ঢাকা     বুধবার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৯ ১৪২৯

একটি প্রতিশ্রুত ঝড়ের পূর্বাভাস

অলাত এহ্সান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১৪, ২ জানুয়ারি ২০২৩  
একটি প্রতিশ্রুত ঝড়ের পূর্বাভাস

আবহাওয়া অফিস তার দূরদর্শিতার কাছে আত্মসমর্পণ করে চিঠি লিখতে বাধ্য হবে— এমন একটা অহমপূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে তিনি চাকরি ছেড়ে ছিলেন। তারপর তিনি এমন এক গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন যেখানে কি না ডাক-ই পৌঁছায় না। কেননা, তিন-তিনবার তাকে কাজে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়ে ভিওআইপি ডাকে পাঠানো পত্র গ্রহণযোগ্য কাউকে না পেয়ে অফিসে ফেরত এসেছিল। পরের বছর তিনি পদোন্নতি পেয়ে আবহাওয়া অফিসের উপপরিচালক হওয়ার সম্ভাবনার কথা মনে রেখে; পরিত্যাগের তুলনায় তার প্রত্যাশা বেশ গৌণ বলে সবার ধারণা, যেহেতু তার প্রত্যাশার পুরোটাই নির্ভর করছে প্রকৃতির খেয়ালের ওপর। 

কোনো এক বৈশাখে এমন এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় হবে যা দেশের দক্ষিণ জনপদকে নতুনভাবে নির্মাণ করবে— এমনটাই ছিল মঞ্জু মুহম্মদের বক্তব্য। আমাকে অন্তত এ কথাই জানিয়েছিল তার সাবেক অফিস। আমি ভেবে রেখেছিলাম সুযোগ হলে তার সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করব। কিন্তু কোনো ঠিকানাই তার প্রত্যাখ্যাত অফিস দিতে পারেনি। শুধু বলেছিল ফরিদপুরের এক গ্রামে। তাই তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সম্ভাবনাও কম অদৃষ্টের ব্যাপার নয়। সে ব্যাপারই একদিন ঘটেছিল অপ্রত্যাশিতভাবে; আর তার প্রত্যাশাও ঠিক ছিল বলে আমার ধারণা।

সে বছর মধ্য বৈশাখেও মেঘবৃষ্টির লেশ দেখা যাচ্ছিল না, প্রচণ্ড রোদে ভাজা ভাজা হচ্ছিল শহর-গ্রাম। গরমে হাঁপিয়ে উঠছিল মানুষ ও পশু-প্রাণী। রাতেও গরম আবহাওয়ার কোনো কমতি নেই, ঘুমানো যাচ্ছিল না। কেউ কেউ দুপুরে টিনের চালে পানি ছিটিয়ে ঠান্ডা করে ঘরের নিচে থাকার চেষ্টা করছিল। পাড়া-মহল্লায় বড়দের উৎসাহে চলছিল ব্যাঙের বিয়ে, পাকুড় গাছের গোড়ায় পানি দেয়া, বটের গোড়ায় সালু কাপড় বাঁধা, আর ছোট ছেলেমেয়েরা বসিয়েছিল বৃষ্টি নামার গানের আসর। আম-কাঁঠাল পেকে ভুরভুর হয়ে গেছে কিন্তু কারও ভুক্তি নেই। এমনই এক দুপুরে বাবা-মা ডেকে বললেন, আগামী সাকরাইনের দিন তারা পীরের বাড়ি যাবেন আম-কাঁঠালের বৈশাখী করতে, আমি যেন তাদের সঙ্গে অবশ্যই যাই। 

হিসাব করে দেখলাম সে সময় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকবে। সাকরাইন মানে তারা যাচ্ছেন বৈশাখের শেষ দিক, পীর-দাদাকে আম-কাঁঠাল খাওয়ানোর জন্য। বিষয়টা মন্দ না। যাওয়া পথও বিচিত্র। ধুলশুড়া থেকে ট্রলারে পাদ্মায় দীর্ঘ পথ উজানে গিয়ে গোয়ালন্দ ঘাট। সেখান থেকে লেগুনাতে কিছু দূর গিয়ে ট্রেন, তারপর নৌকা। মাঝে রিকশা আর পায়ে হাঁটা পথও আছে। পুরো একদিনের যাত্রা। বয়সের কারণে হলেও, বাবা-মার সঙ্গে যাওয়া দরকার। 

ট্রলারে যখন আমরা গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছলাম তখনই বেলা পড়ে গেছে। পদ্মার জলে দিনের শেষে ধোয়া-ধুয়ির কাজ সেরে নিচ্ছেন নদী পারের মানুষ। আমার মতো যারা পীরের মুরিদ না হয়েও সফর সঙ্গী তাদের কাছে বিষয়টা লক্ষণীয়। কেউ একজন মুখ টিপে বললেন, দৌলতদিয়া ঘাটের পতিতালয়ের অপভ্রংশ গোয়ালন্দ ঘাটেও আছে। যে জন্য স্থানীয়রা ‘ঘাট’ শব্দটা ছেড়ে দিয়ে উচ্চারণ করে। তখনই নদীতে স্নান করতে আগতদের দিকে কৌতূহলীভাবে তাকালাম। আমার কাছে কিছুই ইতর বিশেষ পার্থক্য মনে হলো না। শুধু একজন মাঝবয়সী সুডৌল নারীকে দেখলাম স্নান শেষে জানু পানিতে দাঁড়িয়ে সূর্য প্রণাম করছেন। বিনুনী করা দীর্ঘ চুল আলগা না করেই তিনি গোসল সেরেছেন। ভেজা বিনুনী এপাশ-ওপাশ দুলছে একটা সাপের মতো। তার মাথায় চকচক করছে একটা ধাতব কাঁটা। আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়া সময় মুচকি হাসলেন। প্রতি-উত্তরে আমিও হাসলাম এক ঝলক। এর বাইরে আর কিছুই মনে করার মতো নয়, বরং গতানুগতিক রকমে বাণিজ্যিক দুনিয়া। বাবা-মাকে লেগুনার যাত্রী আসনে বসিয়ে আমি ড্রাইভারে পাশে আসন নিয়েছি। তাঁকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে আরেকবার দেখলাম। মৃদু হাসলাম। প্রতি-উত্তরে তিনিও হাসলেন। বিষয়টা লুকিং গ্লাসে ড্রাইভারের চোখ এড়ায়নি।

‘ভাইয়ের কি একটু-আধটু শখ আছে নি?’ গাড়ি স্টার্টের মতো ড্রাইভার বলল এক রহস্যময় হাসি বজায় রেখেই। স্টার্টের চাবির স্থান কোথায় গেছে কে জানে। আলগা দুটো তারের মাথায় মাথায় কয়েকবার ফায়ারিংয়ের পর মেশিন স্টার্ট নিল ঠিক, কিন্তু শব্দ বেশ চড়া।
‘না’ আমি বললাম। ঘাটের কথা শোনার পর তার হাসির মানে না-বোঝার কারণ ছিল না।
‘এটা কোনো ব্যাপার না।’ তিনি প্রায় অভয় আর উসকানি দেয়ার চেষ্টা করলেন, ‘শুনেন, জীবনে তো কত কিছুই করবেন। এহেনে ইমুন এক মক্ষ্মীরানী আছে, যারে এ্যাহনও কেউ নিব্যার পারে নাই। বুচ্ছেন নি?’
‘হুম’ আমি তার পরের কথা জন্য অপেক্ষা করি।
‘তার গতরের রং অত সাফ না, তয় গঠন কইলাম শংঙ্খিনী সাপের মতো, সবাই কয়। তারে দেখলে মন্দ লোকের মাথার মণি এমনেই ঝইর‌্যা পরে, বুঝলেন। তারপরও কেউ নিব্যার পারে নাই। বুঝলেন?’ কথাটা বলার সময় তিনি একবার কষে ব্রেক চাপেন, যেন আরেকটু হলে বাস্তবেই তার মণি সীমা অতিক্রম করত। তিনি পুনরায় উত্থাপন করেন, ‘ক্যান জানেননি?’
আন্তনগর রেল আসার সময় পেরিয়ে গেছে। তা ছাড়া বয়সী মানুষদের গাড়ি বদল, রেল যাত্রা কম ঝক্কির না। লেগুনাতেই পুরো পথ যেতে হচ্ছিল; তাই আমি কোনো জটিল কথা বলে তার খেয়াল ভাঙতে চাই না।

‘মাগির গতর দেইখ্যা যতই খারাক, কাছে যাওয়া জো নাই। আগেই মণি ঝইর‌্যা গেলে তো গেলই। কাছে গেলে রক্ষা নাই। মাগি গতর থিক্যা পাঁচ পিঁপড়ার মতো কী যানি ছাইর‌্যা দেয়, নাগররে কামড়াইয়্যা সারা। তারপরও জোরাবলি করলে মাথার চুল থেকে এমন এক গন্ধ ছাড়বো যে, গন্ধে এ্যাকেবারে অজ্ঞান হইয়া যায়।’ আমার তখন ঘাটে দেখা নারীর দীর্ঘ চুলের কথা মনে পড়ছিল। লেগুনার বয়সী যাত্রীরা যাতে শুনতে না পান, স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝুঁকে পরে স্বর নিচু করে তিনি বলেন, ‘এইরকম অনেকরেই কইলাম মক্ষী বাড়ি দিয়া আইছি, আবার নিয়াও আইছি। আপনে চাইলে একবার...’ একটা খালের পাড়ে নামিয়ে দিতে দিতে আরেকবার আন্তরিকতা দেখাতে চেষ্টা করলেন, ‘আপনে যদি আসেন, তাইলে আমি সন্ধ্যার সময় এখানে অপেক্ষা করুমানি।’
‘না, না’ আমি গাঁটগুলো বুঝে নিতে নিতে ছোট্ট করে বললাম।
‘আইজক্যা না আইলেও, কাইলক্যা আসেন?’ তিনি অনুরোধের মতো বলেন। চূড়ান্ত রকম প্রলোভন দেখান তখনই, ‘কেউ তারে না নিব্যার পারুক, তয় তিনি যদি চান যে কেউরে ভাসায় দিবার পারেন, বুঝছেন নি ভাই?’

কিন্তু তাকে সাড়া দেয়ার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। শুধু বললাম, ‘আপনার গাড়ির ইঞ্জিনটা একটু কাজ করান দরকার, বিগড়ে গেছে। যত জোরে আওয়াজ দেয়, তত জোরে ভাগে না।’ শেষবারের মতো যখন তাকে দেখেছিলাম লোকটা সেখানে দাঁড়িয়েই ছিল। তারপর অনেকটা পথ পেরিয়ে পীর-দাদার বাড়ি পৌঁছলাম। ততক্ষণের দাদার আসন ঘিরে ভক্তবৃন্দদের সাংগীতিক ভজন শুরু হয়ে গেছে। আমি ভক্তি নিয়ে তাদের ভিড়ে মিশে গেলাম। খানিকবাদে শুরু হলো ভক্তদের উদ্দেশ্যে পীর-দাদা আধ্যাত্মিক বিষয়ে বয়ান। তিনি জোর দিচ্ছিলেন অন্তরে বিশ্বাসের ওপর, যেভাবে একজন ভক্তের আত্মা গুরুর আত্মার সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। 

আসরে আমি যেহেতু খানিকটা আগন্তুক, তাই বেরিয়ে পড়লাম পাড়া ঘুরে দেখে পুষিয়ে নেয়ার জন্য। জ্যোৎস্না রাতের ব্যাপারটা একটু প্রশ্রয় দিচ্ছিল। বাড়ির সামনে দীর্ঘ উঠান, রীতিমতো খেলার মাঠ। ওরস-পার্বণের সময় আসর হয়, নয়তো ফাঁকাই পরে থাকে। উঠানের ওপাশে একটা পরিত্যক্ত রেল লাইন, ঘুমন্ত শীতল কিন্তু শৌর্যময়। তার ওপর বসে স্থানীয় কয়েকজন যুবক সিগারেট ফুঁকছে। কেউ একজন জানাল, কিছুদিন আগেও এই পথ দিয়ে আন্তনগর রেল নিয়মিত যাতায়াত করত। কিছুদিন ধরে কোনো কোনো রাতে একটা-দুইটা মালগাড়ি যায়। এই পথ গিয়ে মিশেছে অদূরের মূল রাস্তায়, যেখানে ফরিদপুর-রাজবাড়ী আন্তনগর রেল নিয়মিত যাতায়াত করে। ওই পথ দিয়েই আমাদের আসার কথা ছিল। আমার মতলব বুঝতে পেরে স্থানীয় এক সমবয়সী জানাল, এই রেল পথ ধরে হাঁটলে আশপাশে দেখার মতো অনেক কিছু পাবেন। পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িও আছে।

কায়দা বুঝে তাকে মঞ্জু মুহম্মদের কথা জিজ্ঞেস করলাম। ভাবলাম যেহেতু সরকারি বড় কর্মকর্তা ছিলেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতির কারণেও তার নাম কেউ জানতে পারে। তারা মুখ চিপে হাসল। ‘সেই পাগলাডা, সারাক্ষণ যে ঝড়ের কথা বলেন?’ 
আমি ঠিক জানি না এখন তিনি কি করেন, তবে কিঞ্চিৎ মিল পেয়ে আমি দ্বন্দ্ব লুকিয়ে রেখে নিশ্বাস ছাড়ার মতো শব্দ করলাম। তাদের হাসির আরেকটা কারণ হলো গোয়ালন্দ ঘাটের এক পতিতার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক। কেন ওই পাগলকে সে ভালোবাসে তা কেউ জানে না। তবে তাকে তিনি কথা দিয়েছেন, এক তুমুল ঝড়ের পর বিধ্বস্ত জনপদে তারা নতুন করে ঘর বাঁধবেন। এটা আমাকে তার প্রসঙ্গ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। তাই আর কথা বাড়ালাম না। মধ্যরাত অবধি অপেক্ষা করছিলাম ঘুমন্ত রেল লাইন জাগিয়ে তুলে গুমগুম করতে করতে একটা মালগাড়ি চলে যাওয়া দেখার জন্য।

মঞ্জু সাহেবের সঙ্গে আমার বিশেষ কোনো পরিচয় ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ছাত্র হওয়ায় একবার গিয়েছিলাম তার অফিসে, একটা প্রকল্পে কাজ করে নিজেকে চাকরির বাজারে ঝালিয়ে নেয়ার জন্য। আমার বায়োডাটা হাতে নিয়েই মঞ্জু মুহম্মদ বললেন, ‘আপনি আবহাওয়া বুঝেন?’ 
প্রথমে ব্যাপারটা হালকা মনে হলেও দ্রুত ভারী করে তুললেন, ‘বাতাসে বালি উড়িয়ে দিয়ে বলতে পারেন আজ বাতাসের বেগ কেমন? পশু-প্রাণীদের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারেন দুর্যোগের পূর্বাভাস? গাছের শরীরে কান দিয়ে বলতে পারবেন কি বোঝাতে চায়? মাটি গন্ধ শুঁকে বলতে পারেন মাটিতে কি পরিমাণ পানি আছে, কতটুকু খুঁড়লে পানি পাওয়া যাবে?’ 

এতো ‘প্রাকৃত জ্ঞান’। এই অভিধা দিয়ে কেতাবি দুনিয়া দায় সেরেছে, যন্ত্রের যুগে তা বোঝার উপায় কোথায়! তাত্ত্বিক জ্ঞান আর মুখস্থ থিওরি ছাড়া আমার ভেতর কিছুই নেই। তিনি আমাকে বাঁশের ফুল হলে কেন ফসলের ক্ষতি বৃদ্ধি পায়, বাঁশ ঘামলে কি হয়, ইঁদুরের বংশ বৃদ্ধির সঙ্গে এর সংযোগ— এসব বোঝালেন। সেটাই ছিল প্রথম ও শেষ দেখা। দ্বিতীয়বার দেখা করতে গিয়ে জানতে পারলাম তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

পরদিন সকালে রোদ নরম থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়লাম পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি দেখার জন্য। দূর থেকে চূড়া দেখা যায় এমন মিনার নিশানা করে এগিয়ে দেখলাম ওটা একটা পারিবারিক শ্মশানের চূড়া। পাশে ছোট্ট মন্দিরের ভেতর কোনো এক যোগীর মূর্তি, শরীর ক্ষতবিক্ষত, ভেঙে ফেলা মাথাটা ধরের রডের সঙ্গে ঝুলে আছে। বোঝা গেল, দেশভাগ বা তারপর এ অঞ্চলে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, দলে দলে মানুষ ‘ওপার’ গেছেন, এগুলো তারই স্মারক। যে কারণে এত পরিত্যক্ত বাড়ি।

হঠাৎ দেখলাম গতরাতে রেলের পাতের ওপর যুবকদের সঙ্গে বসে থাকা মাঝ বয়সী লোকটাকে। কোথায় থেকে নির্ঘুম চোখ আর বিধ্বস্ত চেহারায় ফিরছেন। গা-হাত-পা থেকে কি যেন ঝেড়ে ঝেড়ে ফেলছেন আর ঘৃণা ভরে দূর দূর করছেন। 
‘কোথায় থেকে ফিরলেন এই সকালে? ওভাবে কি ফেলছেন?’ তাকে জিজ্ঞেস করতেই একবার বিরক্তি ঝরালেন, ‘ধুর ধুর, মাগি শরীর ভরা উকুন-পিপড়া। শালার কথায় যাইয়্যা গু-খাইছি। শালায় কাস্টমার দিয়া খালি কমিশন খাওন। মাগীর খালি হইলো টাকা নেওয়ার ফন্দি।’ তারপর আমাদের দিকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন, ‘তা আপনে এখানে কী করেন?’ এর উত্তরে আমার আমতা আমতা কাঠিয়ে ওঠার আগেই তিনি চলে গেলেন।

ঝোপঝাড়ে ঘেরা জঙ্গলের মধ্যে একটা পাকা অট্টালিকার দেখা মিলল। যতটা পরিত্যক্ত মনে হয়েছিল ততটা না। বাড়ির চারপাশের প্রাচীরের এক কোণায় ছোট ফুটো। মানুষ যাতায়াতের রাস্তা। উঁকি দিতে খবর মিলল এক ভূমিহীন দরিদ্র পরিবার অট্টালিকা নিচতলায় বসত গড়েছে। খান না-খান কয়েকটা ইটের নিচে থাকে বলে গর্ব করতে পারেন। তবে তারা হয়তো অনধিকার বোধ থেকে অট্টালিকার লাগোয়া রান্নাঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। এমনিতে স্থানীয়দের যা বলে বিদায় করেন : বাড়ি মালিক বাড়িটা তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দিয়ে গেছেন, তিনি তাদের আত্মীয় ছিলেন, তারা শহরে থাকেন, তারা আবার আসবেন, বছর বছর তারা এসে বাড়ি দেখে যান, আমরা এটা সোনার গয়না দিয়ে কিনে রেখেছি ইত্যাদি—কিছুই বলার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তাই ভবন ঘুরে দেখায় বাধা দেয়ার কিছু ছিল না। বরং তারা আছেন বলেই ওটা ঘুরে দেখার সাহস করতে পেরে ছিলাম। শুধু বললেন, ‘ওপরের দিকটা বেশি ভালা না, একটু সাবধানে।’

কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে আমি ঠিক চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম। ছাদে তুলসী গাছসহ নানা আগাছা জন্মেছে, কোনো কোনো অংশ ধসে গেছে। ধুতরা ফুলের মতো দেখতে কিন্তু অপরাজিতার মতো ছোট, একটা বেগুনি ও সাদা ফুলের আহ্বান আমি এড়াতে পারছিলাম না। ক্ষয়ে যাওয়া ছাদের যেখানে যেখানে কাঠের মোটা বিম আছে মনে হলো তার একটার ওপর দিয়ে পার হচ্ছিলাম। বিমের ঠিক মাঝ বরাবর আসার পর প্রায় কেঁপে উঠল। তখন একটা লক্ষ্মী প্যাঁচা আমার কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেল। পাশের জমিতে মাটির কয়েক গজ ওপরে ডানা ঝাপটাচ্ছিল। তাকে বেশ আহত লাগছিল, যেন শিকারির গুলি খেয়ে পালিয়ে এসেছে। আমি কোনো মতে পা কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এসে হন্তদন্ত হয়ে নেমে ছুটে গেলাম পাখিটার দিকে। আরেকটু নিচে নামলেই এলাকার দলবদ্ধ কুকুর ওটাকে সাবাড় করে ফেলবে। কিন্তু ওটাকে আমি ধরার আগেই কিছু দূর গিয়ে একইভাবে ডানা ঝাপটাতে শুরু করল। এভাবে করতে করতে আমি প্রায় একটা বনের ভেতর ঢুকে পড়েছি। পেছনের কুকুরগুলোতে সরে গেছে ততক্ষণে। তারপর প্যাঁচাটাকে ধরেও ফেললাম। প্যাঁচার ডানার নিচে জাফরানের লাল। যেন দেবী লক্ষ্মী পায়ের কাছ থেকে এক্ষণই উড়ে এসেছে। ঠিক তখনই অনুভব করলাম আমার পেছন থেকে গড় গড় আওয়াজ আসছে। 

একটা বড়সড় মেছো বাঘ হরহর করে গাছ থেকে নামছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওটা আমাকে তাড়া করল। তারপর কত বন, ফসলের মাঠ, পতিত জমি, ঘাসের বাদাবন, জনমানবহীন লোকালয়, শুকনো নদী দৌড়ে পেরিয়ে গেছি মনে নেই। প্যাঁচাটা তখনো হাত ছাড়া হয়নি এটাই সান্ত্বনা। প্রায় ঘণ্টাখানেক দৌড়ে শুকনো নদীর পর জলের গন্ধ মেশা বাতাস আসছিল। শুকনো সুপারির পাতার বেড়া দেয়া একটা বাড়ির দরজা ঠেলে উঠানে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে প্যাঁচা আমার হাত থেকে ছুটে গেল। ওটা দ্রুতই যেন মেছোবাঘের সঙ্গে আত্মবিসর্জনের খেলায় মেতে উঠল। মনে হচ্ছিল, আমাকে বাঁচাতেই ওটা বাঘকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে যার শেষ পরিণাম নিজেকে বাঘে মুখে তুলে দেয়া। ওহ্, কি নিষ্ঠুর ব্যাপার! বেশিক্ষণ দেখা যায় না এই দৃশ্য। ধরে আসা শ্বাসে মুহ্যমান হওয়ার আগেই একজন ভারী কণ্ঠে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, ‘উঠুন, এবার উঠুন, ওরা আপনাকে আর কিছু বলবে না।’

তার কথায় বিশ্বস্ততার স্বর, প্রতিমায় রং করতে থাকা পালের মতো হাতে রঙের ছিটা। খেয়াল করলাম নতুন মাটি দিয়ে আগলানো হয়েছে মাটির ঘরের দেয়াল। এই মধ্য দেশে মাটির ঘর সচরাচর নয়। যে উঠানে আমি ওপর হয়ে পড়ে আছি তাতে চালের গুঁড়ি আর জাফরানের রং মিশিয়ে মেছো বাঘ, কুকুর, বিড়াল, পাখির পায়ের ছাপ আঁকা।
‘হ্যাঁ’ আমি আশ্বস্ত হতে হতে উচ্চারণ করলাম। তার হাত থেকে জলের গ্লাসটা নিতে নিতে আবিষ্কার করলাম, তিনি মঞ্জু মুহম্মদ। ওটা আসলে কিসের পানি ছিল জানা নেই, মুহূর্তে সতেজ হয়ে উঠলাম। ‘মঞ্জু মুহম্মদ, আপনি!’
‘হুম’ তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘মেছোটা বুঝতে পারি নাই, কিছুদিন ধরে এসেছে তো, ও ভেবে ছিল আপনি বুঝি পেঁচিকে ধরে নিতে এসেছেন।’ আমার বিহ্বল তাকিয়ে থাকা দেখে বললেন, ‘পেঁচি মানে ওই লক্ষ্মী প্যাঁচা আর কি। ও কিন্তু ঠিকই বুঝেছিল আপনি আমার কাছে এসেছেন। তাই মেছো কিছু করার আগে আরেক দিকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে।’ 

তিনি ঘরের ভেতর যেতেই শব্দ এল— যাহ্, বাইরে যা, যা এখন। একটা বেড়াল ঘরে থেকে শিশুর মতো লাফিয়ে বেরিয়ে এল। সারা গায়ে জাফরান মাখা। থাবা দুটো লাল, কপালে সিঁদুরের মতো টানা দাগ, আমার দিকে হিংসার চোখে তাকাল। একটা বক বেরিয়ে এল উট পাখির মতো দৌড়াতে দৌড়াতে; তার গলায় জাফরানে লাল কাঠি, পাখায় ছোট ছোট পাতা গোঁজা। তারপর একদল পাখি উড়ে গেল বিচিত্র রঙের। দরজা দিয়ে একটা সাপ খানিকটা বেড়িয়ে আসতেই আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। সাপ ভীতি আমার সেই পুরোনো। মঞ্জু সাহেব দেখলাম সাপের লেজ টেনে ধরেছেন : তুই যাচ্ছিস কোথায়, যা, ভেতরে যা। 

‘কেউ আসে না তো এদিকে, তাই একটু নড়াচড়া লেগেছে আর কি।’ বিনয়ে সঙ্গে তিনি বললেন। আমরা বুকটা তখনো ধকপক করছে।
ঘরের ভেতর পুরোনো ধাঁচের কাঠের খাট, আলমারি, শোকেস, তাক, টেবিল। আলোর প্রবাহও কম। কালচে ধরনের শালকাঠের পুরোনো একটা খাটের ওপর বসালেন। পাশের চিকন করে বাঁধা কয়েক আঁটি শন। শুকনো খড়ের মতো খচখচ করে উঠলে জাজিম নিচ থেকে কীসের যেন খোঁচাখুঁচি অনুভব করছিলাম। বিস্ময়-বিভ্রম কাটাতেই সময় লেগে গেল।

‘আপনি চাকরি ছাড়লেন কেন? তা, এই দূর দুর্গম এলাকায় আশ্রম গড়েছেন!’ বিষয়টার সঙ্গে যে আমার স্বার্থ জড়িত ছিল তা অস্বীকার না করেই বললাম।
‘বুঝতেই পারছেন’ ওয়্যারড্রব থেকে আরশোলার ভিড় ঠেলে গোটা কয় ইঁদুর বেড়িয়ে যাওয়ার রাস্তা করে দিতে দিতে বললেন। ‘ওদের সঙ্গে আর থাকা যাচ্ছিল না।’ আমি বুঝতে পারছিলাম না, তিনি ওই ইঁদুরের কথা বললেন, না কি তাঁর সহকর্মী-কর্তাদের কথা বলছেন। তিনি আবার শুরু করলেন— ‘ওরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলতে যন্ত্রের সংকেতক বোঝে। ওরা যখন বোঝে তখন আর কিছু করার থাকে না। অনেক সময় তো উল্টোই ঘটে। অথচ শত বছর পরে কি হবে তার নির্ভুল পূর্বাভাস আপনি আজ পেতে পারেন। জানেন, আমার দাদিমা বাতাসে একমুঠো বালি ছেড়ে দিয়ে বলতে পারতেন, কত দিন পর বৃষ্টি হবে।’
‘আপনি তাঁর কাছ থেকেই শিখেছেন?’ জাজিমের ভেতর থেকে খোঁচাতে থাকা একটা খড়কুটো টেনে বের করতে করতে আমি বললাম।

‘হুম। কিন্তু খুব সামান্যই। ওই যন্ত্র বিদ্যা মাঝে মধ্যে বিগড়ে দেয়, এখন ওই বিদ্যা ভোলার চেষ্টা করছি।’ আমার হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ওটা বোধ হয় কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক কাকের বাসা। দেখছেন না সরু ডাল, তাতে কি আবর-জাবর জড়িয়েছে। জানেন তো, নারী কাক তিন বছরে আর পুরুষ কাক পাঁচ বছরে সাবালক হয়।’
‘হুম, সে না হয় জানলাম, কিন্তু এখানে...’ আরেকটা খড়কুটো টেনে বের করতে করতে বললাম।
‘কি করব ভাই, পথে ঘাটে পাখির বাসা পড়ে থাকতে দেখি। ফেলে দেই কি করে। ঘরে জমাতে জমাতে অনেক হয়ে গেছে। পরে খাটের মাচা তুলে ফেলে ওখানে রেখে দিয়েছি। আগে অনেক নিচু ছিল এখন উঁচু হয়ে গেছে। ওই ঝোপের যে যার মতো বাসা করেছে। আমি না করার কে?’ 
হঠাৎ সাপের কথা মনে পড়ায় আমি আর কিছু টানাটানি করলাম না। পাশের লেপের মতো কিছু একটা টেনে হেলানের ব্যবস্থা করতে টের পেলাম এতে তুলার বদলে অন্য কিছু ভরা।

‘ও গুলো পালক। একটা-দুইটা করে জমতে জমতে ওরকম হয়েছে। আগে ছোট ছোট পালক ছিল, এখন বড়গুলো পালক ঢোকায় একটু খোঁচাখুঁচি লাগছে। কি করব বলুন, একটা পালক ঝড়ে গেলে পাখিগুলোর দুঃখী দুঃখী চেহারায় ঘরে এনে রাখে। আপনাদের চুল পাকা দেখে মৃত্যুর ভয় জাগার মতো আর কি। হা হা হা।’ 
তাঁর অট্ট হাসিটা ঘরের শান্ত অবস্থা খানিকটা দূর করল। এ সময় আরও অনেক পশু-পাখির শব্দ-নড়াচড়া টের পাওয়া গেল। ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে শেয়ালের ডাকও শোনা গেল। খেয়াল করলাম আলমারির ওপর কাপড় মোড়া একটা শেয়াল।

‘ওটা বেশ কয়েক দিন হলো এসেছে, শিকারির ফাঁদে পড়ে পেছনের দুই পা-ই ভেঙে গেছে বেচারার। আমি চটি বেঁধে গাছের ছাল লাগিয়ে দিয়েছি। সেরে যাবে। তবে একটু সময় লাগবে। তাই দুঃখ করলো।’ শেয়ালের গায়ের কাপড়টা টেনে দিলেন তিনি। তখন তাঁর হাতটা চেটে দিচ্ছিল ওটা। এটা দেখে পাশ থেকে একটা বেড়াল, পরে খেয়াল করলাম ওটা আসলে বাঘডাসা, সেও ঢং করে এগিয়ে এল।
‘ওটা একটা বোকা রাজ হাঁস’ টেনে নেয়া লেপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়া সাদা হাঁসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দুঃখী এবং বোকা’ 
‘তা কেন?’ তাঁর বাড়িয়ে থাকা হাতে ছনের আঁটি তুলে দিতে দিতে বললাম।
‘ওরা জুটি ছিল আর কি। একটা পুরুষ রাজহাঁসে সঙ্গে সারা দিন পুকুরেই কাটাত। একবার নারী রাজহাঁসটার ডিম পারার সময় হলো। দেখল পুকুরের এক পাড়ে একটা শেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। হাঁসটা পুকুরের উল্টো পাড়ে একটা ডিম পাড়ল। রাত পোহাতেই দেখল ডিমটা খেয়ে সেখানে শেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এবার সে অন্য পারে ডিম পাড়ল। পর দিন দেখল ওই পাড়েও ডিম খেয়ে আরেকটা শেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। 
‘পরে সে আরও দুই পাড়ে ডিম পেড়ে দেখল ওখানেও নতুন শেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এইভাবে সে পুকুরের চারপাশেই ডিম পাড়ল আর শেয়াল ডেকে আনল। তাই না।’ গল্পের সহমর্মী হতে হতে আমি প্রায় আগ্রহ নিয়ে বললাম।
‘হুম, আপনার উপস্থিত জ্ঞান ভালো, আপনি গণিতে ভালো ছিলেন?’
আমি মৃদু হাসলাম ‘তারপর...’

তারপর আর কি, এইভাবে ডাঙায় অনেক ডিম পাড়ার পর যখন কোনো বাচ্চা উঠছিল না, তখন জলের ডিম পাড়তে শুরু করল। কিন্তু সেখানেও কোনো বাচ্চা ফুটছিল না। ফলে হাঁস দুটি ভবিষ্যৎ বংশ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছিল। তখন পর্যন্ত শেয়ালগুলো নতুন ডিমের আশায় পাড়েই দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক দিন ডিম না পেয়ে তারাও অধৈর্য হয়ে উঠছিল। দাঁত আর জিভ দেখাচ্ছিল। ধীরে ধীরে হাঁস দুটি নিজেদের জীবন নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়লো।’ প্রহেলিকা ঝুলিয়ে রেখে থামেন মঞ্জু মুহম্মদ। বাকি ঘটনা বলতে তার কোথায় যেন অনীহা। হঠাৎ তিনি বললেন, চলুন যা আছে খেয়ে নেয়া যাক।
‘হুম’ আমি সম্মতি দিলাম, তিনি যেন চাপ বোধ না করেই পরেরটুকু বলেন তার অপেক্ষা জিইয়ে রেখে।

মঞ্জু মুহম্মদ খাবার আনতে বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘরটাকে দেখার সুযোগ হলো আমার। মাচার নিচে একটা অসুস্থ শজারু কাঁটাগুলো ঝুম ঝুম করছে। শোকেসে একেবারে ভেতরে বনবিড়াল আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। তার ওপরের তাকে কয়েকটি খরগোশ। তার ওপরের তাকে কয়েকটি ইঁদুর ছানা আগলে রাখছে একটা বানর। খেয়াল করলাম বানরের একপাশে পশম নেই, লেজটাও কাটা। মাথার ওপর দিয়ে ফেট্টির মতো বাঁধা কাপড় বোধ হয় কানের ক্ষত ঢেকে রেখেছে। শোকেসের ওপর একটা সরালি পাখি, তার ভাঙা ঠোঁট বাঁশের চটি দিয়ে আটকান। ঘরে এখানে-সেখানে ঝুলিয়ে রাখা ভাঙা টুকরি, চালুনি, বালতি, মগ পাখির আশ্রয়। আলোর অভাবে তাকের ওপর কি আছে বোঝা যায় না। ঘর ভর্তি পাখিদের অবাধ ওড়াউড়ি তো চলছেই, ঘরের দুই পাশের দরজাই খোলা। কিন্তু কোথাও মল ত্যাগের চিহ্ন নেই। তা কি করে সম্ভব! এ সময় রঙিন বেড়ালটা ফিরে এসেছে। আমাদের দিকে কতক্ষণ ডগ ডগ করে তাকিয়ে শরীর মারিয়ে গিয়ে উঠল তাকের ওপর। তারপর ঘরের কারের ভেতর হারিয়ে গেল। এক বিচিত্র সাফারি।

হাঁসের জীবন থেকে নতুন কিছুর আগ্রহে খেই হারানোর আগেই মঞ্জু মুহম্মদ ফিরে এলেন—‘মিনিটা ফিরে এসেছে তাহলে।’ তার দুই হাতে খাবার। কিন্তু চোখে ঝলঝল করছে পানি। তিনি হাঁসের জীবনে ফিরলেন। 
‘ততক্ষণে হাঁস দুটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের কে বাঁচবে আর কে মরবে। এর ওপর নির্ভর করছে ওদের নিয়তি। জলে অনেক ডোবা-ডুবি, অনেক মান-অভিমানের পর ঠিক হলো পুরুষ হাঁসের জীবনের বিনিময়েই রক্ষা পাবে নারী হাঁস।’
‘কীভাবে’ স্বগতোক্তির মতো এতটা আস্তে বলে ছিলাম যে তিনি খেয়ালই করেননি।

‘পরদিন থেকে পুরুষ রাজহাঁসটা খানা-পানি বন্ধ করে দিয়ে কেবলই নারী হাঁসের গলায় গলা পেঁচিয়ে থাকতে শুরু করল। তত দিনে পাড়ের শেয়ালগুলো অভুক্ত থেকে প্রায় ক্ষুব্ধ আর পরস্পরের প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। যে রাতে তারা অধৈর্য হয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ঠিক তার আগের সন্ধ্যায় পুরুষ রাজহাঁসটা মারা গেল। তখন পুকুরে বাতাস ছিল না। নারী হাঁসটা যখন গলার প্যাঁচ ছেড়ে দিলো তখন রাজহাঁস উল্টে গেল। শেয়ালগুলো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত ছেড়ে নতুন আশা জাগাল মনে, আর অপেক্ষা করতে থাকল নতুন খাবার পাচ্ছে বলে। কিন্তু মৃত হাঁসটা কোনো পাড়ের দিকে যাচ্ছিল না সহজে। রাত বেড়ে গেলে মৃত হাঁসটা কূলের দিকে ভাসিয়ে দিলো নারী হাঁস। মৃত হাঁসের গন্ধে সব শেয়াল তখন এক পাড়ে জড়ো হয়েছে। শেয়ালগুলো মৃত হাঁসের শরীর নিয়ে যখন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে, তখন আরেক পাড় দিয়ে নারী হাঁসটা এখানে চলে এসেছে।’

খেয়াল করলাম রাজহাঁসটা তখন ধীরে ধীরে আমার গা ঘেঁষতে শুরু করেছে। ‘একজন নারীর সঙ্গে আপনার প্রেমের কথা শুনলাম।’ হাঁসের পালক ছুঁয়ে বললাম আমি।
তিনি হাসলেন। ‘এখানে আমাকে কেউ আবহাওয়াবিদ বা সরকারি অফিসের কর্তা মনে করে না, জানেন।’ খাবারের থালা এগিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন। কৈফিয়ত দেয়ার মতো বললেন, এর কোনোটাই তার আগ্রহে আনা নয়। কোথাও কারেন্ট জাল আটকা পড়া পাখি, কোথাও বনে আগুন লেখে গা পুড়ে যাওয়া বানর, শিকারির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া শজারু শাবক, গুলিবিদ্ধ পাখি, গণ রোষ থেকে বাঁচিয়ে আনা বাঘডাসা, গাড়ির চাকায় কোমর ভাঙে পড়ে থাকা সাপ, ঝড়ে ঠোঁট ভাঙা সরালি সব জমা হয়েছে তাঁর আশ্রমে।

‘হুম। এমন আশ্রম গড়ে তুলতে গিয়ে সবাই তা ভুলে গেছে।’ চেপে রাখতে রাখতেও বললাম, ‘ঘাটে এক অদ্ভুত নারীর কথা শুনলাম।’
‘হুম, সবাই বলে মক্ষীরানী, ওর নাম মায়া।’ তাঁর সম্পর্কে আরও যা বললেন তা অদ্ভুত। এই নারী বাঁচার কৌশল হিসেবে মক্ষীরানী সেজেছে। গোয়ালন্দ ঘাটে ছোটখাটো যে পতীতালয় আছে, তার একটা চালান তিনি। কিন্তু সেখানে যে নারীরা কাজ করে, তারা কখনো না-কখনো নির্যাতিত হয়ে ওখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই নিজের রূপ-গুনের মহিমা ছড়িয়ে তাদের জন্য কাস্টমার নিয়ে আসেন মায়া। 

‘কাল আসার সময় আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাই না?’ আমাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে জানালেন, তার কাছে মায়া এসেছিলেন একবার। তিনি যেন নির্বিঘ্নে থাকতে পারেন সে জন্য গাছের ছাল দিয়ে এমন একটা তেল করে নিতে এসেছিলেন, যাতে তারা মাথায় হাজার হাজার উকুন-পিঁপড়া জন্মাবে, কিন্তু কামড়াবে না। কখনো কখনো উকুনগুলোর খাবার দরকার হয়ে পড়লে, রক্ত খাওয়াতে হয়। এ জন্যে কখনো তিনি ঘরে লোক নেন। কিন্তু ওইটুকুই, তার বেশি না। মানুষকে বাঁচানোর জন্য তিনি সব সময় চুলে বিনুনী করে রাখেন।

মাটির বাসনে বাঁশের কোড়ল, তেলাকুচ পাতার ভর্তার ভাত খাচ্ছিলাম। আশেপাশে প্রচণ্ড ঝোপঝাড়ের ভেতর এসব পাওয়া কঠিন কিছু না। ‘এমনিতে রান্নাবান্না করা হয় না, তবে কাক ধোঁয়া পছন্দ করে দেখে সাকরাইনের দিন রান্না করলাম। ঘরের ওপর কাক উড়ছে, শুনতে পাচ্ছেন?’
শুধু কাক নয়, চিল, শকুনেরও ডাক শোনো গেল। ‘আপনাকে তো অফিস থেকে তিনবার চিঠি দেয়া হয়েছিল।’
‘আমি দেখেছি’ খানিকটা ক্ষোভ ঝড়িয়ে বললেন, ‘ওগুলো শুধু কাজে ফেরার অনুরোধ। আমার পূর্বাভাস তারা গ্রহণ করেনি। আমি তো ফিরে যেতে চাইনি। আমি চেয়েছি আবহাওয়া অফিস থেকে আমার পূর্বাভাস প্রচার করা হবে। ব্যাস।’
‘কিন্তু আপনি এতটা দৃঢ়-মূল হলেন কী করে!’ আমি প্রায় অধৈর্য হয়ে বললাম।
‘হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। কারণ আমি যা দেখেছি তা ওরা কেউ দেখেনি।’ তার কথায় খানিকটা অবজ্ঞা আর করুণার স্বর। 
‘আমি ঝড়ের ভেতর থেকে দেখেছি সে কী শক্তিশালী, একেবারে কেন্দ্রে ভেতর দাঁড়িয়ে দেখে ছিলাম পরাক্রমশালী ওটা। ও আসবেই।’ 
হঠাৎ স্বর চড়ে যাওয়া আমি এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। 

‘সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বাস থেকে নামার পর একেবারে ঝড়ের ভেতর পড়ে গিয়েছিলাম। বাস থেকেই দেখছিলাম চারপাশে সব পাতলা কাগজ উড়ছে। সহযাত্রীরা নিষেধ করেছিল বাস থেকে নামতে, কিন্তু ততক্ষণে আমি নেমে পড়েছি ঝড় দেখব বলে। অবস্থা বেগতিক দেখে বাসও দ্রুত ভেগে গেল। কিন্তু আমি এগিয়ে গেলাম। সমস্ত কিছু যখন খড়কুটোর মতো উড়ছে, আমি একটা বট গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখলাম। অবিশ্বাস্য।’
 ‘কী দেখেছিলেন সেদিন?’ তার দিকে একটু এগিয়ে কিন্তু স্পর্শ না করেই তাকে জিজ্ঞেস করালাম।

‘দেখলাম, দূর থেকে প্রচণ্ড শক্তি বাতাস বয়ে আসছে রশি পাকানোর মতো পাক খেতে খেতে। তার টানে নদী থেকে, খাল থেকে, পুকুর থেকে উঠে আসা পানি— এত পানি কোথায় থেকে যে এসেছিল! সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তখন গাছের একটা ভাঁজের মধ্যে হেদিয়ে পড়েছি। চোখ বন্ধ করে করে দেখছিলাম। পানির টানে উঠে আসা মাছগুলো ভেজা তুলোর মতো উড়ছে, আর উড়তে থাকা পাখিগুলো পানির নিচে প্রচণ্ড গতিতে ছোটা মাছের মতো ছুটছে। এক গোছা শুকনো ছন একটা গাছের ভেতর দিয়ে ঢুকে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। একটা টিন সমস্ত গাছকে কচু কাটা করছে। চাপকলের পাইপ পেঁচিয়ে যাচ্ছিল বিদ্যুতের খামের সঙ্গে, খাম উঠে যাচ্ছিল ছুড়ে দেয়া লাঠির মতো। ঘরবাড়ি-অট্টালিকা, উপাসনালয়, মোবাইল টাওয়ার, স্লুইসগেট, ড্যাম, সেতু, বাঁধ, ট্রান্সমিটার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, কলকারখানা, বাস-ট্রাক, রঙিন গাড়ি, লঞ্চ-ইস্টিমার, যুদ্ধ-জাহাজ, সাব-মেরিন, বিমান, রকেট, ট্যাংক, অ্যাটম, এসি, রেফ্রিজারেটর, টিভি, অ্যানটেনা, স্কুল-কলেজের হাজার হাজার কিতাব সব উড়ে আসছিল এক-একটা খেলনার মতো। মানুষগুলো এসেছিল কেঁচোর দলার মতো আর পোকা-মাকড়ের মতো উড়ে গেল পশু-প্রাণীগুলো।’

‘আমি তখন ঝড়ের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করছি, দেখলাম স্বচ্ছ পানির মধ্যে ভেসে যাচ্ছে আমার শৈশবের সব ছবি, বন্ধু-বান্ধব, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এমন নারীর মুখ পর্যন্ত দেখলাম সেখানে। তারপর সব ক্রমেই স্তিমিত হয়ে আসছিল। শক্তিও কমে আসছিল ঝড়ের। আমি দেখলাম কোথাও কিছু নেই। সব ধুয়ে-মুছে সাফ। গোটা কয় প্রাচীন বৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে এক-একটা প্রান্তে। সব শেষে সাগর পাড়ে পাথরে আঘাত খেয়ে ঝলকে ওঠা পানির মতো একটা গাঢ় লাল ভেসে উঠে ছিল দিগন্তের নিম্ন সীমা দিয়ে। এটা তো অনিবার্য ঝড়ের সংকেত। আমি সেদিনই চেয়েছিলাম রেডিওতে ঘোষণা দেয়ার জন্য। কিন্তু অফিস অনুমোদন করল না।’ 

আমি দেখলাম প্রচণ্ডভাবে কাঁপছেন মঞ্জু মুহম্মদ। তাকে চেপে ধরতেই মনে হলো এই ঘর-বাড়ি সবই কাঁপছে। তাকের ওপর মাচার নিচে শজারু, শোকেসের ওপর থাকা সরালি, ভেতরের বনবিড়াল, খরগোশ, ইঁদুর ছানা, বানর; আলমারির ওপরের শেয়াল, উড়তে থাকা পাখি; ঝুলিয়ে রাখা ভাঙা টুকরি, চালুনি, বালতি। এমনকি বিড়ালটা কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে নেমে এসেছে।
তিনি আমাকে ধরে হো হো করে কেঁদে উঠলেন, ‘জানেন, একমাত্র মায়াই আমার সবটুকু কথা বিশ্বাস করেছে যে, একটা ঝড় হবে, যার পূর্বাভাস আমি সেদিন পেয়েছিলাম এই ঝড় দক্ষিণের জনপদকে নতুন করে সাজাবে। ওর একটা অনুরোধ আমি ওকে নরক থেকে মুক্তি দেই। ওকে কথা দিয়েছিলাম, ঝড়ের পর ওকে নিয়ে নতুন বসতি গোড়বো। ও আজ আমাদের সবাইকে রাঙিয়েছে।’

তার অঝোর কান্নার ভেতরই টের পাচ্ছিলাম শুধু তিনি নন, ঘরের সব প্রাণী বিচিত্র স্বর করছে। ঘর প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে, কিন্তু ঘর ভর্তি জ্বলছে জোনাকি। সেখানে ভেসে আসা অনেক শব্দই আমার অপরিচিত, ঘরের হচ্ছে তাও জানি না। এমনকি আমিও কাঁদছিলাম। এ সময় ওয়্যারড্রবের ওপর রাখা পাখির বাসায় থেকে একটি ডিম গড়িয়ে মাটিতে পরে ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু থেমে গেল। মঞ্জু মুহম্মদ প্রায় সচকিত হয়ে উঠলেন, ‘আবার কি হলো!’ 

এক লাফে তিনি দুয়ারের দীর্ঘ গাছের গায়ে কান পাতলেন। তারপর ওপর দিকে তাকালেন। দ্রুত তাকের ওপর থেকে একটা কালচে কাঠের বাক্স নিয়ে বাইরে গেলেন।বাতাসের ভেতর একে একে তিন মুঠো বালি ঝরঝর করে ছেড়ে দিলেন। তারপর বাকি বালি ওপর দিকে ছুড়ে দিয়ে গেটের কাছে গিয়ে ডাক দিলেন— আয়, আয়। তার কণ্ঠ থেকে তখনো যেন কান্না ঝরছে। তিনি দ্রুত ফিরে এসে বললেন, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে। ঝড় শুরু হতে যাচ্ছে।’ 
বাইরে চোখ দিতেই দেখলাম, চারপাশ প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। বাড়ির চারপাশে আড়ে ঝোলান সুপারির ডালের বেড়া বাতাসে প্রায় উঁচু হয়ে গেছে। ‘আর এক মুহূর্তও না, আপনাকে এখনই চলে যেতে হবে। নইলে ক্ষতি হয়ে যাবে।’ তিনি উৎকণ্ঠার সঙ্গে বললেন। 

‘কিন্তু আমি তো এখানে কোনো রাস্তা ধরে আসিনি। তাড়া খেয়ে এসেছি। এ আমি কোথায় আছি তাও জানি না। ফিরে যাওয়ার রাস্তা চিনবো না।’ উত্তেজনার সঙ্গে বললাম।
‘সমস্যা নেই, আপনাকে তো মেছো তাড়িয়ে এনেছে। এক কাজ করুন আমি ওকে দিচ্ছি, এবার আপনি ওর পেছন পেছন দৌড়াবেন। কিছু দূর যাওয়া পর ও আর যাবে না। খালি চোখ রাখবেন, কেউ না-কেউ আপনাকে পথ দেখাবে।’ সঙ্গে সঙ্গে মেছোবাঘটা এসে হাজির। 
‘কিন্তু আপনি যাবেন না!’ 
‘আমার কথা ভাববেন না, এদের একটা সংস্থান না করে আমি যেতে পারি না। আর মায়াকে তো কথা দিয়েই রেখেছি, আপনি যান, আমি ওকে নিয়ে আসছি। শুধু মনে রাখবেন, এখন ভর দুপুর, যে করেই হোক সূর্য ডোবার আগেই আপনাকে লোকালয়ে পৌঁছতে হবে।’ মেছোকে বলা তার শেষ শব্দ আমার কানে বাজতে লাগল ‘যাআআআআ...’ 

তারপর আমি আবার দৌড় শুরু করলাম। শুকনো নদী, জনমানবহীন লোকালয়, ঘাসের বাদাবনের মাথায় এসে মেছোবাঘটা ছনের ভেতর ঢুকে পড়ল। আমি তখনো দৌড়ে যাচ্ছি আর চারপাশে চোখ রাখছি। পতিত জমি পেরোতে গিয়ে দেখলাম একটা ইঁদুর আমার পায়ের আগে আগে দৌড়াচ্ছে। ফসলের মাঠের শেষে সেটাও কোনো এক গর্তে ঢুকে গেল। বনের পুরো পথটা নানা পাখি পথ দেখাল। দৌড়াতে দৌড়াতে গলা শুকিয়ে কাঠ, চোখে ঘোর লেগে আছে। আমি যা দেখেছি তার সবকিছু ভুলে যাচ্ছিলাম, ভেতরে-ভেতরে প্রচণ্ড ভয় কাজ করছিল। পুরোনো বাড়ি, শ্মশান, লোহার ব্রিজ পেরিয়ে রেল রাস্তা দিয়ে পীর-দাদার বাড়ির সামনের মাঠের দেখা পেলাম। আমি একটুও গতি না কমিয়ে তার দরগার দিকে দৌড়ালাম। পীর-দাদা তখন ধ্যান করছেন আর তাকে ঘিরে ভক্তবৃন্দ। যার মধ্যে আমার বাবা-মাও আছেন। আমি যেন গতির রোধ করতে না পেরেই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কেউ কেউ খুব বিরক্ত হলেন। অপ্রতিরোধ্য ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ার আগে পীর-দাদা শুধু বললেন, ওকে থামাস না, অনেক দূর থেকে এসেছে, ওকে শান্ত হতে দে।

অনেকক্ষণ পরে যখন আমি স্থির হতে পেরেছিলাম, দেখলাম আমাকে মাথা ধোয়ান হয়েছে, চোখ-মুখে জলের ছিটা। এমনকি তখনো সূর্য ডোবেনি। আমার হঠাৎ মঞ্জু মুহম্মদের কথা মনে পড়ল, তারপর মক্ষীরানী মায়ার কথা। 

‘ঝড় হবে!’— হঠাৎ বলে উঠলাম। কেউ কেউ প্রায় হেসে উঠলেন। বিষয়টা খটকা লাগল বেশ। সন্ধ্যার আগে একজনের সাইকেল নিয়ে সেই লেগুনা ড্রাইভারে খোঁজে বেরিয়ে পরলাম। লোকটা সত্যি সেদিনের খালের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার কাছে যেতেই তিনি হেসে বললেন, ‘আমি জানতাম আপনে আইবেন ভাই। তয় একটু দেরি হইয়া গেছে। আইজক্যা দুপুরে কোথ্থেকে একটা ঘূর্ণি বাতাস আইলো, পদ্মার পানি পাক পারতে পারতে ঘাটের সব মক্ষীবাড়ি ভাসাই নিয়া গেল। ঝরের পরে সব মক্ষীগোরে পাওয়া গেল, কিন্তু রানীরে পাওয়া গেল না। তয় সকালে এইডা আপনারে দিতে দিছিল।’ 

রাজহাঁসের ডিমের মতো দেখতে বাক্স। তার ভেতর কিছু পাখির পালক। একটা মাথার চুলের কাঁটা, তার ওপর দুটো উকুন হাঁটছে।

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়