ঢাকা     সোমবার   ১৫ জুলাই ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

২৭ হাজার স্কয়ারফিটের এক স্বপ্নসৌধ ‘মান্নাত’

ইয়াসিন হাসান, মুম্বাই থেকে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২০, ২৪ অক্টোবর ২০২৩   আপডেট: ১৩:২১, ২৪ অক্টোবর ২০২৩
২৭ হাজার স্কয়ারফিটের এক স্বপ্নসৌধ ‘মান্নাত’

শাহরুখ খানের বাড়ির সামনে ভক্তদের ভিড়। ছবি: লেখক

‘স্যার তো দুবাই’, এমনভাবে সিকিউরিটি বললেন যেন, আমি আগাম অ্যাপয়নমেন্ট নিয়ে এসেছি। ভুল করে চলে এসেছি আজকের তারিখে। নাহ এমন কিছু হয়নি। ওই বাড়ির অ্যাপয়নমেন্ট পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু পোশাক-আশাক, চলাফেরা আর একটু অন্যদের থেকে আলাদা করা যাচ্ছিল বলে, সেটা যে কারণেই হোক সিকিউরিটির একটু বাড়তি খাতিরদারি। কিন্তু তা ধোপে টেকেনি বেশিক্ষণ। পরিচয় জানার পর বললেন, ‘স্যার দুবাই গেছেন। জন্মদিনের আগে ফিরবেন।’

মুম্বাইয়ের বান্দ্রার ল্যান্ডস অ্যান্ড বান্ডস্ট্যান্ডের কোনাকুনির বাড়ি। যে বাড়িকে বলা হয়, ল্যান্ডমার্ক অব মুম্বাই। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যেখানে মানুষের আনাগোনা। 
‘এসআরকে-এসআরকে-এসআরকে’ …. ‘শাহরুখ-শাহরুখ-শাহরুখ’।

চারদিকে হই হুল্লোড় আর গগণবিদারী চিৎকার। তিল ধারণের যেন জায়গা নেই। একপাশে সমুদ্রের ভারী গর্জন। আরেকপাশে কেবল ‘শাহরুখ শাহরুখ’ জোয়ার। বান্দ্রার বাড়িটিকে ঘিরে এত এত উল্লাস। টিভির পর্দায় কিংবা সংবাদের পাতায় যে বাড়িকে ঘিরে এত উন্মাদনা, সেটাই চোখের সামনে দৃশ্যমান। মান্নাত। বলিউড বাদশা, কিং অব রোমাঞ্চ, দ্য ডন, শাহরুখ খানের বাড়ি, মান্নাত।

২৭ হাজার স্কয়ারফিটের স্বপ্নসৌধ। শাহরুখ খানের হৃদয়ের মনিকোঠায় আটকে থাকা এক ধন। তার জীবনের সেরা প্রাপ্তি, সেরা অর্জনের নাম মান্নাত। যা তিনি গড়ে তুলেছেন তিলে তিলে। নিজের সব ভালোবাসা, শ্রম, অর্থ খরচ করে। পরিবার নিয়ে মুম্বাইয়ের বান্দ্রার মান্নাতেই থাকেন শাহরুখ। ওয়েস্ট মুম্বাইয়ে তার আরও  দুইটি বাড়ি আছে। কিন্তু সেগুলোতে বছরে একবার ঢুঁও মারেন না শাহরুখ।

বছরের পর বছর মান্নাত ধরে রেখেছে নিজের ঐতিহ্য। বাড়িটা শাহরুখ খানের বলেই মান্নাত পেয়ে যায় রাজকীয় মর্যাদা। ট্রিপ অ্যাডভাইজার বা বুকিং ডটকমের মুম্বাইয়ের টু ডু লিস্টে সার্চ দিলে মান্নাতের নামটাও চলে আসে। যেখানে ভোরে গেলেও লোক মিলবে। সকালে গেলেও লোক মিলবে। বেলা যত বাড়তে লোকও তত বাড়বে। আর যদি কোনোভাবে জানা যায়, শাহরুখ বাড়িতে আছে তাহলে এ পাড়া ও পাড়া খবর রটিয়ে যায়। ব্যাস, ওই সিকিউরিটিদের ঘুম হারায় হয়ে যায়।  

ভিনটেজ এবং সমসাময়িক ডিজাইনের মিশ্রনের ছয়তলা বিল্ডিং মান্নাতের। সমুদ্রমুখী ডিজাইন করা। বাড়ির স্থাপত্য নকশা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল অভ্যন্তরীণ খুব যত্ন করে সাজানো। ব্যান্ডস্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে যদি মান্নাতে ঢুকতে হয় তাহলে তাকে শ্বাসরুদ্ধকর পরীক্ষা দিতে হবে। কেননা ঐশ্বর্যের সেই গেট এতটাই শক্তিশালী যে তা টানতে রীতিমত ছয়জনকে কঠিন পরীক্ষা নিয়মিত দেওয়া লাগে।

বাড়ির শুরুতেই চোখে পড়বে কালো রেলিংয়ের এক মঞ্চ। যেখানে প্রায়ই দাঁড়িয়ে ভক্তদের দেখা দেন শাহরুখ। বিশেষ দিনে, যেমন নিজের জন্মদিন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা ছবি মুক্তির দিনে…দুই হাত দুদিকে নেড়ে নিজের চিরচেনা পোজে দাঁড়িয়ে শাহরুখ আবদান মেটান। বাড়ির প্রথম বিল্ডিংটিতে শাহরুখ নিজের অফিস আর স্টুডিও বানিয়েছেন। পেছনের এক্সটেনশন ছয়তলা নিজের থাকার জায়গা। যেখানে কেবল তার পরিবারের সদস্যরা প্রবেশ করতে পারে। বাকিদের জন্য ডোর ক্লোজ।

 

হিন্দুস্তান টাইমসের মতে, ২৭ হাজার স্কয়ারফিটের এই বাড়টির বর্তমান বাজার মূল্য ২০০ কোটি রূপি। যদিও শাহরুখ যখন বাড়িটি কিনেছিলেন তখন আশেপাশে খুব বেশি বাড়ি ছিল না। এই বাড়িটি যিনি করেছিলেন তার থেকে শাহরুখ কিনে নেন পানির দামে। যদিও ওই সময়ে শাহরুখের আর্থিক অবস্থা ততটা ভালো ছিল না। শাহরুখ শাহরুখ হওয়ার আগে ওই বাড়ির কাছে গিয়ে শুয়ে থাকতেন বলে গল্পলোকে কথা আছে। তখন থেকেই বাড়িটি তার পছন্দের। এক পর্যায়ে নিজের করে নেন।

মান্নাত নামকরণ করতেই শাহরুখ খান খরচ করেন ২৫ লাখ রুপি। মান্নাতের প্রতিটি শব্দ ডায়মন্ড দিয়ে খোদাই করা। সেই সঙ্গে যে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে তাও প্রচণ্ড  দামি। আমাজনের গহীন জঙ্গল থেকে আনা হয়েছে সেই কাঠ।

মান্নাত কেনার পর যখন ভেতরের কাজ করতে যান শাহরুখ ও গৌরি খান তখন খেয়াল করেন ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে। জনপ্রিয় এ দম্পতি যাকে দিয়ে কাজ করাতে চেয়েছিলেন তার খরচ মেটানোর মতো অর্থ তখন তাদের কাছে ছিল না। এজন্য তারা সিদ্ধান্ত নেন গৌরি খান ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ করবেন। সেই থেকে শুরু হয় তার পেশাদার জীবনেরও পথ চলা। সময় অসময়ে নানা কিছু মান্নাতে যোগ হয়। কিছু জিনিস আবার বাইরেও চলে যায়। এভাবেই সেই মান্নাত টিকে আছে বছরের পর বছর। মিটিয়ে যাচ্ছে ভক্তদের পিপাসা।

শাহরুখের এই স্বপ্নের বাড়ির সামনে সারাদিনই জটলা লেগে থাকে। টেক্সি ক্যাবকে বললেই হয়, শাহরুখের বাড়ি যাবো। পৌঁছে দেবে। পাবলিক বাস এসে থেমে যায় তার মান্নাতের সামনে। গাড়ি স্লো করে একনজর দেখে নেয় অনেকে।

মান্নাতের ভেতরে ঢোকা কঠিন। কিন্তু ওই গেটের বাইরে মান্নাত লিখার সামনে ভক্তদের সারাদিনের বিচরণ মনে করিয়ে দেয়, শাহরুখ খান ওখানেই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। তার মতো করে একটু পোজ দেওয়া, তার গানে নেচে উঠা, তার কয়েকটি ডায়লগ মনে করে চেঁচামেচি করা…সব তো শাহরুখ খানের জন্য।

বছরের পর বছর, ছবির পর ছবি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কত ভক্ত শাহরুখ তৈরি করেছেন তার হিসেব নেই। তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে, তার জীবনের গল্পে প্রেমে পড়ে, তার পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলতার মাত হয়ে জীবন সুন্দর করেছেন সেই সংখ্যাটাও কম নয়।

২ নভেম্বর ৫৮ এ পা রাখবেন শাহরুখ। সেদিন ওয়েস্ট বান্দ্রায় সারাদিন চলবে শাহরুখ শো। রাস্তায় দেখা মিলবে হাজার হাজার শাহরুখ ভক্তের। নেচে গেয়ে উৎসব করবে মান্নাতের সামনে। ওই যে, মান্নাতের সামনে কালো মঞ্চ, সেখানে হাজির হয়েই শাহরুখ হাত নাড়বেন। ভক্তদের ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবেন উড়ন্ত চুমুতে। দেবেন নিজের চিরচেনা পোজ। নিচে দাঁড়িয়ে সেদিনও হয়তো কেউ শাহরুখ হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন। কেউ মান্নাত গড়ার। 

/এসবি/ 

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়