Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ১৬ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ২ ১৪২৮ ||  ০৩ জিলক্বদ ১৪৪২

‘দেশে অনুদান নয়, আমরা আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করেছি’ 

আমিনুল ইসলাম শান্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৫২, ১০ জুন ২০২১   আপডেট: ১৬:১৬, ১০ জুন ২০২১
‘দেশে অনুদান নয়, আমরা আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করেছি’ 

১৯ বছর পর কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমা। এবারের অর্জন তরুণ নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদের হাত ধরে। কানের অফিসিয়াল সিলেকশনের ‘আঁ সেত্রাঁ রিগা’ বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে সাদের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। নিভৃতচারী মেধাবী এই নির্মাতা এর আগে ২০১৬ সালে নির্মাণ করেন ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’। বোদ্ধামহলে ছবিটি প্রশংসিত হয়। কিন্তু এতো প্রশংসা যাকে ঘিরে তিনি আলোচনার আড়ালে থাকতেই যেন স্বস্তি বোধ করেন। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ প্রসঙ্গে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন সিনেমার সহ–প্রযোজক রাজীব মহাজন। কথোপকথনে উঠে এসেছে নির্মাতা সাদের কর্মভাবনাও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিনুল ইসলাম শান্ত

রাইজিংবিডি: ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর শুরুর ভাবনাটা জানতে চাই। 

রাজীব: ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ সিনেমার প্রিমিয়ার সিঙ্গাপুরে শেষ হওয়ার পর মূলত আমাদের এই জার্নি শুরু হয়। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে সাদসহ আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন দ্বিতীয় ফিল্ম নিয়ে সে কী ভাবছে- জানতে চাই। আমরা বন্ধু। দুজনের বাড়ি চট্টগ্রামে। যদিও পরস্পরকে আমরা ‘আপনি’ সম্বোধন করি। যাই হোক, ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ সিনেমার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু সাদ দ্বিতীয় সিনেমার সঙ্গে আমাকে যুক্ত করতে চাচ্ছিল। আমি তখন রাইটিং প্রসেসিং এবং প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হই।  ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সিনেমার যে প্লট এটি শুরুতে ছিল না। শুরুতে এটি বাংলাদেশি এক যুবকের গল্প ছিল। যে ব্যাংককে বসবাস করতো।

রাইজিংবিডি: সিনেমার গল্প পরিবর্তন হলো কেন? 

রাজীব: সিঙ্গাপুরে জেরেমি চুয়াওর সঙ্গে সাদের পরিচয় হয়। জেরেমি লেখক। তার ভাবনার সঙ্গে আমাদের ভাবনা মিলে যায়। আমরা তিনজন মিলে গল্প লেখার কাজ শুরু করি। গল্পের চরিত্র নিয়ে রিসার্চের জন্য  আমরা তিনজনই ব্যাংকক গিয়েছিলাম। চরিত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশে বসে যে ড্রাফট রেডি করেছিলাম তার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেস্টির জায়গা থেকে আমাদের বিষয়টি খারাপ লেগেছিল। সাদ বিষয়টি একেবারেই মেনে নিতে পারছিল না। দেশে ফিরে সাদ সিদ্ধান্ত নেয় এই প্লট নিয়ে সিনেমা সে বানাবে না। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সিনেমার প্লট নিয়ে সাদের আগে থেকেই ভাবনা ছিল। আমরা দুটি ড্রাফট রেডি করি। পরে এশিয়ান প্রজেক্ট মার্কেটে সিনেমাটির চিত্রনাট্য পাঠানোর পর সেটি নির্বাচিত হয়। মূলত সেখানে গিয়ে যারা ফান্ডিং নিয়ে কাজ করে তাদের অনেকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ বানানোর।

রাইজিংবিডি: সিনেমাটির গল্পে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এক প্রযোজক…

রাজীব: বুসান থেকে ফিরে আমরা চেষ্টা করছিলাম আন্তর্জাতিক আরো কোনো প্রোডাকশন করা যায় কিনা। আমরা ফ্রান্সের একটি ফান্ডের জন্য আবেদন করতে চাই। কিন্তু এ জন্য প্রযোজক প্রয়োজন। তখন একজন প্রযোজক আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তিনি গল্পে কিছু পরিবর্তন আনতে বলেন। কিন্তু সাদ এবং আমরা সিদ্ধান্তে অনড় ছিলাম। সাদ যেভাবে রিসার্চ করে গল্পটি গড়ে তুলেছে, সে জায়গা থেকে সে সরে আসতে চায়নি। এরপর আমরা নিজেদের মতো করে ফান্ডিং ম্যানেজ করার চেষ্টা করি। ২০২০ সালে পোস্ট প্রোডাকশনের জন্য দোহা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পাঠালে তারা আমাদের আবেদন গ্রহণ করেন। সাউন্ড, কালার গ্রেডিং, মিক্সিংয়ের কাজ বাইরে করালে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হতো। এত টাকা আমাদের ছিল না। এ জন্য দোহা ইনস্টিটিউটে আবেদন করেছিলাম; ওরা একসেপ্ট করেছিল। 

রাইজিংবিডি: গত বছরও কান চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি জমা দিয়েছিলেন…

রাজীব: হ্যাঁ। ২০২০ সালে সিলেকশনের জন্য ওখান থেকে আমাদের ই-মেইল পাঠানো হয়েছিল। তারা জানায়, করোনার কারণে উৎসবটি ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এত বড় সম্মানের একটি বিষয়, অথচ আমরা কানে যেতে পারব না, রিপ্রেজেন্ট করতে পারব না, কানে ছবিটা কেউ দেখবে না- তা হয় না। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নেই সিনেমাটি পুনরায় পরের বছর জমা দেওয়ার। এ সময় সিনেমার কিছু জায়গা পুনরায় সম্পাদনা করার সিদ্ধান্ত নেয় সাদ। এরপর কান চলচ্চিত্র উৎসবের জমা দিলে তারা এটি অফিসিয়াল বিভাগ ‘আঁ সেত্রাঁ রিগা’র জন্য নির্বাচন করে। 

রাইজিংবিডি: আপনাদের এই জর্নি মসৃণ ছিল না। প্রতিকূল পরিবেশে সিনেমা নির্মাণের অভিজ্ঞতা যদি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতেন।

রাজীব: সাদ পেশাদার বিজ্ঞাপন নির্মাতা। আমি তেমন কোনো চাকরিও করতাম না। কিন্তু গল্প নিয়ে যখন কাজ করেছি, তখন টানা দুই সপ্তাহ ঘর থেকে বের হতাম না। ১৪ দিন পরে যখন সূর্যের আলো দেখতাম ভালো লাগতো। দুই বছর গল্প লেখার জন্য সময় দিয়েছি। এ সময় আমি কিংবা সাদ অন্য কাজ করিনি। এ সময় আমাদের অর্থনৈতিক সাপোর্ট দরকার ছিল। কারণ আমরা দুজনেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাছাড়া যাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সিনেমাটি বানিয়েছি, তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপও মাথায় ছিল। তারপরও ঝুঁকিটা আমরা নিয়েছি। 

রাইজিংবিডি: সরকারি অনুদানের জন্য সিনেমাটি জমা দিয়েছিলেন?

রাজীব: দেশে অনুদান পাওয়ার একটা প্রসেসিং রয়েছে, যা সময়সাপেক্ষ। যে কারণে দেইনি। আমরা আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করছিলাম। 

রাইজিংবিডি: অভিযোগ আছে, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ঘরানার সিনেমা দেশে অনুদান পায় না। আপনিও কি একমত এই বক্তব্যে? 

