Breaking News
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ৭৩.৯৩
X
ঢাকা, বুধবার, ২ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
বুক রিভিউ

যে বই দূর করবে ‘মৃত্যুভয়’

অঞ্জন আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-০৮ ৪:২৪:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-০৮ ৪:২৪:০৪ পিএম
যে বই দূর করবে ‘মৃত্যুভয়’
Voice Control HD Smart LED

অঞ্জন আচার্য : আমাদের জীবন এবং পার্থিব অস্তিত্বের প্রারম্ভ জন্ম দিয়ে এবং এর অনিবার্য সমাপ্তি মৃত্যুতে। এটাই এ পৃথিবীর মহাসত্য। মৃত্যুভয় মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়। এটি এড়ানোর জন্য কত রকম চেষ্টাই না আমরা করি। অবচেতন মনে আমরা অবোধ শিশুর মতো কল্পনা করি, সবাই মরলেও আমি মরব না। কেন এই ভয়, কেন আমরা মৃত্যুকে সবসময় এড়িয়ে যেতে চাই, কেন এই মহাসত্যটিকে এক মুহূর্তও স্মরণ করতে রাজি নই- তার ব্যাখ্যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেয়া যেতে পারে। বিবর্তনের পথ বেয়ে মানুষ যত সভ্য হয়েছে, ভয় তত বেড়েছে। এইসব উদ্ভূত নানা প্রশ্নের অনুসন্ধান করেছেন লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুন তার ‘মৃত্যু : একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা’ বইটিতে।

প্রকৃতপক্ষে লেখক তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে সত্যটি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন তা হচ্ছে, জীবন ও মৃত্যু কেউ কারো শত্রু নয় বরং পরম বন্ধু। মানুষ যতদিন বাঁচে, এই দুইয়ের হাত পরস্পর ধরাধরি করে চলে। তাঁর মতে, দেহ একসময় অনিবার্য, প্রাণিজ কারণে ক্লান্ত হয়ে আত্মার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয়। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তি এই সন্দেহাতীত নিশ্চয়তাটি নিয়ে ভাবেন। এই অমোঘ সত্যকে স্বীকার করার সাহজ অর্জনের জন্য আমাদের প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিতে হয়।

মূলত ‘মৃত্যু’ শব্দটির সঙ্গে বাসা বেঁধে আছে একটি চিরন্তন ভয়। নিঃসন্দেহে মৃত্যু নিয়ে এই আদি ভয়টির উৎস ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। মৃত্যুর পরে শেষ বিচার, স্বর্গ-নরক, পুনরুত্থানের ইঙ্গিত- এতেও ভয়! পাপীর গোর-আজাব, শেষ বিচারের দিনে পাপ-পূণ্যের বিচার এবং স্বর্গ-নরকবাসের শুভ ও অশুভ আশঙ্কা ইত্যাদি সবই মৃত্যুর পরে যদি কোনো জীবন থাকে, তাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যেই সদা ব্যস্ত রাখে আমাদের। স্বাভাবিকভাবে ভাবনাটি আসে, ‘না মরলে’ তো এসব সংকট হতো না। কাজেই মৃত্যু সমস্ত ভয়ের ভিত্তি হয়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ঘাতকের মতো আমাদের পিছে পিছে ফেরে!

মৃত্যুভয় দূর করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো সমাধান আছে কিনা, তা জানার জন্য বিশ্বের ধনী দেশগুলো আয়ুবৃদ্ধির ওষুধ তৈরিতে বিলিয়ন-বিলিয়ন অর্থ খরচ করে যাচ্ছে। বিত্তবান আমেরিকানরা অর্থের জোরে মৃত্যুর পর দেহ ফ্রিজ করে রাখছে এই আশায়, একদিন চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হয়ে আবার তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দেবে! অন্যদিকে অনুন্নত আদিবাসীদের অনেকেই, যেমন : রেড ইন্ডিয়ানরা মৃত্যু নিয়ে কোনো ভয় পায় না। বরং তাদের কেউ মারা গেলে উৎসবের মধ্য দিয়ে তার সৎকার করা হয়। মেক্সিকোতে আদিবাসীরা বছরের একটি দিন ‘মৃত্যু-দিবস’ হিসেবে পালন করে। ওই দিন তারা সমাধিস্থল ফুলে-ফুলে, রঙিন কাগজে সাজিয়ে তোলে। দিনব্যাপী প্রিয়জনের সমাধি তারা ভরিয়ে দেয় সাজসজ্জায়। সমাধির পাশে নাচ-গান করে, সবাই মিলে বিশেষ খাবার খায়। এমন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উঠে এসেছে বইটিতে।

লেখকের অভিমত, মৃত্যুর জন্য জন্ম অনিবার্য ও প্রধান শর্ত। সেজন্য জন্ম নেয়ার পর পৃথিবীতে মানুষের যে অবস্থান, অর্থাৎ সে প্রাণ ধারণ করে এবং মৃত্যু অবধি তার শরীর ও মন-মানসিকতার নিয়মিত বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে, তাকে একশব্দে ‘জীবন’ বলা যায়। কিন্তু জীবনের যে ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য, তার বর্ণনা একশব্দে প্রকাশ করা যায় না। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে জানে একদিন তাকে মরতে হবে। সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন ধর্ম এবং সামাজিক সংস্কৃতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে আসছে, মৃত্যুর পরে কী ঘটে? প্রস্তরযুগে সামাজিক রীতি প্রচলিত ছিল, ব্যক্তিগত সামগ্রীসহ গোত্রপ্রধানদের কবরস্থ করা; যাতে মৃত্যুর পর যে জগতে তারা প্রবেশ করবে সেখানে জীবিকা নির্বাহে কোনোরকম অসুবিধা না-হয়। প্রাচীন যুগে মিশরীয়রা মৃত্যুকে আরেকটি নতুন জগতে যাওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বলে মনে করত। বিশ শতকের শুরুতে কয়েকজন বিজ্ঞানী মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস, সংস্কার, বিশেষ করে ধর্মীয় ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে জীবন-মৃত্যু-আত্মা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা শুরু করেন। তেমনই একজন সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত মৃত্যু-গবেষক ডা. এলিজাবেথ কুবলার রস। বইটিতে কুবলার রস-এর নানা গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া গত শতকের আশির দশকে জার্মানিতে মৃত্যুপথযাত্রীকে সঙ্গ দেয়ার জন্য ‘হজপিস’ নামে যে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনটি শুরু হয়, তার কথাও বিস্তারিত আছে বইটিতে। এর পেছনের কারণ, লেখক নিজে এই স্বেচ্ছাসেবীমূলক আন্দোলনের অংশ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মৃত্যুপথযাত্রীদের মৃত্যুভয় দূর করে সুখের সঙ্গে মৃত্যুকে বরণ করার মন্ত্র শিখেয়ে যাচ্ছেন হজপিস সদস্যরা। আছে মৃত্যু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সক্রেটিস থেকে আইনস্টাইনসহ অনেকের ভাবনা।

বইটি মোট বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত : ‘জন্ম ও মৃত্যু’, ‘জীবন : জন্ম-মৃত্যুর সাঁকো’, ‘মৃত্যুভয় ও নিবারণ’, ‘মৃত্যুর পথে বিভিন্ন পর্যায়’, ‘হজপিস আন্দোলন’, ‘মৃত্যুসঙ্গ ও কয়েকজন মৃত্যুপথযাত্রীর কথা’, ‘প্রায়-মৃত্যুর অভিজ্ঞতা’, ‘অন্তিমযাত্রা’, ‘শেষ মুহূর্তটির আগে ও পরে’, ‘মৃত্যুর পর জীবন’, ‘নশ্বর জীবন, শাশ্বত ভালোবাসা’, ‘মৃত্যুর কোনো অস্তিত্ব নেই’ প্রভৃতি শিরোনাম দেখেই খানিকটা উপলব্ধি করা যায় বইয়ের বিষয়বস্তু। একেকটি অধ্যায় আলোচিত হয়েছে একেকটি বিষয়কে ঘিরে; নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে মৃত্যু প্রসঙ্গ। তবে এখানে স্থান পেয়েছে লেখকের দর্শনগত দৃষ্টিভঙ্গি। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক, ধর্মতাত্ত্বিক, যুক্তিবাদ, আধ্যাত্মিক, নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক ইত্যাদি নানা দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা হয়েছে মৃত্যুকে। লেখকের মতে, “আমরা জন্ম নেয়ার পর জীবনকে নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকি যে, সূর্যোদয়ের পর সূর্যাস্ত যে অনিবার্য তথা জন্মের পর মৃত্যু যে অবধারিত, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ আমাদের নেই।” পাঠকের উদ্দেশে লেখকের দৃঢ় উচ্চারণ : “নানা বিষয় ভেবেচিন্তে আমার মনে হয়েছে মৃত্যু নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও দীর্ঘ আলোচনা সময়ের দাবি এবং তা কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করবে না। এ ব্যাপারে পাশ্চত্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ তথ্যাবলির উল্লেখ করে এই বইটি লিখতে শুরু করি আমি। পাঠকদের আমি মৃত্যু সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে চাই। আমার বিশ্বাস, এই বইটি পড়ার পর আপনার মৃত্যুভয় কমবে, বাড়বে না।”

মৃত্যু : একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা; আবদুল্লাহ আল-হারুন; প্রকাশক : অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি; প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৯; প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান; পৃষ্ঠা : ২০৮; মূল্য : ৩৫০ টাকা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ এপ্রিল ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge