ত ঠিক-ই ছিল সব। আকাশ পরিষ্কার, পানি শান্ত। যখন চ্যানেল ছেড়ে সাগরে নামলাম, শুরু হল বিপত্তি। প্রচণ্ড ঢেউ। বোট রীতিমত আছড়ে আছড়ে যেতে লাগল স্রোত কেটে কেটে। আমি প্রাণপণে বোটের হ্যান্ডেল ধরে সূরা কালাম পড়া শুরু করে দিলাম। অবর্ণনীয় ভয়ে হাত-পা সব পেটের ভেতর ঢুকে যেতে লাগল। চারদিকে পানি আর পানি। আমার জীবন-মরণের মাঝে পিচ্চি একটি নৌকা। নিজেকে অনেক অসহায় লাগা শুরু হল। আমি ততক্ষণে লাইফ জ্যাকেট পরে নিলাম। আমার অবস্থা দেখে যেন জিমির বাবা বুঝে ফেলল, আমার মনে কী চলছে। ঠাট্টার ছলেই বলে উঠল, ‘আরে এত ভয় পাও কেন, এত বছর নৌকা চালাইলাম মাত্র দুই জন মানুষকে হারাইছি’। অ্যাঁ, বলে কী। ঠিক পর মুহূর্তেই বুঝলাম ওইটা কৌতুক ছিল। আমি শুকনা হাসি দিয়ে লবণাক্ত ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম। 

সাগরের ছিটে আসা পানিতে অলরেডি সবাই চুপচুপে। জিমির বাবা সান্ত্বনার সুরে বলল, এই স্রোত নাকি থাকবে না। ডলফিন আইল্যান্ড আর ফোর্ট মরগ্যানের ক্রসিং পার হলেই নাকি সব শান্ত। কে জানতো, কতবড় মিথ্যা আশ্বাস ছিল সেটা! আমাদের সব আশা-ভরসা মাটি করে দিয়ে পানি দিগুণ শক্তিতে অশান্ত হতে লাগল। হাতের ঠিক বামপাশটা ঘনকাল হয়ে গেল। এখান থেকেই দেখতে পেলাম বজ্রগুলো কীভাবে এঁকেবেঁকে এসে পানিকে চুম্বন করছে বার বার। একটু অশান্ত গলায় জিমির বাবা বলে উঠল, ‘মইন দেখতো ঝড়ের ফোরকাস্ট কী?’ আমার মুখ হা হয়ে গেল, বলে কী এই লোক! নৌকা নামানোর আগে নাকি আবহাওয়া দেখতে ভুলে গেছিল। 

আমি মোবাইল বের করে আবহাওয়ার অ্যাপ দিয়ে দেখি। ম্যাপ পুরো ঝরো মেঘে ভর্তি। জিমির বাবাকে দেখালাম। লোকটা একবার দেখল। দেখে কাঁধ শ্রাগ করে নৌকায় মন দিলো। দেখতে দেখতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। আমাদের পেছনে আর ডানে বড় বড় আর দুটো ঝড় শুরু হল। আর সামনে বৃষ্টি। জিমির বাবা আবার কৌতুকের সুরে বলে উঠল, তারমানে আমাদের সামনে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, কি বল? বোটভর্তি মানুষ হু হু করে গড়াগড়ি করতে লাগল। আর ততক্ষণে আমি জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছি। 

এরপর শুরু হল আমাদের দীর্ঘ তিন ঘণ্টার যাত্রা। লুক অফসোর ফিশিং স্পট। সময় যত গড়াতে লাগল, ততই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকলাম। আশপাশের ঝড়-বৃষ্টি, সাগর থেকে থেকে ছুটে আসা পানি; পানির ওপর বৃষ্টির শব্দ, বোটের পাশ দিয়ে ছুটে চলা ছোট ছোট মাছ। বৃষ্টি ধীরলয়ে ধরে আসতে লাগল। নৌকার দুলুনিতে মাথা ততক্ষণে চিনচিনে ব্যথা করা শুরু করেছে। সবাই ভাবল, সাগর বোধয় এবার শান্ত হবে। না সেটা আর হয়নি। ফিশিং পয়েন্টে যেতে যেতেই সাগর আর রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। এবার পাহার সমান ঢেউ। বোটের স্পিড কমিয়ে সেভেন নটে আনা হল। নৌকার সামনে থেকে থেকেই আকাশ ঢেকে দিয়ে কয়েকতলা উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল। 

জিমির বাবা খুব পাকা নাবিক। অনেক কৌশল করে বোটকে পানির পাহাড় বাইয়ে চলতে লাগলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার ঢেউগুলো পার হয়ে যখন বোট নিচে পড়তে লাগল, অদ্ভুত এক ভয়শূন্য অনুভূতি কয়েক ফ্র্যাকশান সেকেন্ডের জন্য পেটের ভেতর সব পাকিয়ে দিতে লাগল। সি-সিকনেসে ধরল নাকি আবার! সামনে তাকিয়ে দেখি জেফ্রির অবস্থা ‘ডাইল-খিচুড়ি’। বলতে বলতেই হড়হড় করে বমি করে দিল। বমি জিনিসটা মারাত্মক ছোঁয়াচে। আমার নিজেরই গা গুলিয়ে সব বাইরে চলে আসতে লাগল। তখন দূরদিগন্তে তাকিয়ে লম্বা নিশ্বাস নিয়ে জীবনের খুব সুন্দর একটি মুহূর্তের কথা চিন্তা করতে থাকলাম। ভুলে গেলাম মাথাব্যথা, গা গুলানি, সাগর, পানি, ঝড়, সাগরের ঢেউ- সবকিছু। 

