ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

অভিজ্ঞতা ছাড়া লেখা যথার্থ হয় না: হরিশংকর জলদাস

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-২০ ৬:২৫:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-২০ ৬:৩১:১৯ পিএম

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস। উপন্যাস ও গল্প লেখার পাশাপাশি প্রাবন্ধিক হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। কথাসাহিত্যে অবদানের জন্যে ইতিমধ্যেই বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এই বরেণ্য সাহিত্যিকের সাহিত্য-ভাবনা, জীবন-যাপন, সাম্প্রতিক লেখালেখির বিষয়সহ নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এই সাক্ষাৎকারে। কথোপকথনে ছিলেন মুহাম্মদ ফরিদ হাসান।  

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: প্রথম জীবনে আপনাকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই দিনগুলোর কথা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।
হরিশংকর জলদাস: কথার শুরুতেই বলে রাখি, আমি যেখানে জন্মেছি সেখানে পড়ালেখার খুব বেশি চর্চা ছিলো না। একেবারেই অন্ধকার সমাজ থেকে আমার উঠে আসা। যেখানকার মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু পেটের চিন্তার পেছনে দৌড়ায়। আমার বাবা উত্তর পতেঙ্গার জেলেপাড়ার অনেকগুলো পরিবারের একজন কর্তা। যিনি দুপুরের খাবার জোগাড় হলে রাতের খাবার কীভাবে জোগাড় হবে এ চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। আমার বাবা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন বলে দাবি করতেন। তার বাবা চন্দ্রমণি পাতর। জলদাসদের প্রথম দিকের উপাধি ছিলো পাতর। সেই চন্দ্রমণি পাতর মাছ ধরতে গিয়ে ২০ বছর আগে মারা গিয়েছেন। বাবার বয়স তখন আড়াই বছর। সেই সময় বাবা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি তার জীবন সমুদ্রের সংগ্রামে কাটাবেন কিন্তু ছেলেদের তিনি সমুদ্রে পাঠাবেন না।

আমরা যে কজন ভাই ছিলাম, তাদের সবাইকে তিনি স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্যে আমাদের কিন্তু সমুদ্রে যেতে হয়েছে। আমাকে আমার জীবনের ৩০ বছর পর্যন্ত সমুদ্রে মাছ ধরতে হয়েছে। মাছ ধরেছি বাবার জন্যে, পরিবারের অর্থনৈতিক সংস্থানের জন্যে। এমনকি আমি যখন ১৯৮২ সালে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছি তখনও সমুদ্রে গিয়েছি। আমি সরকারি সিটি কলেজে দিনে শিক্ষকতা করেছি, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাবার সাথে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেছি। আবার ভোর সকালে এসে কাপড় পাল্টিয়ে শিক্ষক-ভদ্রলোক হয়ে গেছি।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: লেখালেখির চর্চাতে কীভাবে এলেন?
হরিশংকর জলদাস: আমার বাবা কম লেখাপড়া জানা মানুষ হলেও ঘরের মধ্যে তিনটি জিনিস অত্যন্ত যত্নে রাখতেন। একটি হলো মহাভারত, রামায়ণ ও রামসুন্দর বসাকের আদি অন্বেষণ। আমি একটু একটু পড়তে শিখলাম। বানান করে করে বাক্যগুলোর অর্থ বুঝতে শিখলাম। তখন থেকেই আমি কিন্তু মহাভারত ও রামায়ণ পড়া শুরু করেছিলাম। ‘মহাভারতের কথা অমৃতসমান, কাশিরাম দাস কহে শুনো পুণ্যবান’-এ ধরনের ছড়াগুলো। তখন থেকেই বাবাকে আমি খোঁচাতাম যে, বাবা আরো বই, আরো বই। কিন্তু বাবা তো আসলে বই-টই চেনেন না। আবার বাবা যখন কিছু দিতে চাইতেন, তখন বলতাম, বাবা একটা গল্পের বই, একটা উপন্যাসের বই দাও। তখন আমাদের ওখানে ‘খুশির মহল’ নামে সিনেমা হল ছিলো। সেখানে চার আনা দিয়ে একটা বই সাত দিনের জন্যে পড়তে দেয়া হতো। আমি বলছি ১৯৬৭ কিংবা ১৯৬৯ সালের ঘটনা। বাবার দেয়া টাকাগুলো নিয়ে সাম্পানে করে শহরে গিয়ে খুশির মহল সিনেমা হল থেকে বই ভাড়া করে নিয়ে আসতাম। এ হলো আমার পড়ার আগ্রহের কথা। পড়তে পড়তেই মনের ভেতর সুদীর্ঘ বাসনা জাগতে শুরু করল আমি আরো পড়ব। পড়ার যে আনন্দ তা আমাকে পেয়ে বসেছিল। ফলে কিছু টাকা জমলে আমি বই কিনতে শুরু করলাম। তখন বইয়ের বেশি দাম ছিল না। টাকার মূল্য ছিল, বইয়ের দাম কম ছিল। ক্লাস সেভেন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কেনা বইগুলো আমার সংগ্রহে ছিল। ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসে আমাদের বাড়ি-ঘর, গাছপালা, বই সব ভেসে চলে গেল।

যাই হোক, আমি সামনে যা পেয়েছি, পড়েছি। এখনকার মতো সেই সময় তো বই পাওয়া সহজ ছিল না। শুধু পড়তাম, আনন্দ পেতাম। পরে কলেজ-ইউনিভার্সিটি শেষ করে অধ্যাপনায় ঢুকলাম। সে সময়ও আমি প্রচুর পড়েছি। মাসের শেষে বেতন পাচ্ছি। এ এক আনন্দের জীবন। কিন্তু চাকরি করতে করতেই আমি সাম্প্রদায়িকতার শিকার হলাম। আমার বিভাগীয় প্রধান আমাকে জাত-পাত তুলে অপমান করতেন। তখন আমার মনে হলো, জন্মই কি আমার আজন্ম পাপ? আমি জেলে সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছি বলেই কি আমাকে গালিটা সারাজীবন বয়ে যেতে হবে? এর অনুসন্ধান করতে গিয়ে তখন থেকেই আমার ভেতর একটা রাগ চাপল যে, আমি জানব, জেলেরা আসলেই নিন্দিত কি না। এরপর ময়ূখ চৌধুরীর কাছে আমার পিএইচডি করতে যাওয়া। তখন জেলে জীবন নিয়ে আরো জানলাম। বাংলা সাহিত্যে যে উপন্যাসগুলো লেখা হয়েছে, সে উপন্যাসগুলো নিয়ে তখন কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম নদীকেন্দ্রিক জেলেদের নিয়ে উপন্যাস থাকলেও সমুদ্র পাড়ের জেলেদের নিয়ে দুই বাংলার কেউ উপন্যাস লেখেননি। এছাড়া নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলো পড়তে গিয়ে অনেক জায়গায় আমি খামতি দেখলাম। অনেক জায়গায় বানানো কথা দেখলাম। অনেক জায়গায় মনে হলো তারা বিষয়টি জেনে লেখেননি, জোড়াতালি দিয়েছেন। তখন মনে হলো, আমি একবার লিখে দেখি, পারি কিনা! কিন্তু সমস্যা হলো এখন আমি কেন লিখব? আমার আগে প্রখ্যাত পাঁচজন লেখক জেলে জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখে গেছেন। তাহলে আমি কেন লিখব? লিখতে গিয়ে আমি ভাবলাম, আমি আসলে নদীপাড়ের জেলেদের নিয়ে লিখতে পারব না, কারণ আমার ওই অভিজ্ঞতা নেই। একটা কথা বলে রাখি, অভিজ্ঞতা ছাড়া যারা লিখতে যান, তাদের লেখা যথার্থ হয় না। হয়তো ফানুসের মতো কিছুক্ষণ আকাশে ওড়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফানুস ফুটো হয়ে নিচে পড়ে যায়। অভিজ্ঞতার বাইরে যে লেখা, সেগুলো একসময় ফানুসের মতো মাটিতে ফুটো হয়ে পড়ে যায়। তাই ভাবলাম, আমি তো সমুদ্রপাড়ের মানুষ। সমুদ্রের জেলেদের নিয়ে লেখা উচিৎ। এই ভাবনা থেকেই লিখলাম ‘জলপুত্র’।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: এ উপন্যাসটি একটি জাতীয় দৈনিকের ঈদ সংখ্যায় নির্বাচিত পাণ্ডুলিপি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল?
হরিশংকর জলদাস: হ্যাঁ। লেখার পর আমার ছাত্র মহি মুহাম্মদ ও টিপু সুলতান আমাকে বাধ্য করেছে-লেখাটা দৈনিক যুগান্তরের একটি প্রতিযোগিতায় পাঠানোর জন্যে। প্রতিযোগিতায় ৬৫টি পাণ্ডুলিপি জমা পড়েছিল। সেখানে ‘জলপুত্র’ প্রথম হলো। এরপর মানুষ একে একে আমার লেখা ‘দহনকাল’, ‘কসবি’, ‘রামগোলাম’ উপন্যাসগুলো গ্রহণ করলো।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: আপনার পূর্ববর্তী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা অদ্বৈত মল্লবর্মণ জেলে জীবন নিয়ে লিখেছেন। তাদের সেই লেখাগুলো কীভাবে দেখছেন?
হরিশংকর জলদাস : তারা নমস্য। আমি তাদের সেভাবেই মূল্যায়ন করি। একবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় প্রশ্নকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এই দুটি উপন্যাসের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ মনে হয়? সেই অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান, সেলিনা হোসেন ছিলেন। আমি মুহূর্তকাল চিন্তা না করে বললাম, আমার কাছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সবচেয়ে ভালো বলে মনে হয়। উপস্থিত সবাই কিন্তু ডানে-বামে মাথা নেড়েছিলেন। তারা সমর্থন করেননি। কিন্তু আমি জেলে ঘরে জন্মেছি। এ সমাজে ৬৫ বছর জীবনযাপন করছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই জেলেদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। আবার জেলেদের নিয়ে লেখা প্রায় সব কটি উপন্যাস, ছোটগল্প আমি পড়েছি। সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জেলে সমাজের যে চিত্র তুলে ধরেছেন সেটা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র। সেখানে কিন্তু কোনো সামাজিক বিন্যাসের কথা বলা হয়নি। এই বিন্যাসের কথা অদ্বৈত মল্লবর্মণের মধ্যে এসেছে। আমরা সবাই বলি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানসপুত্র হলো হোসেন মিয়া। অথচ সেই হোসেন মিয়াকে দিয়েই কিন্তু লেখক আফিমের চোরা কারবারের ব্যবসা করিয়েছেন।  মূল ভূ-খণ্ড থেকে ময়নাদ্বীপে মানুষকে নিয়ে গেছেন জোর করে। নানা রকম চালাকি করে। এ বিষয়গুলো আমার কাছে সমর্থনযোগ্য মনে হয়নি। আমার মনে হয়েছে জেলে জীবনের নাড়ির যে স্পন্দন-সেই প্রকৃত স্পন্দন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের মধ্যে পাওয়া যায়, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মধ্যে নয়।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: বাংলাদেশের কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন।
হরিশংকর জলদাস : বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে বর্তমানে যারা লিখেছেন আমি অতীত, বর্তমান কাউকেই কিন্তু ছোট করে দেখছি না। আমি (আপনাকে) বলতে চাই, বর্তমানে যারা লিখছেন সবাই যে ভালো লিখছেন এমন নয়। আবার একেবারেই যে ভালো লিখছেন না তাও না। কিন্তু লিখছেন অনেকেই। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন তারা এত লিখছেন? তারা জানে এবং বুঝতে পারেন তাদের লেখা ভালো হচ্ছে না। যে পথটা আমরা হেঁটে আসলাম সে পথ কিন্তু পাকা করা, পিচ করা। আমরা পিচটাই দেখি। গড়গড় করে হেঁটে কিংবা রিকশায় চলে এলাম। কিন্তু পিচঢালা পথের নিচে যে মাটি আছে, ইট আছে তা আমরা কমই অনুভব করি। এ পথ নির্মাণে কিন্তু মাটি এবং ইটের অবদান রয়েছে- যদিও সেগুলো দৃশ্যমান না। বর্তমানে যারা লিখছেন এবং একটা সময় যারা ঝরে যাবে তারা কিন্তু সাহিত্যের এ পথটা ধরে রেখেছেন। হ্যাঁ, এটুকু স্বীকার করা যায় যে, একটু আগেও ভালো লিখে গেছেন শহীদুল জহির। হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে এখানে একটা কথা বলে রাখি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসগুলোর আমি খুব বেশি মূল্যায়ন করি না। তিনি ছোটগল্প নির্মাতা হিসেবে খুব দক্ষ ছিলেন।

 

যারা লিখে গেছেন তারা অবশ্যই ভালো লিখেছেন। তাদের অনুসরণ করেই তো আমাদের লেখা। কিন্তু একটা কথা এখানে উল্লেখের দাবি রাখে, বর্তমানে যারা লিখছেন তাদের মধ্যে কিন্তু এক ধরনের বাজারি সস্তা জনপ্রিয়তার আবেগ ঢুকে গেছে। একটা মেলায় বইয়ের কয়টা অডিশন হলো, কত কপি বিক্রি হলো সেটাই যেনো সেরা সাহিত্যের মাপকাঠি। এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না। আমার যদি ৫০ হাজার ফেসবুক ফলোয়ার থাকে তাদের যদি আমি অনুরোধ করি যে, ভাই আমার এক কপি বই কেনেন। ৫০ হাজারের মধ্যে যদি ৫ হাজারও বই কেনে তাহলে দুই অডিশন সহজেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে অডিশন লেখা কিন্তু প্রকৃত লেখা হবে না। এ জনপ্রিয়তা প্রকাশকদের কাছ থেকে রয়ালিটি পাওয়ার প্রত্যাশায়। এগুলোর জন্যে অভিজ্ঞতাবিহীন লেখা কিন্তু ইদানীং লেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আপনি যেহেতু কথাসাহিত্যের কথা বলেছেন, বর্তমান অবস্থার কথা বলেছেন, তাহলে দেখবেন যে, অধিকাংশ উপন্যাস ও ছোটগল্পের মধ্যে একটা সস্তা জীবনীর পাতলা উপরের স্তর তুলে ধরা হয়েছে। আমি মনে করি, সেই সাহিত্যকর্মই টিকবে যেটি নিজস্ব সময় অতিক্রম করে গেছে। আজকে যে ছোটগল্প লেখা হলো, সেই ছোটগল্পের মধ্যে ২০২৭ সালে পড়বার একটা হাতছানি থাকতে হবে। ২০৩৭ সালে গিয়ে দেখলে দেখা যাবে এই গল্প ম্লান হয়নি। যদি ম্লান না হয় তাহলে এই গল্পটি কিন্তু যথার্থ গল্প। আজকে আমি একটি উপন্যাস লিখলাম, সেটির পাঁচটি অডিশন হলো। আমি কখনো মনে করি না, সেটা সেরা লেখা হয়েছে। সেরা লেখার জন্যে অভিজ্ঞতা ও পড়ার দরকার আছে। আধুনিক কালে যারা লিখছেন, অনেকেই নতুন লিখছে, অনেকের উপন্যাসের মধ্যে আমি বেঁচে থাকার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সেই লেখকদের নাম উল্লেখ করছি না। আমি দু-একজনের নাম উল্লেখ্য করলে অন্যরা ক্ষুব্ধ হবে। বর্তমানে যারা লিখছেন, লিখবার জন্যে যে পড়াশোনা সেখানে ঘাটতি আছে বলে আমার কাছে মনে হয়। অভিজ্ঞতাও খুব বড় একটি বিষয়। একটু উন্নতি করতে পারলেই আমরা বাংলা সাহিত্যে সচল থাকবো, চলমান থাকবো।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনি একটু আগে বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। লেখালেখির ক্ষেত্রে কল্পনার ভূমিকা তাহলে কোথায়?
হরিশংকর জলদাস : প্রথমে আমার লেখার কথা বলি, একবারে কল্পনাবিহীন তো লেখা যায় না। কল্পনা হলো দুটো ইটের মাঝখানে মশলার মতো। দুটি ইট মাঝখানের মশলা সিমেন্ট ও বালির মাধ্যমে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে। ঠিক এক খণ্ড বাস্তবতা ও আরেক খণ্ড বাস্তবতার সাথে যোগসূত্র নির্মাণের জন্যে কল্পনার মশলা দরকার আছে। আমার উপন্যাসের মধ্যে কল্পনার মশলা অবশ্যই আছে। উপন্যাসের কাহিনী বা গল্পের কাহিনীর মধ্যে সাজুয্য বিধান করার জন্যে কিন্তু বাস্তবতা বিশেষভাবে জরুরি। যে সমাজ নিয়ে লিখবে, সে সমাজের মানুষজনকে জানা জরুরি। তাদের জীবনযাপন, বিশ্বাস, প্রথা, উৎসব, দুঃখ, আনন্দ সম্পর্কে জানতে হবে। অভিজ্ঞতাবিহীন ঘরে বসেও লেখা যায়। তবে সে লেখা কিন্তু মানুষ পড়ে তৃপ্তি পাবে না। এ ধরনের লেখককে সময় ফেলে যাবে। আমার লেখার মধ্যে আমি বাস্তব বিষয়গুলো কেন্দ্র করে লিখি এবং সেটাই বোধহয় মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। কল্পনা দিয়ে দীর্ঘদিন লেখা হয়ে গেছে। শতসহস্র গল্প লেখা হচ্ছে ড্রইংরুমে বসে। কিন্তু সেগুলো ক’টি টিকেছে? বঙ্কিমচন্দ্র মাত্র ১০টি উপন্যাস লিখে টিকে গেছেন। কখন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন; আজকে কত শতজন তাকে আমরা অধ্যায়ন করছি। রবীন্দ্রনাথ ১২টি উপন্যাস লিখেই মনে করেছেন যে, আমার আর উপন্যাস লেখার দরকার নেই। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ মাত্র ৩টি উপন্যাস লিখে গেছেন। তাকে স্মরণ করছি। সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটা নির্মমতার বিষয় আছে। সেটি হলো, কোনো কোনো সাহিত্যকর্ম একজন লেখকের সকল সাহিত্যকর্মকে গ্রাস করে ফেলে। যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনেক লেখা লিখেছেন। কিন্তু তার কথা বললেই আমরা শুধু বুঝি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। জীবনানন্দ দাশও কতো লেখা লিখেছেন। যদিও তিনি গদ্যটাকে জীবিত অবস্থায় লুকিয়ে রেখেছিলেন। কতো কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন কিন্তু জীবনানন্দের কথা মনে পড়লেই ‘বনলতা সেন’র কথা চলে আসে। অথচ এদের সবার অনেক সমৃদ্ধ লেখা আছে। তারপরও সেসব কর্ম কম গুরুত্ব পাচ্ছে।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: যারা কথাসাহিত্য নিয়ে কাজ করেন, অনেকের অভিযোগ হচ্ছে তারা কবিতা পড়েন না- এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
হরিশংকর জলদাস : আমি তো মনে করি, যারা কবিতা পড়েন না, তারা অপরাধী। যারা গল্প-উপন্যাস পড়েন, লেখেন- সেই লেখকরা কবিতা না পড়লে বিস্মিত হতেই হয়। তবে এমন লেখকের সংখ্যা কম। আমি কবিদের আমার ‘শব্দগুরু’ বলি। আমি প্রচুর শব্দ কবিদের কাছ থেকে শিখেছি। আর কবিতা তো এক ধরনের গ্রীষ্মের তীব্র রোদের মধ্যে এক খণ্ড বটগাছের ছায়া। সে ছায়ার মধ্যে শীতলতা আছে, সে ছায়ার মধ্যে চিত্রকল্প আছে। কবিতার কোনো জাত নেই। আমরা নজরুলের কবিতা পেরিয়ে এসেছি, রবীন্দ্রনাথের কবিতাও পেরিয়ে এসেছি, জীবনানন্দের কবিতা আমরা চর্চা করছি। কিন্তু তারপর যারা লিখছেন তাদেরকে কেন আমরা পড়বো না? আমি ব্যক্তিগতভাবে কবিতা পাঠ জরুরি বলে মনে করি। আমি সহাস্যে এবং সজ্ঞানে আবারো বলছি, যারা কবিতা পড়ে না, তারা ভীষণ অপরাধী। আমি কবিতা পড়ি, কবিতা উপভোগ করি। 

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান : আপনার লেখালেখির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
হরিশংকর জলদাস : আমি মাছ নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে চাই। সেখানে প্রধান চরিত্র থাকবে মাছ। আমার ‘ইলিশ’ নামে একটি গল্প আছে। মাছের সাথে আমার জীবন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। আমি হিসাব করে দেখলাম, সমুদ্রপাড়ের জেলেদের নিয়ে কেউ লেখেননি; এ বাংলায় রিজিয়া রহমান ছাড়া। তিনি ‘রক্তের অক্ষর’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন আজ থেকে ৪২ বছর আগে। তারপর আর লেখা হয়নি। প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, গল্পও লেখা হয়েছে। আমার মনে হয়, মাছদের নিয়ে যে উপন্যাস লেখার চিন্তা করছি তা বেশ উপভোগ্য হবে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel