ঢাকা     বুধবার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৯ ১৪২৯

মাওলানা ভাসানীর টাঙ্গাইলে

ফয়সাল আহমেদ  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৫৩, ১৭ জানুয়ারি ২০২৩  
মাওলানা ভাসানীর টাঙ্গাইলে

আমরা যখন টাঙ্গাইলের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে নামি তখন ঘড়ির কাটা দুপুর ১২টা পেরিয়েছে। আমাদের গন্তব্য টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর বাড়ি। এখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। সকাল সাড় ৮টায় মহাখালী থেকে রওয়ানা দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় টাঙ্গাইল পৌঁছালাম। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১ ঘণ্টা বেশি সময় লাগে। ভ্রমণসঙ্গী বন্ধু সুজন ও টিটু। সন্তোষ গন্তব্য হলেও সময় পেলে মোঘল আমলে নির্মিত আতিয়া মসজিদ এবং দৃষ্টিনন্দন মহেড়া জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখার ইচ্ছে আমাদের। আমার পাশের সিটে বসা টাঙ্গাইল শহরের ছেলে সাত্তার। সে ঢাকার উত্তরা এলাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। কীভাবে কোথায় যেতে হবে তার একটি গাইড লাইন দেয় সে। অবশ্য আমরা আজই ঢাকা ফিরবো শুনে, সবকিছু ঘুরে দেখে ফিরতে পারবো কি না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আব্দুস সাত্তার।

আমরা সাত্তারের সংশয় উড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর হই। টাঙ্গাইল শহরে নেমেই প্রথমে বাস্টস্ট্যান্ডের একটি দোকানে চা পান করে আমাদের ভ্রমণের মূল পর্ব শুরু করে দেই। সাত্তারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা নিয়ে রওয়ানা হয়ে যাই সন্তোষের উদ্দেশ্য। পথিমধ্যে পড়ে মাওলানা ভাসানীরই প্রতিষ্ঠিত কাগমারী মহাবিদ্যালয়। এর সঙ্গেই ঐতিহাসিক কাগমারী মাঠ। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানীর ডাকে এখানে বিশাল ঐতিহাসিক কৃষক সমাবেশ হয়েছিল। পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ববাংলার মানুষের উপর জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদে মূলত কৃষক সমাবেশ হলেও সারাদেশের শ্রমিক-ছাত্র-জনতা এই কাগমারী সম্মেলনে সমবেত হয়েছিল। এই সমাবেশ থেকেই মাওলানা ভাসানী পাকিস্তানকে ‘আস্সালামুআলাইকুম’  বলে প্রয়োজনে প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছিলেন।

আমরা কাগমারী থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে। খানিকটা ভেতরে ভাসানীর বাড়ি ও সমাধিস্থল হওয়াতে সিকিউরিটি গার্ড আমাদের সিএনজিসহ ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। মূল ফটকের বাইরে থেকেই সাউন্ডবক্সের প্রচন্ড শব্দ শুনতে পেলাম। ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনের পাশেই, মাওলানার সমাধিস্থলের খুব কাছে খোলা চত্বরে ছাত্রছাত্রীদের হিন্দি গানের তালে তালে নাচ-গান চলছিল। হোলি উৎসবের মতো রঙের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখে আমরা খানিকটা সতর্ক হয়ে যাই। কখন না আবার আমরাও আবির রাঙা হয়ে যাই। খোঁজ নিয়ে জানলাম আজ অনেকগুলো বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা মিলে ‘র্যাগ ডে’ উদযাপন করছে।

চলে আসি ভাসানীর সমাধিস্থলে। মাজার বলাই সঙ্গত। ভক্তরা মাজার বলেন। বিশাল উঁচু ছাদ এবং বিস্তৃত জায়গা নিয়ে সমাধিস্থল। লালসালুর মধ্যে নকশাঁর কাজ করা কাপড়ে আচ্ছাদন রয়েছে দুটি কবরে। পাশাপাশি দুটি কবর এখানে। একটি মাওলানা ভাসানীর অপরটি তাঁর স্ত্রী আলেমা ভাসানীর। কবরের পাশে একটি কুঁড়েঘর। মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দল ন্যাপের নির্বাচনী প্রতীক কুঁড়েঘর। আমরা কুঁড়েঘরের ভেতরে ঢুকে দেখতে পাই ভাসানীর ব্যবহৃত কাঠের মিটসেফ এবং চেয়ার রাখা আছে। সমাধিস্থলের তত্ত্বাবধায়ক বা খাদেম আমাদের সব ঘুরিয়ে দেখান এবং হুজুর সম্পর্কে নানাকিছু বর্ণনা করেন। কবরের বামপাশে একটি কক্ষ সংরক্ষিত আছে। এখানে মাওলানা ধ্যানে বসতেন বলে জানালেন খাদেম সাহেব। আসলে মাওলানা এই কক্ষটিকে ব্যক্তিগত অধ্যয়ন এবং প্রার্থনার জন্য ব্যবহার করতেন। খাদেম জানান প্রতি বছর জন্ম ও মৃত্যু দিবসে এখানে ‘ওরস’ হয়। 

খাদেম সাহেব হুজুরের অলৌকিক শক্তি সম্পর্কে আরো কতো কি বলছিলেন! ভাসানীর সমাধিস্থলের বাইরে পৃথক দুটি সমাধিতে শায়িত রয়েছেন তাঁরই দুই ছেলে। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা। সব কিছুই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরেই। আমরা মূল সমাধিস্থলের বাইরে এসে দরজার পাশে দেয়ালে টাঙ্গানো ব্যানারে দেখতে পাই মাওলানা ভাসানী ৪টি মারিফতি ধারার শেষ প্রতিনিধি। খাদেমও ব্যাখ্যা করে বললেন মাওলানা চারটি ধারার অনুসারী ছিলেন। তাঁর মূল পীরসাহেব ভারতের। ভবনের বাইরের দেয়ালে আরো কয়েকটি ব্যানারে মাওলানা ভাসানীর জীবনপঞ্জী টাঙ্গানো আছে। এখানে ভাসানীর কিছু রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের কথা আছে। আছে তাঁর সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসের কথাও। যদিও মাওলানা ভাসানীর এই সমাজতন্ত্র ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ বলা যায়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর পীর পরিচয়টাই এখানে মূখ্য হয়ে উঠেছে। অথচ মাওলানা ছিলেন এই উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব! আসলে তাঁর মূল পরিচয়ই রাজনৈতিক পরিচয়। 

সন্তোষে নতুন কেউ এলে, যিনি মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন এবং সংগ্রাম সম্পর্কে পূর্বে অবগত না হন, তিনি নিশ্চিতরূপে ভাসানীকে ‘কামেল পীর’ ভেবে ইচ্ছে পূরণের তবারক খেয়ে কিছু একটা মানত করে প্রশান্ত চিত্তে ঘরে ফিরবেন! এসব দেখে সম্প্রতি সুফীবাদের প্রতি খানিকটা আকৃষ্ট বন্ধু টিটু বলেই ফেলল তার কাছে মাওলানার জীবন কেমন যেনো জটিল ও গোলমেলে লাগছে। খাদেম সাহেবকে আমি বলেই ফেলি, আচ্ছা হুজুরের আধ্যাত্মিক কেরামতির পরিচয় তো পেলাম কিন্তু তিনি যে রাজনৈতিকভাবে অসাধারণ ‘কেরামতি’ জানতেন তার নিদর্শন কোথায়?

খাদেম বলেন, আছে, আছে, পাশেই একটি জাদুঘর রয়েছে যেখানে মাওলানার রাজনৈতিক জীবনের কিছু নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। তবে জাদুঘরের চাবি আবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। এর মধ্যে ভাসানীর এক নাতি এলেন দলবলসহ। চলাফেরা অনেকটা পীরের ছেলে বা নাতির মতই। আমরা তাঁর সাথে পরিচিত হই। তিনি তাঁর ভিজিটিং কার্ড দিলেন। কার্ডে দেখলাম তাঁর পরিচয় ন্যাপের একটা অংশের সভাপতি তিনি। ন্যাপের এই মুহূর্তে কয়টি অংশ আমরা জানি না। এক সময় ন্যাপের ১৩টি অংশ ছিল। আমরা তাঁর সাথে পরিচয় পর্ব সেরে জাদুঘর দেখার আগ্রহের কথা বলি। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চাবি আনার বিষয়ে শেষ পর্যন্ত অপারগতা জানালেন। কী আর করা! জাদুঘরের বাইরে সংরক্ষিত চীন বিপ্লবের মহান নেতা মাও সে তুং কর্তৃক উপহার দেয়া একটি ট্রাক্টর দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। এই ট্রাক্টর দিয়ে ধানচাষ হয়েছিল কিনা জানি না। আসলে ছোট্ট এই জাদুঘরে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু আক্ষেপ আমাদের জাদুঘর দেখা না-দেখা নিয়েও নয়। আক্ষেপ হচ্ছে মাওলানা ভাসানীর মতো নেতা যখন স্রেফ একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পীরে পরিণত হন সেটা নিয়ে। 

আরেকটি কারণে আক্ষেপ হয়, আসলে ‘লাল মাওলানা’ যেনো কারোরই হতে পারেননি। তিনি ছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে একজন নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক। জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ। এরপর আসাম, পশ্চিম বাংলা, পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের সর্বত্র যেখানেই রাষ্ট্রীয় বা আঞ্চলিকভাবে কোনো নিপীড়ন-নির্যাতন, অত্যাচার-জুলুম সংঘটিত হয়েছে সেখানেই মাওলানা ভাসানী প্রতিবাদ করেছেন। মানুষকে সংগঠিত করেছেন। সর্বশেষ বয়োবৃদ্ধকালেও ১৯৭৬ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহ দিক তুলে ধরে তাঁর নেতৃত্বেই ভারত অভিমুখে একটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাওলানা ভাসানীকে ব্যবহার করেছে অনেকে কিন্তু তিনি কাউকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। তাই মুসলিম লীগের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী-মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং সর্বশেষ ন্যাপের মতো বিশাল সংগঠনের মাধ্যমে প্রায় সকল বামপন্থীদের সংগঠিত করেও শেষ পর্যন্ত সব যেন শূন্যে মিলিয়ে গেল। খন্ডবিখন্ড হয়ে যাওয়াই যেনো ঐতিহাসিক নিয়তি ছিল মাওলানা ভাসানীর ন্যাপের এবং এই দেশের মানুষের স্বপ্নেরও। আজও অনেকে ভাসানীর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করছেন নানাভাবে। তাই আমার মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, মাওলানা তুমি কার? এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, নেতা যতোই বড় বা জনপ্রিয় হোন না কেন যথার্থ গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠন গড়তে না পারলে মৃত্যুর পর তাঁর নাম থাকবে কিন্তু সংগঠন থাকবে না। 

সন্তোষ দেখা শেষে আমাদের পরের গন্তব্য ঠিক করি আতিয়া জামে মসজিদ। তার আগে দুপুরের আহার সেরে নিলাম ক্যাম্পাসের সাথে লাগোয়া একটি ছোট্ট রেস্টুরেন্টে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন হওয়ায় খাবারের দাম পড়লো অবিশ্বাস্য রকম কম! খাবার শেষে পাশের একটি দোকানে গরুর দুধের কড়া লিকারের দারুণ স্বাদের চা পান শেষে অটোতে চড়ে আতিয়া মসজিদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। মোঘল আমলে স্থানীয় পন্নী জমিদার পরিবার কর্তৃক ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সম্পূর্ণ পোড়মাটি দিয়ে তৈরি মসজিদটির এখনো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। আমরাও দারুণ মুগ্ধ এমন টেরাকোটায় কাজ করা একটি মসজিদ দেখতে পেয়ে। এক সময় বাংলাদেশের দশ টাকার নোটে এই মসজিদের ছবি ব্যবহার হয়েছে। ফলে এটি অনেকের কাছে পরিচিত একটি মসজিদ।

এখানে আরেকটি এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। স্থানীয় একজন নারীর কাছে জানতে পারলাম এই এক গম্বুজ মসজিদটিও আতিয়া জামে মসজিদের সমসাময়িক। এখানে দুইজন বিখ্যাত পীরের মাজার আছে। সিলেটের শাহজালাল ও শাহপরানের মতো মামা-ভাগিনা পীরের মাজার। আতিয়া মসজিদ যাওয়ার পথে প্রথমে পড়বে ভাগিনা পীরসাহেবের মাজার। আতিয়া মসজিদ ফেলে একটু অগ্রসর হলে পাওয়া যাবে মামা অর্থাৎ মূল পীরের দরগা। 

অটোচালক আমাদের টাঙ্গাইল শহরের পাঁচআনি বাজারের গোপালের মিস্টির দোকানের কাছে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নেন। কেউ একজন বললো, টাঙ্গাইল এলে বিখ্যাত পোড়াবাড়ীর চমচম শুধু চোখে নয়, চেখেও দেখতে হয়। আমরা ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির দোকানে বসে মিষ্টি খাওয়া ও ঢাকার জন্য কেনার পর্ব শেষে একটি সিএনজি নিয়ে ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত মহেড়া জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। শহর অতিক্রম করার সময় পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের পরে হঠাৎ আমাদের চোখে পড়লো একটি সাইনবোর্ডে দিক নির্দেশনা দেয়া উপমহাদেশের বিখ্যাত জাদুশিল্পী পিসি সরকারের বাড়ি এই দিকে। সময় স্বল্পতার কারণে এটি দেখা হলো না আমাদের।

টাঙ্গাইল জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়ি এবং এগুলো বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে আজও। এর মধ্যে মধ্যে ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর করটিয়া জমিদার বাড়ি, মহেড়া জমিদার বাড়ি, পাকুল্লা জমিদার বাড়ি, দেলদুয়ার জমিদার বাড়ি, নাগরপুর জমিদারবাড়ি, ধনগোদা জমিদার বাড়ি উল্লেখযোগ্য। এতো জমিদার বাড়ি থাকতে মহেড়া জমিদার বাড়িতে কেনো? আমরা অবশ্য সময়ের বিবেচনায় একটি জমিদার বাড়িই বেছে নিয়েছি এই মুহূর্তে। এছাড়া ভবনের নান্দনিক শৈলীর দিকটাও এখানে খানিকটা জোর দিয়েছি। যাওয়ার পথে সিনএনজি চালক অবশ্য বলেন, বিশালত্বের দিক থেকে জমিদার বাড়ি হলো ওয়াজেদ আলী পন্নী খানদের এস্টেট। যেটি করটিয়া জমিদার বাড়ি হিসাবে বিখ্যাত। এখানে টাঙ্গাইল শাড়ির সবচাইতে বড়ো হাটও বসে। আমি সিনএজি চালককে বলি, পরবর্তী ভ্রমণের জন্য থাকলো করটিয়া জমিদার বাড়ি।

মহাসড়ক ছেড়ে গ্রামের পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাই মহেড়ার উদ্দেশ্যে। এটি সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ হয়ে যায়। আমরা পৌঁছতে পৌঁছতে ৬টা প্রায় বেজেই যায়। পুলিশ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রাধীন এটি। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ১০০ টাকা! মূল জমিদার বাড়ি প্রবেশের পূর্বেই একটি বড় দীঘি দেখতে পাই। দীঘিটির নাম বিশাখা। সত্যি খুবই সুন্দর মহেড়া জমিদার বাড়ি। মূল ভবন ৩টি ভাগে বিভক্ত। একটি সর্ববৃহৎ মহারাজা লজ, আরেকটি আনন্দ লজ এবং অপরটি চৌধুরী লজ। বিশাল এই ভবনগুলোর পেছনে আছে নায়েব ঘর, গোমস্তা ঘর, রাণীমহল সহ আরো কয়েকটি ভবন। রয়েছে আরো দুটি পুকুর। এখন ভেতরের অংশে চিড়িয়াখানা এবং বাচ্চাদের পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। মহেড়া জমিদার বাড়ির প্রত্যেকটি ভবন চমৎকার নান্দনিক সৌন্দর্যে গড়া। আমরা কর্তব্যরত একজন পুলিশের কাছ থেকে জানতে পারলাম এই লজগুলোতে এখন পুলিশের বড় কর্তারা থাকেন। তার লক্ষণও খানিকটা দেখলাম! বড়ো সাইনবোর্ডে লেখা আছে বাড়ির সিঁড়িতে উঠতে হলে পাদুকা খুলে উঠতে হবে! আমার খুব বড়ো কর্তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করছিলো, একই সাথে পুলিশের মতো চাকরি এবং বিশাল এই জমিদার বাড়িতে থাকার একটা ‘জমিদার’ ‘জমিদার’ অনুভূতির টুইস্ট হয়ে বর্তমানে তাদের মনের অনুভূতি কেমন? নিশ্চয় পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তাদের থেকে একটু অন্যরকম হবে! বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তারা তো আর লেখেন না ধীরাজ ভট্টাচার্যের ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ এর মতো গ্রন্থ। লিখলে আমরা হয়তো অনেক সমৃদ্ধ হতাম।

মহেড়া জমিদার বাড়ি এখন পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অংশ হয়ে ঝকঝক তকতকে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলেও স্থাপনার নান্দনিক স্থাপনার অনেক সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছে লক্ষ্য করলাম। একটি সুন্দর নান্দনিক ভবনের সাথেই তুলে দেয়া হয়েছে বহুতল ভবন। যা কোনোভাবেই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সাথে যায় না। আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বা ভবনগুলোতে সরকারী দপ্তর বানানো থেকে সরে আসাটা খুব জরুরি মনে করি। 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়