দুর্বিষহ সেই তিন ঘণ্টা পার করে আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে পৌঁছলাম। জিপিএস-এ কোর্ডিনেট পিন পয়েন্ট করে সেখানে যেতেই ফিশ ফাইন্ডারে ভরে গেল সবুজ সবুজ বিন্দুতে। ওগুলো সব মাছ। বেশিরভাগই রেড স্ন্যাপার, অত্যন্ত সুস্বাদু। বলতে গেলে সাউথের মানুষ সব পাগল এই মাছের জন্য। হুট করে বোটে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। জিমির বাবা এক হাতে বোটের হুইল আর আরেক হাতে বরশিতে ক্রোকার গাঁথতে গাঁথতে আমার বলে উঠল বরশি ফেলতে। মাথাব্যথা তখন আমার চরমে। কাঁপা কাঁপা হাতে প্রায় ১০ কেজি ওজনের বিশাল বরশিতে মাছ গাঁথার ব্যর্থ চেষ্টা করে যেতে যেতেই জিমি চিৎকার করে উঠল ‘Fish, Fish’। 

দেখতে দেখতে বোটে উঠে আসল বিশাল সাইজের রেড স্ন্যাপার। কানকোর পাশে প্রচণ্ড ধারালো আর পিঠে বিশাল বিশাল কাঁটা। জিমির বাবা ন্যাকরা দিয়ে পেঁচিয়ে আনন্দে হেসে উঠল। না, সাগর তখনও সেই আগের মতই উত্তাল। বোট বার বার স্পট থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। বার বার নাক ঘুরিয়ে আবার জায়গায় আনা হচ্ছিল। বলতে বলতে জিমির বাবার বরশিতে উঠে আসল আর বড় একটা মাছ। এটা লাফাতে লাফাতে জেরেমির পা কেটে দিলো। বোটের তলা লাল রক্ত মেশানো সাগরের পানিতে ভরে গেল। জিমির বাবা আবার কৌতুকের সুরে বলে উঠল, ‘এখন তাহলে আমরা হাঙর ধরব’। 

খানিক বাদেই আমার বরশিতে টান অনুভব করলাম। প্রচণ্ড একটা ঝটকা। বুঝলাম মাছ। প্রচণ্ড টানে জীবন বাঁচানোর জন্য আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল পানিতে। তার হয়ত ধারণা নেই, যে তাকে ধরেছে তার অবস্থাও প্রায় একই। ৭২ ফুট লাইন টেনে উঠাতে উঠাতে জান প্রায় কোরবান। কোনমতে বেচারাকে টেনে ওপরে উঠিয়েই আমার দম শেষ। নাহ, এত বড় তো মনে হচ্ছে না। বরঞ্চ জিমি আর তার বাবার ধরা মাছের চাইতে ছোট। নিজের কাছেই লজ্জা লজ্জা লাগল। কিন্তু জিমির বাবা দেখি সেই খুশি। 

জীবনে প্রথম সাগরে এসে মাছ ধরা। সে আমার পিঠ চাপড়ে সাধুবাদ জানালো। আমি বোকা বোকা দৃষ্টিতে সাগরের পানিতে তাকিয়ে আছি। কী অদ্ভুত আকর্ষণে চুম্বকের মত আমাকে যেন টেনে নিচ্ছে! আশপাশের সব পানির আছড়ে পড়ার শব্দ। বাতাসের শব্দ, মাথার ওপর সিগালের ডাক, বোটের ইঞ্জিনের শব্দ; জিমির বাবার হাঁকডাক- সব যেন নিরব হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, পানিতে লাফ দিই। কী আর হবে! মরেই তো যাব। নাহ, কোনও পাগলামি-ছাগলামি আর করিনি। কিছুক্ষণ পরেই জেরেমি হুক্কাহুয়া শব্দে বমি করা শুরু করে দিলো। তা দেখে জিমিরও খারাপ লাগা শুরু হলো। জিমির বাবা আমার দিকে তাকাল, তাকিয়ে বুঝলো আমারও আর ইচ্ছা নেই। 

ফেরার পথে বলার মত আর কিছু হলো না। সব স্বাভাবিক। পানিও ঠান্ডা। ঝড় নেই, কড়া রোদ। শুধু তীর দেখার পর যে আনন্দটা হয়েছিল, বলার মত না। তবে, আবার যাব। যেতেই হবে, এবার সাঁতার শিখেই যাব। সাঁতার শিখে কি আসলেই লাভ হবে? 

লেখক: আমেরিকা প্রবাসী

ঢাকা/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়