রাজীব: এ বিষয়ে আমার কোনো গবেষণা নেই। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যারা কাজ করেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার মনে হয়, তরুণদের এখন কাজের সুযোগ করে দেওয়ার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।

রাইজিংবিডি: আজমেরী হক বাঁধনকে মরিয়ম চরিত্রে নেয়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ ছিল কি?

রাজীব: বিষয়টি কাস্টিং ডিরেক্টর ইয়াসির ভালো বলতে পারবেন। বাঁধন আপাকে কাস্ট করার পর আমি নিজেও অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু যৌক্তিক এবং আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। এই চরিত্রের জন্য অনেকেই অডিশন দিয়েছিলেন।  ‘মরিয়ম’ চরিত্রের জন‌্য বাঁধন আপা দীর্ঘ নয় মাস রিহার্সেল করেছেন। তার ত‌্যাগ, পরিশ্রম কোনো কিছুর কমতি ছিল না। যদি সঠিক রিহার্সেল না হতো তবে এতদূর পর্যন্ত আসতে পারতাম না। তিনি যে পারফরম‌্যান্স করেছেন তার জন‌্য এই সম্মান উপযুক্ত। তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।          

রাইজিংবিডি: আপনাদের সিনেমায় তারকা-মুখ কম। এটি কি ইচ্ছে করেই…। 

রাজীব: অডিশন থেকে যাদের প্রতি আস্থা জন্ম নেয়, তাদেরকেই চূড়ান্ত করা হয়। আমরা পেশাদার, অপেশাদার আলাদা করে দেখি না। মূলত আমাদের কোনো টার্গেট ছিল না- এদের নিতেই হবে। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী সময় কে দিতে পারবেন- চরিত্র নির্বাচনে এই বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। 

বাম থেকে নির্মাতা সাদ, লেখক জেরেমি চুয়াও এবং সহ–প্রযোজক রাজীব মহাজন, ছবি: আলেক্সান্দ্রা সাশা ডন 

রাইজিংবিডি: অনেকেরই অনুযোগ- এতো বড় একটি সাফল্য অথচ নির্মাতাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আব্দুল্লাহ সাদ মিডিয়ার সামনে আসেন না- এর বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা?

রাজীব: প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্ব চিন্তা-দর্শন থাকে। তাদের সে অনুযায়ী কাজ করতে দেওয়া উচিত। শিল্পীর কাজ সৃষ্টি করা। তার কাজের মাধ্যমেই তাকে চেনা যায়। প্রশ্ন করে শিল্পীর কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার চেয়ে, তার কর্ম নিয়ে গবেষণা করে উত্তর খুঁজে নেওয়া ভালো। চিত্র প্রদর্শনীতে অনেক পেইন্টিং থাকে। পেইন্টিং দেখে নিজের মতো সেসবের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু কেউ যদি শিল্পীকে ডেকে এনে তার পেইন্টিংয়ের অর্থ জানতে চান- তবে তা কঠিন! এই জায়গা থেকে আমার মনে হয় শিল্পীর সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করা উচিত। মিডিয়ার সামনে না আসার সিদ্ধান্ত একান্ত সাদের আইডোলজি। সাদ যে মিডিয়ার সামনে আসবে না তা নয়, আগেও আসার চেষ্টা করেছিল কিন্তু হয়নি। সাদ অস্বস্তি বোধ করে। 

রাইজিংবিডি: আপনারা বন্ধু এবং সহকর্মী। আপনার  দেখা পরিচালক সাদ সম্পর্কে জানতে চাই।

রাজীব: আমি অনেকভাবে সাদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তার সিনেমাটিক চিন্তা ভিন্ন। সমসাময়িক সব বিষয়ে সাদের পড়াশোনা রয়েছে। সমানতালে বই-পত্রিকা পড়ে। প্রত্যেক কাজের ফাঁকে দেখি সাদ বই বা পত্রিকা পড়ছে। যে কোনো বিষয়ে তার পর্যালোচনা দারুণ। লেখার হাতও দুর্দান্ত! 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়