ঢাকা     বুধবার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৯ ১৪২৯

সাহিত্যের মূল্যায়নে পুরস্কার, প্রশস্তি ও প্রচারণার অনাচার প্রসঙ্গে

মঞ্জু সরকার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৫৭, ১৭ জানুয়ারি ২০২৩   আপডেট: ২০:৫৯, ১৭ জানুয়ারি ২০২৩
সাহিত্যের মূল্যায়নে পুরস্কার, প্রশস্তি ও প্রচারণার অনাচার প্রসঙ্গে

উর্বর বঙ্গভূমিতে কবি-লেখকের জন্ম এবং বর্তমান উচ্চ প্রবৃদ্ধির মূলে একুশের বইমেলা ও তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষ করে ফেসবুকের বিশ্বজনীন অবদান অপরিসীম। এ লেখাটায় লেখকের মূল্যায়নে সাহিত্য পুরস্কার, স্বীকৃতি-প্রশস্তি ও প্রচারণা বিষয়ে নিজের চিন্তাভাবনা এবং কিছু পুরস্কার পাওয়া ও না-পাওয়া বিষয়ে সত্য গল্প শোনাব।

আমরা জানি, মুদ্রণশিল্প আসার আগেও তালপত্রেও পুঁথি রচিত হয়েছে। তারও আগে মানবসমাজে ভাষার বিবর্তন ও বিকাশের সঙ্গে কবি-গল্পকারগণ তাদের মৌখিক বচনে কাব্য-গাথা সৃস্টি করে লোকসমাজের স্বীকৃতি ও প্রশংসা পেয়েছে। তার মানে ব্যক্তি কর্তৃক একান্তে যখন ও যেভাবেই রচিত হোক, গোড়া থেকে সাহিত্যও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কাজ হিসেবে স্বীকৃত, যে কাজটা করার যোগ্যতা ছিল বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন কিছু মানুষের। তাদের স্বীকৃতি দিতে তাদের রচনার উদ্ধৃতি ও প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল লোকসমাজ। তেমনি সমাজ-অধিপতিরাও এইসব প্রতিভাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা ও পুরস্কার দিয়েছে। 

ঊনবিংশ শতাব্দিতে দেশে ছাপাখানা আসার পর লিখিত সাহিত্যের বিকাশ ও প্রচার ঘটাতে নানারকম সাহিত্য ও সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। লেখকের রচিত সৃজনসম্পদ গ্রন্থাকারে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রকাশক নামে পেশাজীবী সম্প্রদায়ও গড়ে ওঠে। এরপর সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতি, প্রশস্তি ও পুরস্কারও অনেকটা মুদ্রণশিল্পের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। পত্রপত্রিকার সঙ্গে আবির্ভাব ঘটেছে সম্পাদক ও সমালোচক নামে এক শ্রেণীর সাহিত্যবোদ্ধা পাঠকের। তাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়নে প্রভাবিত হন সাধারণ পাঠকও। নবীন লেখকের জন্য কোনো সাহিত্যপত্রিকায় সম্পাদক কর্তৃক লেখা ছাপা হওয়াটাও ছিল পুরস্কার প্রাপ্তির মতো প্রেরণাদায়ক। তদুপরি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা কি গ্রন্থের উপর সমালোচনাও পাঠকশ্রেণীর মতামতের প্রতিফলন হিসেবে লেখকের জন্য স্বীকৃতির আনন্দ বয়ে আনে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও সাহিত্যপ্রতিভা বিকাশে সহায়তাদানের লক্ষ্যে তাদের রচনা প্রকাশের জন্য স্বল্প পুঁজির অগণিত সাময়িক পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। বড় পুঁজির সংবাদপত্রগুলোও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সপ্তাহে অন্তত একদিন বিশেষ পাতা বরাদ্দ করেছে সাহিত্যের জন্য। কেউবা আলাদাভাবে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক কিংবা বার্ষিক বিশেষ ম্যাগাজিনও প্রকাশ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবে যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেট ও লক্ষকোটি ওয়েব পেজ কাগজে মুদ্রিত পত্রপত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলে সাহিত্য পত্রিকার গুরুত্ব কমে আসতে থাকে। সাহিত্যজগতে প্রভাব বিস্তারী বহুল প্রচারিত এবং নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা এখন আর  নেই বললেই চলে। এ প্রজন্মের লেখকরা সম্পাদক ছাড়াই ইন্টারনেট মাধ্যমে ফেসবুক, নানারকম ওয়েব পোর্টাল ও নিজের ব্লগে লেখা ছাপতে পারে।

অন্যদিকে মুদ্রণশিল্পে কম্পিউটার-ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ এবং ঐতিহ্যবাহী একুশে বইমেলার প্রভাবে স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে সহজেই আবির্ভাব ঘটছে নতুন নতুন প্রকাশকের। নবীন কি প্রবীণ লেখকের বই প্রকাশে তারা পাণ্ডুলিপির মান যোগ্য সম্পাদক কর্তৃক যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন বোধ করেন না। বইটির স্বল্পসংখ্যক কপি প্রকাশে লেখকের আর্থিক সহযোগিতা, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দেন বেশি। এভাবে প্রতিবছর একুশের বইমেলায় প্রতিষ্ঠিত মূলধারার লেখকদের পাশাপাশি সৌখিন ও প্রতিষ্ঠাকামী  লেখকের সহস্রাধিক নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, লেখক তথা গ্রন্থাকার হওয়া সহজ হয়েছে বলে কি লেখকের স্বীকৃতি, পুরস্কার-প্রশস্তির তৃষ্ণা হ্রাস পেয়েছে? মোটেই না। সামাজিক যে কোনো কাজেই অপরের স্বীকৃতি-প্রশংসা পাওয়টা তো সামাজিক মানুষের চিরন্তন স্বাভাবিক তৃষ্ণা। লেখক-শিল্পীদের এ তৃষ্ণা বোধহয় বেশি মাত্রায় থাকে। কেননা পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় ভোগ্য পণ্যের উৎপাদন ও চাহিদা যেমন থাকে, সামাজে লেখক-প্রকাশকের উৎপাদিত গ্রন্থপণ্যটির চাহিদা তেমন নেই বললেই চলে। নগদ মুনাফাও কম। বেস্টসেলার হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকশ্রেণীর স্বীকৃতি পাওয়ার ভাগ্য সব লেখকের হয় না। এ কারণে একুশে বইমেলায় গিয়ে নিজের বইয়ের পাঠক-ক্রেতা শিকারে সময় দেন বহু নবীন লেখক। ফেসবুকেও নতুন বইয়ের ছবিসহ নবীন লেখকদের আত্মপ্রচারণার যেন ঢল নামে। পাঠক-স্বীকৃতি ও পাঠকভাগ্য কম বলেও সাহিত্য পুরস্কার ও প্রচারণা পেলে সেটাই হয়ে ওঠে লেখকজীবনের বড় সান্ত্বনা। শোকেসে সাজিয়ে রাখার মতো শ্রেষ্ঠ অর্জন।

দেশে প্রকাশিত বই ও লেখকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি  বেড়েছে বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের সাহিত্য পুরস্কারও। এ ছাড়াও আছে সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাহিত্যপুরস্কার দাতাগণ কীভাবে পুরস্কারযোগ্য সেরা  লেখক বা তার গ্রন্থটিকে মনোনীত করেন? তাদের বিচার পদ্ধতি কতোটা পক্ষপাতশূন্য ও নির্ভরযোগ্য? পুরস্কারযোগ্যটিকে বেছে নেওয়ার জন্য অবশ্য পুরস্কারদাতারা বোদ্ধা ও বিখ্যাত লেখক-বুদ্ধিজীবী-অধ্যাপক সমন্বয়ে একটি বিচারকমন্ডলী বা নির্বাচক কি মনোনয়নদাতা পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু এসব বিচারক-নির্বাচক পুরস্কারদাতার স্বার্থ ও পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধে উঠে কতোটা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মতামত দিতে পারেন? কতোটা সময় ও মনোযোগ দিয়ে পুরস্কারের প্রতিদ্বন্দ্বী বইগুলো পাঠ করেন তারা, তা নিয়েও সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক পুরস্কার বঞ্চিতদের মনে। বিশেষ করে তাদের, নিজেদের যারা পুরস্কারের যোগ্য মনে করেন কিংবা পুরস্কারের লোভ বেশি মাত্রায় থাকে যাদের মনে। আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই নানারকম সাহিত্য পুরস্কারের খবর, পুরস্কৃতদের উদ্দেশ্যে অভিনন্দন-বার্তা কিংবা বিরূপ সমালোচনাও চোখে পড়ে। 

কিছুদিন আগে ফেসবুকে এক বিখ্যাত ও বিশিষ্ট কবি দেশে প্রচলিত সরকারি এবং বেসরকারি  একটি বাদে, সবগুলো সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় আত্মসন্তুষ্টি প্রকাশ করে একটি পোস্ট দেন। শুনেছি, স্বাধীনতা পদক পুরস্কারটি পাওয়ার জন্যও তিনি ফেসবুকে নিজেই প্রচারণা চালিয়েছেন এবং পেয়েছেনও। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যার সঙ্গে কবির ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি সাহিত্যঅঙ্গনের অনেকেই জানেন। কাজেই যে প্রতিষ্ঠানের সাহিত্য পুরস্কার তিনি পাননি, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের অভাব নিয়ে সন্দেহ জাগাটা অস্বাভাবিক নয়। সম্প্রতি সাহিত্যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পুরস্কার এমন এক ব্যক্তিকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, যার নাম সাহিত্য জগতের কেউই জানেন না! কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানদের অনুমোদনেই তাকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল নিঃসন্দেহে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেই পুরস্কার সরকারিভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। 

আরেকটি সাম্প্রতিক উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। দেশের বড় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার উপন্যাস নিয়ে কথাসাহিত্যের অভিভাবকতুল্য এক লেখকের প্রশস্তিমূলক মন্তব্য নিয়ে সংবাদ-গণমাধ্যম ও  সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হইচই হয়েছিল। দেশের সবচেয়ে বহুল প্রচারিত খবরের কাগজ উপন্যাসটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসামূলক  লেখা ছেপেছে। এসব স্বীকৃতি-প্রশস্তি ছাড়াও ইতোমধ্যে দুটি বেসরকারি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছে উপন্যাসটি। 

নগদ লেনদেন প্রভাবিত ও মুনাফালোভী এ সমাজে প্রশস্তিসূচক মন্তব্যকারী ও পুরস্কারদাতের সঙ্গে প্রাপকদের পক্ষপাতমূলক কিংবা প্রভাব-বিস্তারী সম্পর্ক থাকার সন্দেহ জাগাটা মোটেও অমূলক নয়।

এবার লেখক হিসেবে নিজের কিছু বেসরকারি পুরস্কার প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতার সত্য গল্প শোনাই। আত্মপ্রচারণা হলেও, লেখকজীবনের স্মৃতিচারণামূলক এ নিবন্ধে লেখকজীবনের শুরুতে ও মধ্যভাগে প্রাপ্ত এসব পুরস্কারের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্মরণ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না আশাকরি।

কৈশোরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে বাংলা সাহিত্যের দেবতাসম মহান স্রষ্টা জেনে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বজয়ী হবার খ্যাতির তৃষ্ণা যেমন জাগত, তেমনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দিবাস্বপ্নও দেখেছি। স্বপ্ন সীমা না-মানার কাণ্ডজ্ঞানহীন বয়স ছিল সেটা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুঢ় বাস্তবের ঘষা খেতে খেতে স্বপ্নের দৌড় ও দৌরাত্ম সবারই হ্রাস পায়, আমারও পেয়েছে। কিন্তু আজ বৃদ্ধ বয়সে এসেও টের পাই, লেখার প্রশংসা ও স্বীকৃতি পাওয়ার তৃষ্ণাটা পুরোপুরি মরে যায়নি এখনো। তা বলে প্রথম বইয়ে পুরস্কার পাবো, ভুলেও ভাবিনি।

লেখক হবার লক্ষ্যে ঢাকায় আসার দশ বছর পর ১৯৮২-তে প্রকাশিত হয় প্রথম বই। সেসময়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে কেরাণী পদমর্যাদায় চাকরি করি। ততদিনে দেশের বিখ্যত সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের অনেককেই চিনে গেছি। আমাকে গ্রন্থকেন্দ্রের একজন সামান্য কর্মী হিসেবে চিনলেও লেখক হিসেবে চেনেন না অনেকেই। চেনানোর জন্য অগ্রজ ও প্রিয় লেখকদের প্রথম বই উপহার দিয়েছিলাম। মুখ ফুটে নিজের বইটির পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখিত বা মৌখিকভাবে জানানোর অনুরোধ করতে পারিনি কাউকেই। তবে বই দেয়ার পর যখনই এবং যতবার তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, মনে আশা জেগেছে, আমার বইটি সম্পর্কে ভাল-মন্দ কিছু বলবেন হয়তো। নবীন প্রতিষ্ঠাকামী লেখকের মনের অকুল তৃষ্ণা টের পেয়েই হয়তো-বা, কেউ কেউ দেখা হলে পাঠপ্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, এমনকি লিখিতভাবেও প্রশংসাও করেছেন কয়েকজন।  বিশিষ্টজনদের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ও ভালোলাগার খবর সরাসরি, এমনকি লোকমুখে জানতে পারলেও খুব ভালো লাগত। ছোটখাটো পুরস্কার পাওয়ার মতো আনন্দ জাগত। সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি পেয়েছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কাছ থেকে। বই বেরুনোর আগেই পরিচয় হয়েছিল, আড্ডা দিতে প্রায় যেতাম তাঁর বাসায়। এক সঙ্গে লেখক শিবির করার সময় বেশ ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। যথারীতি ইলিয়াস ভাইকেও প্রথম বইটি দিয়েছিলাম। তার পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানার কৌতূহল নিয়ে আড্ডায় যাই। কায়েস আহমেদ, বিপ্লব দাশ কিংবা পরিচিত-অপরিচিতদের মধ্যে  অনেকেই থাকেন আড্ডায়। কতো কী বিষয়ে কথা-বার্তা, পরচর্চা ও হাসি-ঠাট্টা হয়। মুখ ফুটে বলতে পারি না, আমার বই নিয়েও সিরিয়াসলি কিছু বলুন তো। ইলিয়াস ভাইও কিছু বলেন না। একদিনের আড্ডায় কে একজন আমার বই প্রসঙ্গে ‘প্রিয় দেশবাসী’ গল্পটির প্রশংসা করলে ইলিয়াস ভাই বললেন, ‘ওইটা ছাড়াও বইয়ে ওর ভালো গল্প আরো আছে।’ বুঝলাম, পড়েছেন এবং ভালোও লেগেছে। স্পস্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন আরো একদিন। 

ইলিয়াস ভাই গুলিস্তানে গ্রন্থকেন্দ্রের অফিসে এলে নিম্নতর পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে আমার টেবিলেই বসতেন। সেদিন আমার টেবিলে বসে চা-পাইপ টানার বদলে, চা খাওয়ার কথা বলে নিচের ঢাকা রেস্তোরাঁয় চা খেতে নিয়ে গেলেন। পেটে একটা কথা চেপে রাখতে পারছেন না এবং কথাটা তার পেটে বেশ গুঁতো মারছে বলে নিজের রসিকতায় অট্টহাস্য করে কাউকে বলে না দেয়ার শর্তে শোনালেন খবরটা।  সেই বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের উদ্যোগে সবগুলো সরকারি ব্যাংকের অর্থায়নে ‘ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’ নামে একটি পুরস্কার চালুর খবর পত্রিকায় দেখেছিলাম। পুরস্কারটি দেওয়া হবে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে। পুরস্কারের মান দশ হাজার টাকা। আমার বই যে সেখানে প্রকাশক আনওয়ার ভাই জমা দিয়েছিলেন এবং ইলিয়াস ভাই কথাসাহিত্য শাখায় একজন বিচারক হয়েছিলেন, জানতাম না। কথাসাহিত্য শখায় অপর দুই বিচারক ছিলেন সরদার জয়েন উদ্দীন ও সৈয়দ শামসুল হক। সরদার জয়েনউদ্দীন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বছর চারেক আমার সরাসরি বস ছিলেন, হবু-লেখক হিসেবেও আমাকে চিনতেন না। বিবেচনার তালিকায় আমার গ্রন্থ দেখে নাকি তিনি বলেছিলেন, এই ছেলে তো আমার পিএ ছিল! সৈয়দ শামসুল হক উত্তরবঙ্গের মানুষ হলেও আমার সঙ্গে তখনো ব্যক্তিগত পরিচয় ও জানাশোনা হয়নি। বইও দিইনি। ইলিয়াস ভাই আমাকে ছোট চাকুরে নয়, সম্ভাবনাময় কমিটেড লেখক হিসেবে উভয়কে আমার বই পড়তে  উদ্ধুদ্ধ করেছেন এবং অতপর তিনজনই একমত হয়ে পুরস্কারটি আমাকে দেয়ার সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দিয়েছেন বাংলা একাডেমিকে।

গুলিস্তানের রেস্টুরেন্টে ইলিয়াস ভাইয়ের কাছে গোপনে শোনা দশ হাজার টাকার ভারী ও আনন্দময় খবরটি বহন করে কীভাবে বাসায় গেলাম, স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে শেয়ার করার পরও খুশিতে ঘুম কেমন হলো- সেসব অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে তুচ্ছ করে এখানে বলবার মূল কথাটি হলো, পুরস্কার শুধু লেখার গুণ দিয়ে হয় না, পেতে খুঁটির জোর কিংবা ক্ষমতার পক্ষপাতও লাগে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যে পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন আমার প্রথম পুরস্কারটির ক্ষেত্রে। খুব খুশি হয়েছিলাম বলেই বোধহয় আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারটি বিতরণ করা হয়নি। অর্থ যোগানদাতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয় হয়নি বলে পরের বছর থেকেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরস্কারটি। তবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত চিঠিতে অভিনন্দনসূচক খবরটা এবং দশ হাজার টাকার চেক পেয়ে বেশ উপকৃত হয়েছিলাম। কোনো স্মারক চিহ্ন নেই, তবু আমার বইয়ে লেখক পরিচিতিতে প্রাপ্ত পুরস্কারের তালিকায় এই প্রথম পুরস্কারটার কথাও উল্লেখ করি সগর্বে। 

এরপার ‘আবাসভূমি’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছিলাম ফিলিপিস পুরস্কার। বহুজাতিক কোম্পানি ফিলিপস প্রবর্তিত পঞ্চাশ হাজার টাকা মূল্যের বড় সাহিত্য পুরস্কারটি গুণেমানে বেশ বড় ছিল ওই সময়ে। শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক ও শওকত আলী পেয়েছেন দু’বার। আখতারুজ্জাম ইলিয়াসকে তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসের জন্য ফিলিপস  পুরস্কার অফার করা হয়েছিল শুনেছি। বহুজাতিক কোম্পানির পুরস্কার বিধায় তিনি না করে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম বইয়ের জন্য এবং তারপরও দুটি পুরস্কার পাওয়ায়  আমার বুঝি পুরস্কারের নেশা ধরেছিল নগদপ্রাপ্তির কারণেও। ফিলিপস পাওয়ার আশা ও আত্মবিশ্বাস জোরালো হয়েছিল, কারণ পুরস্কারের মান ছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা। তাছাড়া আমার আগেই অনুজপ্রতিম লেখক নাসরীন জাহান ও মইনুল আহসান সাবের ফিলিপস পেয়েছিলেন। কাজেই ‘আবাসভূমি’ বই বেরুনোর পর প্রকাশকের ভরসায় না-থেকে গ্রন্থকেন্দ্রের সহকর্মী মালেককে দিয়ে পুরস্কার-কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলাম বইটি। তার আগে ‘প্রতিমা উপখ্যান’ উপন্যাসটির জন্য ফরিদপুরের আলাওল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারটি তখনো হাতে পাইনি। বগুড়া লেখক চক্র  হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আমাকেও পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। অর্থ মূল্যছাড়া সেই পুরস্কার গ্রহণের জন্য নিজে সেবছর বগুড়া যেতে পারিনি বলে পুরস্কারের ট্রফি আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছিল তারা। 

আর আলাওল পুরস্কার ঘোষণার পর, কয়েক বছরের পুরস্কার একসঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দিয়েছিল ফরিদপুরে। সেই পুরস্কার গ্রহণের জন্য ঢাকা থেকে দলবেঁধে গিয়েছিলাম অনেকের সঙ্গে। নাসরীন জাহান, অসীম সাহা, শান্তনু কায়সার, মামুনুর রশীদ, কবি উমর আলী, ওয়াহিদুল হক ভাইসহ আরো অনেকে ছিলেন। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন প্রধান অতিথি। বেশ মজা হয়েছিল। ফিলিপস পুরস্কার পাওয়ার আশা ও অপেক্ষার পর, অবশেষে একদিন অফিসে এসে সবগুলো সংবাদপত্রে ফিলিপসের পুরস্কার ঘোষণার খবর দেখে কী যে খুশি হয়েছিলাম! মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম প্রকাশক মফিদুল ভাইয়ের কাছে। ওই সময়ে গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন কে এম হাবীবুল্লাহ। ক্যাডার সার্ভিসের লোক হয়েও খুব যোগ্য পরিচালক ছিলেন। তিনি উদ্যোগী হয়ে পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে গ্রন্থকেন্দ্রে আমাকে সংবর্ধনাও দিয়েছিলেন। আর পত্রপত্রিকায় খবর দেখে যারা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন কবীর চৌধুরীও। ফোনে তার পাঠপ্রতিক্রিয়া এবং আরো বড় ক্যানভাসে বড় উপন্যাস লেখার উপদেশ শুনে অনুমান করেছিলাম, বিচারকদের মধ্যে তিনিও ছিলেন সম্ভবত। তবে কে বা কারা বিচারক ছিলেন, সঠিক জানতে পারিনি। কারণ অন্যান্য বারের মতো বড় হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে পুরস্কারটি বিতরণ করা হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অফিসে ডেকে নিয়ে একদিন ঘরোয়াভাবে পুরস্কারটি আমার হাতে তুলে দিয়েছিল ফিলিপস কর্তৃপক্ষ। এর পরে  বন্ধ হয়ে যায় ফিলিপস পুরস্কার।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার ঘোষণায় নিজের নাম শোনার জন্য কয়েক বছর ধরে ফেব্রুয়ারি মাসে আশা-হতাশার দোলাচালে ভোগার পর, অবশেষে ১৯৯৮ সালে পেয়েছিলাম পুরস্কারটি। বাংলা একাডেমির বইমেলার অনুষ্ঠানে পুরস্কার ঘোষণায় আমার নাম শুনে ছোটভাই সঞ্জু ছুটে গিয়েছিলি আমার শহরতলির বাড়িতে। পরে টিভির খবরে নিজ কানে শুনে বিশ্বাস হয়েছিল। বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য যে নানারকম চেষ্টা-তদ্বির ও ক্ষমতার পক্ষপাত প্রয়োজন হয়, সেটা বুঝেছিলাম নিজে পুরস্কার পাওয়ার পর। বাংলা একাডেমি আমাকেও পুরস্কারের জন্য মনোনয়নদাতা নির্বাচিত করেছিল কয়েক বছরের জন্য। পরিচিত ও স্বল্প পরিচিত অনেকেরই অনুরোধ পেয়েছি তার বা তার পছন্দের কোনো কবি-লেখকের নাম প্রস্তাব করার জন্য। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকেও কেউ কেউ একাডেমি কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন বলে  জেনেছি বিশ্বস্তসূত্রে। 

পুরস্কার পাওয়ার জন্য পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের  উদ্যোগী পক্ষপাত ও ভূমিকা যে একটা কাজের কাজ, সেটা বুঝেছিলাম ছোটদের রচিত বইয়ের জন্য দুবার অগ্রণী ব্যাংক শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েও। শিশু একাডেমিতে তখন কর্মরত ছিলেন অগ্রজপ্রতিম লেখক বিপ্রদাশ বড়ুয়া। তিনি ‘মাসিক শিশু’ পত্রিকার জন্য বন্ধুপ্রতিম লেখকের কাছে ছোটদের উপযোগী লেখা লিখিয়ে নিতেন। আমাকে দিয়েও  লিখিয়ে নিয়েছিলেন ‘ছোট্ট এক বীরপুরুষ’ উপন্যাসটি। বই আকারে প্রকাশের পর পুরস্কার-কমিটিতে জমা দিয়েছিলেন এবং সে বছরের সেরা শিশু-উপন্যাস হিসেবে পুরস্কার জিতেছিল বইটি। একইভাবে আরো একটি ছোটদের উপন্যাস ‘নান্টুর মেলা দেখা’ বইটিও শিশু একাডেমির অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিল। এই পুরস্কারের অর্থমান ছিল তখন পাঁচ হাজার টাকা মাত্র। এখন কতো হয়েছে জানি না।

১৯৯৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের পর,  গত দুই যুগ ধরে আমি আর কোনো পুরস্কার পাইনি। ইতোমধ্যে লেখক প্রকাশকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি চালু হয়েছে নতুন নতুন বেসরকারি সাহিত্য পুরস্কার। কৃতিমান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে চালু হওয়া অনেক সাহিত্য পুরস্কারের প্রচারণা ও আর্থিক মান বাংলা একাডেমি, এমনকি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে-স্বাধীনতা পদকের চেয়েও বেশি।  যেহেতু পুরস্কার দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার লেখকজীবন, আরো ভালো লেখার প্রয়াস এবং আরো বড় পুরস্কার পাওয়ার তৃষ্ণাটাও একসময় প্রবল হয়েছিল। এর কিছু সোজাসাপ্টা কারণও আছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল লেখালেখির কাজ লেগে থেকে এবং অর্ধ শতাধিক গ্রন্থের লেখক হয়েও আমি পেশাদার বা পাঠকনন্দিত লেখক হতে পারিনি। আমার বই ‘পাঠক খায় না’ এই অজুহাতে প্রকাশরা প্রাপ্য লেখক-সম্মানী দেন না নিয়মিত। লক্ষাধিক টাকা মূল্যের একটা পুরস্কার পেলে সংসারের প্রয়োজন বা ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হবে, অন্যদিকে প্রচারণার ফলে পুরস্কৃত বইটির বিক্রিও কিছু বাড়বে হয়তো। কিন্তু এরকম আশায় গত বিশ বছরে গুড়েবালি পড়েছে বেশ কয়েকবার। লেখক কিংবা প্রকাশকের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি বই বিভিন্ন পুরস্কারদাতা প্রতিষ্ঠানে জমা পড়ার পরও একটাও পুরস্কার পায়নি। তার মানে কি গত দুই যুগ ধরে আমি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস ও শিশুসাহিত্যের বই লিখতে পারিনি আর? আমার নিন্দুক সমালোচক বন্ধুরা না পড়েই অনেকে বলেন বটে, মঞ্জু এখন বাজে লিখছে। 

বেশি লিখতে গিয়ে বাজে বা দুর্বল লেখা যে লিখিনি, তা নয়। তবে গত দুই দশকে নিজের লেখক জীবনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। পুরস্কারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে না পারার জন্য কি সেগুলোর সাহিত্যমানের দুর্বলতাই শুধু দায়ী? আমি নিজে তা মনে করি না। আসলে প্রথম জীবনে নিজে চেষ্টা-তদ্বির না করলেও পুরস্কারপ্রাপ্ত বইগুলি কিছু পাঠক-সমালোচকের নজর কেড়েছিল, যাকে বলা চলে ব্যাটে-বলে সংযোগ ঘটেছিল; সেরকরম সংযোগ ঘটেনি আমার সাম্প্রতিক বেশ কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে। তাছাড়া গভীরভাবে বিশ্বাস করি, পুরস্কার পাওয়ার কারণে যেমন কোনো সাহিত্য মহৎ ও কালজয়ী হাতে পারে না, তেমনি পুরস্কার না পেলেও কারো কারো সাহিত্য তুচ্ছ কিংবা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় না।

বিশ্বসাহিত্যের বড় পুরস্কার নোবেলজয়ী  বহু লেখকের নাম ও কীর্তি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের সাহিত্য পাঠকরা তাদের অনেকের নামও জানে না। আবার নোবেল না পেয়েও টলস্টয় কি দস্তয়ভস্কি এখনো জীবন্ত হয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ যদি নোবেল পুরস্কার না-ও পেতেন, তাহলেও বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে তাঁর অবদান ও কৃতি বিন্দুমাত্র হ্রাস পেত বলে মনে করি না। স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের দেশেও বুদ্ধিজীবী-লেখক আহমদ ছফা বাংলা একাডেমি বা রাষ্ট্রীয় একুশে পদক না পেয়েও পাঠক মহলে মৃত্যুর পরও আলোচিত ও পঠিত হন।  অন্যদিকে বাংলা একাডেমি কি রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্তরা জীবদ্দশাতেই অপ্রাসঙ্গিক ও বিস্মৃত হয়েছেন কেউ কেউ। ভাষা আন্দোলনের উপর তিনখণ্ডের অসাধারণ গবেষণামূলক গ্রন্থ ছাড়াও দেশের সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতির বিবর্তন বিষয়ে বেশ কিছু চিন্তাশীল ও দায়বন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন বদরুদ্দীন উমর। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আপোসহীন চরিত্রের কারণে ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট বাংলা একাডেমি ও একুশে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। তাই বলে কি বুদ্ধিজীবী-লেখক হিসেবে বাঙালির মনন ও চিন্তারাজ্যে তাঁর অবদান মিথ্যে হয়ে যাবে?

আসলে  লেখকের জন্য  সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়ে ওঠেন তার পাঠক। সব লেখকই নিজের মতো উদ্দীষ্ট পাঠকের কাছে পৌঁছতে চান। কিন্তু সমকালে ব্যাপক পাঠকপ্রাপ্তি কিংবা জনপ্রিয়তা যেমন মহত সাহিত্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না, তেমনি অনেক পুরস্কারপ্রাপ্তিও বড় লেখকের মানদণ্ড নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে প্রশ্নটা স্পষ্ট করি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশে পাঠকস্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তার নিরিখে হুমায়ূন আহমেদ সেরা লেখক হয়েছেন। অন্যদিকে  অতি সীমিত পাঠক নিয়ে হাসান আজিজুল হক দেশে প্রচলিত সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব সাহিত্য পুরস্কারই লাভ করেছেন। এ দুজনার মধ্যে কে বড় লেখক তা নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন। শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের মানদণ্ড পক্ষপাতপূর্ণ ও বিতর্কিত হবে অবশ্যই। সব যুগে ও সব দেশেই  মহৎ সাহিত্যের সেরা পুরস্কার দিয়ে থাকেন আসলে ভবিষ্যতের পাঠকরা।

