ঢাকা     রোববার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৭ ||  ০৯ সফর ১৪৪২

কালো শুক্রবার

কাজী জহিরুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:৪২, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
কালো শুক্রবার

প্রবাসী বাঙালিরা সব সময় এক ধরনের  শূন্যতায় ভোগেন। কি যেন নেই, কি যেন নেই অবস্থা। বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, চাকরি আছে, টাকা আছে, স্ত্রী-সন্তান আছে, কারো কারো বাবা-মা, ভাই-বোনও আছে, ছেলে-মেয়েরা ভালো স্কুল-কলেজে পড়ছে, বন্ধু-বান্ধব আছে, আড্ডা আছে, হই-হুল্লোড় আছে, তার পরেও এক অমোঘ শূন্যতা।

এই শূন্যতাবোধ তাড়াতেই আমরা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি। বেশি বেশি করে এই উৎসব সেই উৎসব পালন করি, হোক না সেটা ভিনদেশী সংস্কৃতির উৎসব।

আমেরিকানদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস (থ্যাংক্স গিভিং ডে)। নভেম্বর মাসের  তৃতীয় বৃহস্পতিবার এই দিবস ওরা পালন করে। এটি মূলত আমাদের নবান্ন উৎসবের সমার্থক একটি দিবস। ১৬২১ সালে ইংরেজরা আমেরিকায় এসে এই দিবসের প্রবর্তন করে। দিবসটি নিয়ে প্রচুর মিথ আছে। নানান রকমের বিশ্বাস আছে। তবে ইতিহাস হলো, ফসল তোলার পর, সুস্বাস্থ্য এবং ভালো ফসল দেবার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় বলে এর নাম ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস।

শুরুতে দিনটি নভেম্বরে ছিল না। বিভিন্ন শাসক দিনটি পরিবর্তন করেছেন। এখন এটি দাঁড়িয়েছে নভেম্বরের তৃতীয় বৃহস্পতিবারে। এই রচনার উদ্দেশ্য যেহেতু ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস নয় তাই এই দিনের তাৎপর্য এখানেই শেষ করি। ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবসের পরের দিনটি হলো শুক্রবার। এই দিনটিকে বলা হয় কালো শুক্রবার (ব্লাক ফ্রাইডে)। কালো শুক্রবার হলো মার্কিন তরুণ-তরুণী এবং গৃহিনীদের কাছে পাগলা শুক্রবার।

এই দিনে সবাই পাগল হয়ে যায় কেনা-কাটা করার জন্য। কারণ বিক্রেতারা এই দিনে জিনিসপত্র পানির দামে বিক্রি করে। আসলে কি পানির দামে বিক্রি করে? নাকি কোনো শুভঙ্করের ফাঁকি আছে এখানে?

আমরাও ঘটা করে ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস পালন করছি। আমাদের বন্ধু, ব্যবসায়ী শামীম আহমেদের কলেজ পয়েন্টের বাড়িতে বসেছে ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবসের উৎসব। এই দিনের প্রথা হচ্ছে, তিতির মুরগী বা টার্কির মাংস খেতে হবে। তা-ও আবার আস্ত টার্কির গ্রিল। ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবসের টার্কি খেয়ে যখন কলেজ পয়েন্ট থেকে বেরিয়েছি তখন রাত ২টা।

অগ্নির বয়স তখন সতের। সতের বছরের ছেলে বলে, আব্বু, চলো শপিংয়ে যাই। রাত ২টার সময় শপিং? ও বলে হ্যাঁ, তুমি জান না, ব্লাক ফ্রাইডে শুরু হয়ে গেছে। রাত বারোটা থেকেই সব দোকান-পাট খোলা। ওর কথায় কান না দিয়ে আমি বাড়ির পথ ধরি। কালো শুক্রবারে আমাদের অফিস খোলা থাকলেও অনেক অফিস ছুটি দিয়ে দেয়। ক্যালিফোর্নিয়াসহ আমেরিকার অনেক অঙ্গরাজ্যে এটি সরকারি ছুটির দিন। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষ অন্য একটি ফেডারেল ছুটি বাতিল করে কালো শুক্রবারে ছুটি দিয়ে দেয়। স্কুল-কলেজ অবশ্য সারা দেশেই বন্ধ থাকে। আমি পরিবারের সাথে টানা চার দিন কাটাব বলে শুক্রবারে ছুটি নিয়ে নিয়েছি।

আমার ছেলে খুব ভোরে উঠে স্কুলে যায়। তাই ছুটির দিনগুলোতে বেশ বেলা করে ওঠে। কিন্তু কালো শুক্রবারের সকালে ভোর ছয়টায় সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কে ওখানে? কে আবার, অগ্নি। ওপর-নিচ করছে, পরোক্ষভাবে বাবার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা। শুয়েছি রাত তিনটায়। কিন্তু কি আর করা, অগত্যা উঠতেই হলো। ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শপিংয়ে।

যুক্তরাজ্যে কালো শুক্রবারের অনুরূপ যে দিবসটি পালন করা হয় তা হলো বক্সিং ডে। বাংলা করলে কি ‘ঘুসি দিবস’ দাঁড়ায়?  আসলে এটা ঘুসাঘুসির বক্সিং না, উপহার সামগ্রী বাক্সে ভরাকে বক্সিং বলা হয়েছে। তাহলে বাংলায় কি বলা যায় ‘বাক্স দিবস?’। বাক্স দিবস পালিত হয় বড়দিনের পরদিন। খ্রিস্টান অধ্যুষিত প্রায় সব ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দেশেই বাক্স দিবস পালন করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্য ১৯৯৪ সাল থেকে এই দিনের নাম পরিবর্তন করে রেখেছে কল্যাণ দিবস (ডে অব গুডউইল)। ইওরোপের কয়েকটি দেশ এই দিনটিকে বলে ‘সেইন্ট স্টিফেনস দিবস’। বাক্স দিবসের জন্মের সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও ইংরেজ নৌ প্রশাসক স্যামুয়েল পেপি’র দিনপঞ্জি ঘেঁটে গবেষকেরা বের করেছেন, ১৯ ডিসেম্বর ১৬৬৩ সালের এক দিনলিপিতে স্যামুয়েল পেপি লিখেছেন, বড়দিনের পরদিন ইংরেজ ধনী লোকেরা তাদের কর্মচারী বা দাসদের ঘরে যেতেন উপহারের বাক্স নিয়ে। সেই থেকেই বাক্স দিবসের প্রচলন শুরু। কেন ধনী লোকেরা দাসদের ঘরে উপহারের বাক্স নিয়ে বড়দিনের পরদিন, অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বরে যেতেন? কারণ ক্রিসমাসের দিন তারা প্রচুর উপহার পেতেন, সেখান থেকে কিছু উপহার তারা দাস-দাসীদের দিয়ে দিতেন বড়দিনের উপহার হিসেবে, মূল দিবসের একদিন পরে।

এখন এইদিনে জিনিসপত্র পানির দামে বিক্রি করে দেয় বিক্রেতারা। প্রথাগতভাবে ব্রিটিশরা বড়দিনের পরদিন সস্তায় অবিক্রিত কাপড়-চোপড় কিনত কাজের লোকদের জন্য। এখন অবশ্য বাক্স দিবসে মানুষ শুধু কাপড়-চোপড়ই নয় হাঁড়িকুঁড়ি, ফ্রিজ-টিভি থেকে শুরু করে সবই কেনে, এই দিনেই বছরের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। যেমনটি আমেরিকায় হয় কালো শুক্রবারে। এ বছর কালো শুক্রবারে আমেরিকায় মোট বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার নয়শ কোটি ডলারের পণ্য। অবশ্য বাজারজাতকরণ বিশেষজ্ঞদের এতো প্রচার-প্রপাগান্ডার পরেও এ বছর বিক্রির পরিমাণ গত বছরের চেয়ে ১১ শতাংশ কমে গেছে। ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে ৫ শতাংশ। এ বছর কেনাকাটা করেছে মাত্র ১৩ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ।

আমরা এখন ছুটছি রুজভেল্টফিল্ড মলের দিকে। গাড়ির গতি বাড়াতে অগ্নি তাড়া দিচ্ছে। কারণ সস্তায় দেওয়া ব্র্যান্ডের জিনিসগুলো সীমিত, দেরি  করলে আর পাওয়া যাবে না।

[ঘটনাটি এবং তথ্যসমূহ ২০১৪ সালের]

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত

 

ঢাকা/সাইফ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়