ঢাকা     শনিবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩০

রাঙ্গামাটির দূর পাহাড় সাজেকের বাঁকে (দ্বিতীয় পর্ব)

মো. জাহিদ হাসান  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:২৮, ১ নভেম্বর ২০২৩  
রাঙ্গামাটির দূর পাহাড় সাজেকের বাঁকে (দ্বিতীয় পর্ব)

সেইম প্লেস রেস্টুরেন্টে খাবারের জন্য অপেক্ষমাণ ভ্রমণকারী দলের একাংশ

আবার সব ভ্রমণকারী একসাথে সমবেত হয়েছি ‘সেইম প্লেস রেস্টুরেন্টে’ দুপুরের আহারের জন্য। রেস্টুরেন্টে এসে ব্যতিক্রম যে বিষয়টা চোখে পড়ছে তা হলো সব খাবারে বাঁশের ব্যবহার। বাঁশ বাজি, ডাউলে বাঁশ আর মুরগীর মাংসে সবজি হিসেবে বাঁশের ব্যবহার। আসলে মানুষ কখনো কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে একটা প্রচলিত শব্দ বলে থাকে ‘বাঁশ খেয়েছি’! সেইম প্লেস রেস্টুরেন্টের প্রতিটি টেবিলের প্রতিটি গেস্ট খুব আয়েশ করে সইচ্ছায় বাঁশ খাচ্ছে।  খেয়াল করছি, অনেকেই বাঁশ খেতে খেতে ফোনে বন্ধুবান্ধব বা পরিবার পরিজনকে বিভিন্ন ঢংয়ে মজা করে বলছে, ‘সাজেকে এসে বাঁশ খাচ্ছি’। ওদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, বাঁশ খাওয়ার চেয়ে বলাতেই যেন বেশি প্রশান্তি পাচ্ছে, আর ওরা যেন এ কথাটি পরিজনকে বলতেই বাঁশ খেতে এসেছে! তবে হ্যাঁ, সবজি হিসেবে বাঁশের স্বাদ সত্যি অসাধারণ।   

সেইম প্লেস রেস্টুরেন্টে খাবারের জন্য অপেক্ষমাণ ভ্রমণকারী দলের একাংশ। সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার সর্ব উত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। তাছাড়া সাজেক হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন, যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা। রুইলুইপাড়া আর কংলাক পাড়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সাজেকের পর্যটন কেন্দ্র। 

খাবার সেরে যখন আমরা পায়ে হেঁটে রুইলুইপাড়া পর্যটন এলাকায় ঘুরছি তখন চোখে পড়ছে নয়নাভিরাম পার্ক, গার্ডেন, একান্তে বসে পাহাড় দেখার জন্য ছোট ছোট খোলা ছাউনি, দোলনা। রয়েছে রিসোর্ট, কটেজ, লজ, খাবার হোটেল ও পিকনিক স্পটও। মূলত রুইলুইপাড়া আর কংলাক পাড়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সাজেকের পর্যটন কেন্দ্র। তথ্য নিয়ে জানা গেল, সুউচ্চ পাহাড় চূড়ায় এত সুন্দর করে সাজানো সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানের কারণে। 

সাজেকে মূলত লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা, উপজাতিরা বসবাস করে। রাস্তার দুপাশের পরিপাটি দোকানপাট আর বিদ্যুৎ দেখে মনে হচ্ছে— দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অবহেলিত উপজাতি জনগোষ্ঠী এখন আর পিছিয়ে নেই কোনও অংশে। তারাও আলোর সন্ধানে নিজেদের পাল্টাতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, রাস্তার পাশে হলুদ আদা চাল জাম্বুরা কলা কচি বাঁশ আর নানা রকম পাহাড়ি ফল নিয়ে নিয়ে বসে থাকা উপজাতিদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে— এরা তৃতীয় প্রজন্মে এসেও হয়ত তাদের বাপ—দাদাদের মতো একই জুম চাষ বা কৃষি পেশায় স্থির হয়ে আছে। বহুকাল পেরিয়ে গেলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোনও বদল হয়নি। যুগ—যুগান্তর ধরে হয়ত এভাবেই চলে আসছে তাদের যাপিত জীবন ধারা। শরীরে পাঁজরের গাঁথুনি দেখে মনে হচ্ছে, অভাব যেন এদের নিত্যসঙ্গী। রাস্তায় লেপটা দিয়ে বসে থাকা এক বৃদ্ধ উপজাতির দিকে তাকিয়ে দেখছি তার দেহ শুকিয়ে গেছে, চোখের পাতা প্রায় বসে গেছে, তবুও নিজের উৎপাদিত ফল ফসল নিয়ে বিক্রেতা হয়ে এসেছে বাজারে। মনে হয় অভাবের রুক্ষতায় তার মুখের চামড়া কুঁচকে হয়ে ঝুলে আছে। তবুও হেমন্তের বিকাল বেলা বৃদ্ধের মলিন মুখের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি এক অন্য রকম দীপ্তিময়তা। এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে মানুষ স্বল্পপরিসর জীবনের মধ্যে টাকার অভাবে অনেক দুঃখ ভোগ করে থাকে।

যুবতী উপজাতি রমণীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, তোমাদের কুঁড়েঘরে যদি পুরো এক দিনের কুটুম হয়ে জীবনপ্রবাহ কৃষ্টি সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতে পারতাম, তাহলে হয়ত সাজেক ভ্রমণ পূর্ণতা পেত। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডাব খেতে খেতে স্থানীয় এক উপজাতি দোকানদারের সঙ্গে কিছুটা সময় কথোপকথন হলো। তার মুখে শুনে কিছুটা ধারণা নিলাম তাদের জীবনযাপন, পরিবেশ, সংস্কৃতি সম্পর্কে!

পৃথিবীতে যত সম্পর্ক আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মধুর আর কোমল সম্পর্ক হলো স্বামী—স্ত্রীর সম্পর্ক। জানা গেল, এখানে বিয়ের রীতিনীতি অনেকটা ব্যতিক্রম! এখানে উপজাতিরা বিভিন্ন রীতিনীতি পালনের মাধ্যমে তরুণ—তরুণীর একসাথে থাকার জন্য বিয়ের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। সাধারণত পাত্রপক্ষই বিয়ের আলাপ শুরু করে। এরপর পাত্রপক্ষ আত্মীয়স্বজন মিলে ১ বোতল মদ, ১ বিড়া পান, সুপারি, বিন্নি ভাত, মিষ্টি, জোড়া নারিকেল ইত্যাদি নিয়ে পাত্রীর পিতা—মাতার সাথে দেখা করতে যায়। পাত্রীর পিতামাতা সম্মতি জানালে পাত্রীর মতামত নিয়ে তারাও অনুরূপ ১ বোতল মদ পাত্রপক্ষকে দেয়। বিয়ের পণ হিসেবে সাধারণত বরপক্ষ কনেদের নগদ টাকা, চাল, দ্রব্যসামগ্রী, শূকর, অলংকার প্রভৃতি দিয়ে থাকে। পাহাড়ি উপজাতিদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, তাদের পোশাক—পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, জাতভেদে সবই আলাদা।


 
ভ্রমণ সঙ্গী তিন জোড়া কপোত-কপোতী নিজ পরিবারসহ এক ফ্রেমে বন্দী

সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি সাজেকের সবচেয়ে উচ্চ পাহাড়চূড়া কংলাকে উঠার জন্য। এটা যেন সাজেকের পাহাড়ের ওপরে চেপে বসা আরেকটি পাহাড়। সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া কংলাক পাহাড় উঠতে গিয়ে মানুষ হাঁপিয়ে যায়। পাঠার মতো গায়ে শক্তি নিয়ে দুর্বার বেগে লাল মাটির মেঠো পথ ধরে উপরে দিকে এগিয়ে যেতে হয়। কংলাকের ঘাড়ে চড়ে মনে হচ্ছে আকাশের অসীম শূন্যতার বুকে হেলান দিয়ে আছে কংলাক পাহাড়। চোখের আরও কাছে উড়াউড়ি ঘোরাঘুরি করছে সাদাকালো মেঘ। এ যেন মেঘের উপত্যকা। নিজেকে মনে হচ্ছে, মেঘের রাজ্যের বাসিন্দা। চূড়ায় উঠে নিচের পাহাড়ের সারিগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে চোখে পড়ছে ভারতের মিজোরাম সীমান্তের বড় বড় পাহাড়গুলো আর রাঙামাটির অনেকটা অংশ। আমাদের বসবাস করা সমতল  জনপদের বাইরে অকল্পনীয় এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদের বিশাল সৌন্দর্য যে কারও চিন্তার জগতকে এলোমেলো করে দেবে। বাতাসের মৃদুমন্দ পতপত শব্দ শুনে মনে হচ্ছে এখানে প্রকৃতি বাঁশি ছাড়াই বাঁশির আওয়াজ ছড়িয়ে দিচ্ছে অনবরত। নীরবতার মধ্যে নিঃশব্দে ডুবে যাচ্ছি এক অন্যরকম ভাবনায়। বাতাসে ভেসে আসছে প্রকৃতির ঘ্রাণ। হৃদয়ের কষ্টকে পরাজিত করতে হলে ভাবনায় সুখানুভূতি নিয়ে নিজেকে প্রকৃতির নিকট সমর্পণ করতে হয়। যদি কেউ কান পেতে বাতাসের বাদ্যিতে মনোযোগ নিবেশ করে তাহলে মুগ্ধতার পরশে মন জুড়িয়ে যাবে, প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে মিশিয়ে দিতে পারবে নিজের মনের সব যন্ত্রণা। এখানে পাহাড়িদের বাঁশের কাপের চা-এ চুমুক এক অন্য রকম অনুভূতি জাগ্রত করে, নিমিষেই পাহাড় বেয়ে উঠার সব ক্লান্তি মুছে দেবে। যারা যান্ত্রিক নগরের দূষিত বাতাস, দূষিত শব্দের মোড়কে বন্দী নাগরিক। তারা যদি সুখের জন্য নিবেদিত চিত্ত নিয়ে, পার্থিব বিলাসবর্জিত কঠোর জীবনযাত্রার প্রণালী বেছে নিয়ে এখানে বসবাস করে, তবে তাদের জীবনে সুখের অভাব হবে না, এটা হলফ করে বলতে পারি! কংলাক পাহাড় ভ্রমণ শেষে পাহাড়ি মাটির সিঁড়ি বেয়ে ঢালুতে নেমে এলাম।


 
কংলাক পাহাড়চূড়া হতে পড়ন্ত বিকেলে সূর্য অস্তের নভো নাভিরাম দৃশ্য

কংলাক পাহাড় থেকে খুব কাছে পর্যটকদের সুবিধায় জন্য বিস্তৃত জায়গা নিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’ । এখানে সাজেকের বিজিবি ক্যাম্প, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিজিবি ক্যাম্প। পাশেই হেলিপ্যাড অবস্থিত। মসজিদ দক্ষিণ—পশ্চিম পাশের খোলা জায়গায়, সামনে নিচের পাহাড়ের সারি এমন স্থানে এক কবির সাথে বসে আছি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার প্রায় নেমে এসেছে। আকাশে উড়ে যাচ্ছে রঙিন দ্রুতগামী পাখির দল, আকাশ অতিক্রম করার সময় ওরা যেন জানান দিয়ে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পর সাজেকের দিগন্ত অন্ধকারের সাগরে ডুবে যাবে। কবি রুবেল মিয়া সবসময় তার বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তার মাধ্যমে মানুষকে মাতিয়ে রাখে। আমরা প্রকৃতি আর অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা বলছি। হঠাৎ-ই সে আপসোসের সুরে বলল, সে এখন আর কবিতা লিখে না, তার খুব আপসোস, কবিতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিলে মানুষ লাইক তো দেয়ই না, বরং নেতিবাচক মন্তব্য করে মনকে বিষিয়ে তোলে। আমি বললাম, বীণ বাজাতে হলে সাপের কাছে গিয়ে বাঁশি বাজাতে হয়। আপনি যদি হনুমানের কানের কাছে গিয়ে বীণ বাজান তাহলে তো হনুমান বিরক্ত হয়ে আপনাকে খামচা দেবে এটাই স্বাভাবিক। যারা কবিতার সমঝদার তাদের সাথে কবিতার প্রসঙ্গে কথা বলবেন। এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধর বাগযোদ্ধার সাথে প্রায়ই আমার খুনসুটি লেগে থাকে। যার অবশ্যম্ভাবী ফল হয় পরস্পরের সাময়িক মনোমালিন্য ও বিচ্ছেদ, আবার কিছুক্ষণ পর মিলে যাওয়া। উনি আবারও আপসোস করে বলল, আরে ভাই! মানুষ এখন আর মনের খোরাকের জন্য বই পড়ে না, ফেসবুক লাইকি টিকটক ও অন্যান্য মাধ্যমে যে ছোট ছোট ভিডিও কনটেন্ট পায় ওখান থেকেই বিনোদনের সব রস পেয়ে যায়। যার কারণে বাঙালি ভবিষ্যতে গিয়ে একটা সময় মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। তারপর আমাকে উপদেশ দিয়ে বলল, কষ্ট করে লিখে কারও উপহাসের পাত্র হওয়ার কোনও মানেই হয় না! তার চেয়ে ভালো, সময়ের গড্ডলিকা প্রবাহে সবার সাথে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে টিকটক আর লাইকি দেখা ভালো। হঠাৎ পশ্চিম দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেখছি, আকাশে মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে গোলাকার হলুদ রঙের সূর্য। শেষ বিকেলে এমন স্বল্পস্থায়ী প্রকৃতির ঐশ্বর্য দেখে ভাবছি, এরূপ মুহূর্ত হয়ত সহসাই আর ফিরে আসবে না আবদ্ধ যান্ত্রিক জীবনে। আমি মুখ ঘুরিয়ে আবারও তাকে বললাম— আপনি নিজের জন্য লিখবেন, অন্যের জন্য নয়। জীবন চলার পথে সমালোচক আর নিন্দুক থাকবেই, ওরা না থাকলে লিখার ভিত কখনও মজবুত করতে পারবেন না। 

পড়ুন- রাঙ্গামাটির দূর পাহাড় সাজেকের বাঁকে (প্রথম পর্ব)

অবশেষে বললাম— বাঁশির বাতাস যদি বাধা না পেত তাহলে সেখানে সুরের জন্ম হতো না। আমাদের কথা শেষ না হতেই— সন্ধ্যা বেলার পলিত সূর্য তার আলো ধীরে ধীরে নিভিয়ে হারিয়ে গেল পশ্চিম দিগন্তে। আমরা যখন সাজেকের মুহূর্তকে ভবিষ্যৎ স্মৃতিচারণের যুগলভাবে ক্যামেরায় সেলফি বন্দী হচ্ছি। তখন চাঁদের ধবধবে ফর্সা আলোয় প্লাবিত হয়ে আছে দিগন্ত। দিগন্তের পানে তাকিয়ে রুপালি আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে– ধুসর মেঘগুলো উড়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গাছগাছালির ওপর দিয়ে। 

সন্ধ্যার পাহাড়ি বাতাসে গল্প শেষে রুবেল মিয়ার সাথে সেলফি বন্দী

আমাদের এক ভ্রমণসঙ্গী শারমীন আপা ফোন করে বলল, ভাই আপনি কোথায়? সারাদিন তো দেখতে পেলাম না। আমাদের ভ্রমণসঙ্গীদের প্রায় সবাই হেলিপেডের মাঠে আড্ডা মাস্তিতে মশগুল, চলে আসেন। রুবেল মিয়া একটা বিজয়ীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল— ভাই দ্রুত চলেন। আমরা হেলিপ্যাডের মাঠে পৌঁছে দেখছি কোথাও একটু জায়গাও খালি নেই যেখানে আমরা বসতে পারি। মাঠে ভ্রাম্যমাণ আড্ডা প্রিয় মানুষের ঢল নেমেছে। মনে হচ্ছে, এরা দিনের আলোতে পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকনের পর রাতে চাদের নীলাভ আলোয় বোধহয় আড্ডার জন্যই রেখেছিল। শূন্যের মেঘের সমুদ্র হতে ভেসে আসছে শীতল বাতাস। এখানে ভ্রমণাথী মানুষেরা ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে গোলাকার হয়ে মাঠে বসে আছে। কেউ গিটারে সুর তুলছে কেউ গাইছে আর কেউবা আত্মচিৎকারে জয়ধ্বনি ও হাত তালি দিয়ে মাতিয়ে তুলছে মাঠ। অনাবিল হাসি আর আনন্দ নিয়ে এত মানুষের আড্ডার ভিড়ে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। মনে হচ্ছে, বৃষ্টির জলস্রোত যেমন বেগে নিম্ন দিকে ধাবিত হয়ে নদী খাল প্লাবিত করে বন্যার তাণ্ডবে পরিণত হয়। তেমনি করে সাজেকে আগত সব ভ্রমণাথীরা সারাদিন পাহাড় ও প্রকৃতি ঘুরে অবশেষে যেন ফিরে এসেছে হেলিপেডের মাঠ আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে। দিনভর উচ্ছ্বাসে কাটানের পর সন্ধ্যায় হেলিপ্যাডে কাটানো মুহূর্তগুলো যেন আমাদের আরও রঙিন আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষের গান আর নাচ দেখে আমার চিত্ত সুখের বিত্তে পরিপুষ্ট হয়ে উঠছে।

জোছনার নীলাভ আলোয় প্লাবিত সাজেকের আকাশ

পূর্ণ চাঁদের জ্বলজ্বলে জোছনায় আকাশ প্লাবিত হয়ে যাওয়ার কারণে পাহাড়ের উপরের দিকে তাকিয়ে দেখা যাচ্ছে, সাদা মেঘের ভেলা খুব কাছাকাছি উড়ে বেড়াচ্ছে। আকাশের বুকের শূন্যতায়ও আজ যেন সাদা মেঘ আর চাঁদের নীলাভ আলোর মিলন মেলা বসেছে। মানুষের তৈরি কৃত্রিম আর প্রকৃতির মিশ্রণে সৃষ্ট নয়নাভিরাম দৃশ্যের আরামে আমার দু—নয়ন বুজে আসছে। মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনার কাছে হার মানে সব কিছু। স্থির করলাম, আজ রাতে ঘুম নষ্ট হলে হোক তবুও নিজের ভাবনার মগ্নতা নষ্ট করে হেলিপ্যাডের মাঠ ছেড়ে রিসোর্টে ফিরে যাব না। কল্পনার মানসপটে এটা উঁকি দিচ্ছে যে, হয়ত রাত্রি যখন আরও গভীর হবে তখন মেঘ চাঁদের রুপালি আলোর সাথে পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খাবে। আর আমরা মেঘের আভা গায়ে মেখে আকাশভরা নক্ষত্রের গতিবিধি দেখে কাটিয়ে দেব সারারাত। ভালোই অতিবাহিত হচ্ছিল সময়, রাত্রি যখন আরও একটু গভীর হলো তখন হঠাৎ মেঘের হুংকারের গর্জন শুনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল মাঠের সবাই। ফেরার তাগাদা অনুভব করে দৃশ্য উপভোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে রওনা হলাম সেইম প্লেস রেস্টুরেন্টের দিকে। রাতের খাবার সেরে আমরা রিসোর্টে ফিরে ভ্রমণের প্রথম দিন অতিবাহিত করলাম। চলবে...

ঢাকা/এনএইচ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়