অর্ধ শতাধিক গ্রন্থের পরও  নিজেকে জনপ্রিয় বা প্রতিষ্ঠিত লেখক ভেবে বিন্দুমাত্র আত্মতৃপ্তি লাভ করিনি। আক্ষেপও নেই, কারণ কিংবদন্তী জনপ্রিয়দের মতো জনপ্রিয় হতে চাইনি। তবে সাম্প্রতিক লেখালেখি দ্বারা মুষ্টিমেয় পাঠকের কাছেও পোৗঁছতে পারছি কিনা সন্দেহ জাগে। আমার বই  তেমন বিক্রি হয় না বলে প্রকাশক প্রত্যাশিত রয়্যালটি দেন না নিয়মিত। অন্যদিকে লেখক-জীবনের শুরুতে যেমন পাঠকস্বীকৃতি, প্রশ্বস্তি ও পুরস্কার পেয়েছি, পরিণত বয়সে এসেও তেমন আশা করে হাতাশাই বাড়ছে শুধু। এ প্রজন্মের তরুণ লেখকদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ফেসবুকে বারকয়েক নিজের লেখার কিছু প্রচার বিজ্ঞাপন চালিয়ে দেখেছি। সেখানে জাকারবার্গীয় নিয়মে চটজলদি যেসব ফিডব্যাক পাওয়ার পদ্ধতি, তা আত্মসস্তুষ্টি লাভের নির্ভরযোগ্য প্রাপ্তি ভাবতে পারি না। ফেসবুকে গ্রুপিং ও পারস্পরিক পিঠ-চাপড়ানিও বেশ। এসবের সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না বলে নিজেকে একা লাগে অনেক সময়।  তবে কি ব্যর্থতার হতাশা থেকেই ভবিষ্যত পাঠকের কাছে আশ্রয় পাওয়ার সান্ত্বনা খুঁজছি? বিষয়টা আসলে সেরকম নয়। অতীতে কিছু সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছি, ভবিষ্যতেও শর্তহীন কোনো পুরস্কার পেলে প্রত্যাখান করবো না হয়তো-বা। কিন্তু সাহিত্য মূল্যায়নের জন্য দেশে যেসব সরকারি-বেসরকারি সাহিত্য পুরস্কার আছে, সেগুলোকে সাহিত্যের মূল্যমান নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি ভাবি না। 

আগেও বলেছি এবং বিশ্বাসও করি, সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পুরস্কার ও স্বীকৃতি আসে পাঠকের কাছ থেকেই। লেখক নিজেও একজন বড় মাপের পাঠক বটে। সাহিত্য সমালোচকের ভূমিকায় না নেমেও, অন্য লেখকের লেখার মূল্যায়ন তিনি পাঠক হিসেবে অবশ্যই করে থাকেন। একইভাবে লেখার সময় এবং লেখা শেষে চূড়ান্ত সম্পাদানা বা প্রুফ দেখার সময় নিজের লেখাটিরও তিনিই প্রথম পাঠক। পাঠক হিসেবে তার মূল্যায়নে নিজের লেখকসত্তা যদি সন্তুষ্ঠ বা তৃপ্ত হয়, আমি মনে করি সেটাই তার জন্য সেরা পুরস্কার।  আমি লেখক হিসেবে অনেক লেখা লিখে আনন্দ পোয়েছি সত্য, কিন্তু নিজের কোনো লেখাই পাঠ করে সম্পূর্ণ তৃপ্তি পাইনি। এমনকি বই হয়ে বেরুনোর পর নিজের বইটি দ্বিতীবার পড়তেও ইচ্ছে জাগে না আর। নির্দ্বিধায় বলব, পাঠক হিসেবে নিজেকে নিজের সেরা পুরস্কারটি দিতে পারিনি এখনো। এই অতৃপ্তি  এবং  আত্মমূল্যায়নে লেখক হিসেবে ব্যর্থতার বোধ শুধু সফল হওয়ার জিদ জাগায় না, নিজের বিচারেও সেরা পুরস্কারপ্রাপ্তির মতো প্রেরণাও  জোগায়। ব্যাপারটিকে অনেকে ব্যর্থ লেখকের আত্মসান্ত্বনা ভাবতে পারেন।  কিন্তু বৈরী সময়ে এরকম আত্মসান্ত্বনাও যদি নিজের লেখালেখি অব্যাহত রাখার আত্মবিশ্বাস ও প্রেরণা জোগায়, সেটাই বা অন্যের দেয়া পুরস্কারের চেয়ে কম বড় পুরস্কার কীসে?

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়