ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

১২ নভেম্বর কেন ‘উপকূল দিবস’ চাই?

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-১১ ৩:৫৭:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-১১ ৬:০৭:৪৬ পিএম
উপকূলের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কথা বলার জন্য একটি দিবস জরুরি

রফিকুল ইসলাম মন্টু: একটি দিবস চাই। উপকূল দিবস। হয়তো প্রশ্ন জাগবে, এত দিবসের ভিড়ে কেন আবার ‘উপকূল দিবসের’ দাবি? আমার প্রশ্নটা ঠিক এর বিপরীত। এত দিবস থাকা সত্ত্বেও ‘উপকূল দিবস’ নেই কেন? উপকূল অঞ্চল ঘুরে খবরের খোঁজ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল কয়েক বছর আগে থেকেই। খবর লেখার মধ্য দিয়ে আমি প্রতিদিন উপকূলের কথা বলি। কিন্তু একটি দিবস থাকলে অন্তত সবাই মিলে একযোগে উপকূলের কথা বলার সুযোগ পাই! দিন ঠিক করার আগে নিজের কাছে নিজের আরেকটা প্রশ্ন- কেন উপকূল দিবস চাই?

যে কোনো দিবস দাবির পেছনে রয়েছে অনেক যৌক্তিকতা। দিবস কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারে, দিবস অধিকার আদায়ের কথা বলতে পারে, দিবস পারে জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর জোরালো করতে। কেন উপকূল দিবস চাই- প্রশ্নটির সহজ জবাব হলো, উপকূলের মানুষের কণ্ঠস্বর জোরদার করার মধ্য দিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রতিবছর একটি সুনির্দিষ্ট দিনে উপকূল দিবস পালিত হলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের মাঝে সচেতনতা বাড়বে। তথ্য আদান-প্রদান, তথ্য অধিকারের বিষয়গুলো নিশ্চিত হবে। কেন্দ্রের কাছে পৌঁছাবে উপকূলের কণ্ঠস্বর।

উপকূলের প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমূখী দুর্যোগের সঙ্গে বাস করেন। কেবল দুর্যোগ এলেই এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও তাদের জীবন যে কতটা অস্বাভাবিক, সে বিষয়ে খুব একটা খোঁজ রাখা হয় না। উপকূলের দিকে গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের নজর বাড়িয়ে উপকূলবাসীর জীবনমান উন্নয়ন ঘটানোই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। উপকূলের প্রান্তিকের তথ্য যেমন কেন্দ্রে পৌঁছায় না, ঠিক তেমনি কেন্দ্র মাঠে পৌঁছাচ্ছে না বহুমূখী কারণে। মোটামুটি এগুলোই উপকূল দিবস প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি।  

এবারের চিন্তা দিন নিয়ে- কোন দিনটিকে ‘উপকূল দিবস’ প্রস্তাব করা যায়! খুঁজে পাই ১২ নভেম্বর। এটাই উপকূলবাসীর কাছে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়। কারণ, ১৯৭০ সালের এই দিনে উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল গোটা উপকূল। এদিন বাংলাদেশের উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যায় সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ভোলা সাইক্লোন’। এই ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেয় উপকূল। বহু মানুষ প্রাণ হারান। ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসেন। এই ঘূর্ণিঝড় গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ৩ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ৮ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হয়। ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১১ নভেম্বর এটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটারে পৌঁছায়। ওই রাতেই উপকূলে আঘাত হানে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে বলে বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে মারা যায় প্রায় দশ লাখ লোক।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ থেকে উপকূলের জন্য এই দিনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতি আবহাওয়া ঘটনার শীর্ষ তালিকা প্রকাশ করে চলতি বছরের ১৮ মে। ওই তালিকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়টিকে পৃথিবীর সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতি ঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৩ নভেম্বর ভোর পর্যন্ত বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) উপকূল অঞ্চলে সর্বকালের প্রাণঘাতি ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে। অন্যদিকে উইকিপিডিয়ার সূত্র বলছে, এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড় সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এ ঝড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে বাংলাদেশের ভোলা এবং তৎকালীন নোয়াখালী (নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর) উপকূলে।

ভাবি, এই দিনটিকেই উপকূল দিবস প্রস্তাব করা যায়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে ২০১৬ সালে এই দিবসের প্রস্তাব তুলে জনমত গঠণের চেষ্টা করি। লেখার শিরোনাম ছিল- ‘১২ নভেম্বর হোক উপকূল দিবস’। সমগ্র উপকূল থেকেই ব্যাপক সাড়া পাই। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ১২ নভেম্বর বেসরকারিভাবে ‘উপকূল দিবস’ হিসাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৭১০ কিলোমিটার সমুদ্ররেখা পূর্বে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পশ্চিমে সাতক্ষীরার শ্যামনগর পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলের সর্বত্র ১২ নভেম্বর উপকূল দিবসের আওয়াজ। সমগ্র উপকূলের ১৫ জেলার ৩২ উপজেলার ৩৪টি স্থানে ‘উপকূল দিবস’ পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটির আহবানে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রায় ১০০ সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবস পালনে এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যকর্মীদের সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, কিশোর-তরুণদের ফোরাম ইত্যাদি। দিবস পালনের প্রধান উদ্যোক্তা হিসাবে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উপকূল বাংলাদেশ, কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ- আলোকযাত্রা দল।

ঝড়-ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ এক জনপদের নাম উপকূল। যেখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে। কৃষকের শ্রম-ঘামের বিনিময়ে কোন বছর মাঠে ভালো ফসল হলে প্রকিৃতর বৈরিতায় সে ফসল আর ঘরে তোলা সম্ভব হয় না। কষ্টের জমানো অর্থের সঙ্গে ঋণের টাকা যোগ করে নতুন ঘরখানা হয়তো এবছর মাথা তুলেছে, ঠিক পরের বছরই ঝড়ের ঝাপটায় মাটির সঙ্গে মিশে যায় সে ঘর। জলোচ্ছ্বাস, নদী-ভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে মানুষগুলোকে। সে তো উপকূল! নোনাজলের ঝাপটায় ক্ষত-বিক্ষত হবে সে, এটাই স্বাভাবিক! উপকূলবাসীর দিকে বছরে অন্তত একটি দিন বিশেষভাবে নজর ফেলার জন্য, উপকূলের সংকট-সম্ভাবনার কথা বছরে অন্তত একটিবার সবাই মিলে বলার জন্যে একটি বিশেষ দিন চাই। যেদিন সবাই মিলে একযোগে উপকূলের কথা বলবে। উপকূলবাসীর জন্য সবচেয়ে শোকের দিন হিসাবে পরিচিত ১২ নভেম্বরই হতে পারে ‘উপকূল দিবস’। শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এই দিনটি ‘ওয়ার্ল্ড কোস্টাল ডে’ হওয়া উচিত।

উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে ঘুরেফিরে একই চিত্র আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় মোরা’র অভিজ্ঞতাও আমাদের সেই কথাগুলোই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। তথ্যশূন্যতা, মানুষের অসচেতনতা, আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা, সিগন্যাল বিভ্রান্তি ইত্যাকার নানান বিষয় এবারও আমাদের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতির দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল। প্রান্তিক জনপদের মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা চিরাচরিত। শখের হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু এবং অন্যান্য সম্পদ ছেড়ে তারা অন্য কোথাও যেতে চান না। অনেককে বলতে শুনেছি, অন্তত একজনকে থাকতে হবে। কারণ, পানি বাড়লে গবাদি পশুর বাঁধন কে খুলে দেবে। আবার আশ্রয়কেন্দ্রে যারা যাচ্ছে, তারাও নানামূখী ঝামেলায় পড়েন। আশ্রয়কেন্দ্র তালাবদ্ধ থাকার কথা শুনে আসছি সেই কবে থেকে। এবারও সেটা ছিল কোথাও কোথাও। অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও সেখানে যাওয়ার রাস্তা ভালো নয়। অধিকাংশ স্থানে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার পরিবেশ নেই ইত্যাদি। কোনো কোনো স্থান থেকে শুনেছি, আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার নেই, পানি নেই, টয়লেটের ব্যবস্থা নেই।

লক্ষ্যণীয়, শত চেষ্টার পরেও ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলের একেবারে প্রান্তিকের সব খবর কেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। বিশেষ করে চর কিংবা দ্বীপাঞ্চলে গণমাধ্যমকর্মীদের যাওয়া দুরূহ ব্যাপার। সড়ক পথে যেখানে যাওয়া সম্ভব সেখান থেকেই টেলিভিশন লাইভ প্রতিবেদন দেখানো হয়। ঝড়ের সময় অধিকাংশ চরের, দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানকার বিপদের খবরগুলো তাৎক্ষণিক জানা সম্ভব হয় না। পরে হয়তো সব খবর জানা যায়, কিন্তু তাৎক্ষণিক খবরাখবর পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ খুবই নাজুক। শক্ত বেড়িবাঁধ না থাকায় ছোট ধাক্কাতেই অনেক স্থানে বড় ক্ষতি হয়। উপকূলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি, বেড়িবাঁধের অবস্থা একেবারেই নাজুক যে বড় ঝাপটার প্রয়োজন নেই, ছোট ঝাপটাই এই বাঁধ ভেঙ্গে দিতে পারে। এবং বার বার ঘূর্ণিঝড়ে দিচ্ছেও। প্রশ্ন হলো, এগুলো বার বার দেখেও আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি?

উপকূলে গণমাধ্যমের নিবিড় নজরদারির কথা আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি। গণমাধ্যম কেন শুধু জরুরি সময়ে আসবে? ঘূর্ণিঝড়ের বাইরে উপকূলে কী আর কোনো খবর নেই? এই আশ্রয়কেন্দ্রের কথা বলছি, বাঁধের কথা বলছি, সিগন্যালিং কিংবা সচেতনতার কথা বলছি, এগুলো নিয়ে তো বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কিংবা প্রচারের সুযোগ আছে। একেবারে যে প্রচার হচ্ছে না, তা নয়। তবে মাত্রাটা আরও বাড়ানো দরকার। ফলে মানুষ সচেতন হতে পারে। অসংলগ্নতা দূর হতে পারে। এর ফল হয়তো আমরা বিশেষ সময়ে অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড় এলে পেতে পারি। এভাবে গণমাধ্যম উপকূলের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

উপকূলের উন্নয়ন, সংকটের উত্তরণ, সম্ভাবনা বিকাশসহ উপকূলের অন্ধকারকে প্রকাশের আলোয় আনতে ‘উপকূল দিবস’ প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি। দিবস পালনের ভেতর দিয়ে প্রতি বছর অন্তত একটি দিনে সবাই মিলে উপকূলের কথা বলা যাবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দিবস পালনের মধ্য দিয়ে উপকূলের ইস্যুসমূহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারবে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলের নতুন নতুন দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলতেও একটি দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।   

দিবস তো কতই আছে! পাখি দিবস, পানি দিবস, শকুন দিবস, হাতি দিবস, শিক্ষা দিবস, স্বাস্থ্য দিবস, জনসংখ্যা দিবস, নারী দিবস, গ্রামীণ নারী দিবস, মানবাধিকার দিবস, ভালোবাসা দিবসসহ আরও কত দিবসের ভিড়ে আরেকটি দিবসের প্রস্তাব করছি শুধুমাত্র উপকূলের জন্যে। যে দিবস উপকূল সুরক্ষার কথা বলবে, উপকূলের সংকট-সম্ভাবনার কথা বলবে, উপকূলকে এগিয়ে নেওয়া কথা বলবে। যে দিবসে উপকূলবাসীর কণ্ঠস্বরে ধ্বনিত হবে। আর এভাবেই উপকূল এগিয়ে যাবে বিকাশের ধারায়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ নভেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel