ঢাকা     শুক্রবার   ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ৮ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

সাহিত্যের অনুবাদ: বিক্ষিপ্ত ভাবনা

আলম খোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৯, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
সাহিত্যের অনুবাদ: বিক্ষিপ্ত ভাবনা

অনুবাদ করছি, তা প্রায় চল্লিশ বছরেরও অধিককাল ধরে। শুরুটা হয়েছিল সেই আশির দশকের গোড়ার দিকে, যখন আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যদিও আমার প্রধান আগ্রহ বরাবরই ছিল সাহিত্যের প্রতি। তখন মূলত কবিতা, গল্প লিখতাম; মাঝেমধ্যে গ্রন্থালোচনা কিংবা সাহিত্যবিষয়ক টুকটাক নিবন্ধ। সেগুলো ছাপা হতো দেশের প্রধান দৈনিকগুলোর সাহিত্যপাতায়। তো সেইসব সাহিত্যপাতারই কয়েকজন শ্রদ্ধেয় সম্পাদক, বিশেষ করে ‘দৈনিক বাংলা’র কবি আহসান হাবীব, দৈনিক ‘ইত্তেফাকে’র কবি আল মুজাহিদী এবং দৈনিক ‘সংবাদে’র জনাব আবুল হাসনাত, বিশ্বসাহিত্যের প্রতি আমার তুমুল আগ্রহ লক্ষ্য করে আমাকে তখন মাঝেমধ্যে কিছু অনুবাদ করারও পরামর্শ দেন। বস্তুত তাঁদের সুপরামর্শেই ক্রমে আমার অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রাথমিক অভিযাত্রার শুরু। 

পরে, আশির দশকের শেষপাদে উচ্চশিক্ষার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থানের ফলে সেটি তার সত্যিকার অভিমুখটি খুঁজে পায় এবং আমি অনুবাদকর্মকেই আমার সাহিত্যজীবনের অন্যতম প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করি। 

সেটাকেই হয়তো-বা আমি পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হই যাকে একধরনের পেশাদারিত্ব বা দায়বদ্ধতার নিদর্শনও বলা যেতে পারে। আর আমার নিজের মধ্যে সবসময় একটা জিনিস কাজ করতো; সেটা হচ্ছে কোথাও ফাঁকি না দেওয়ার চেষ্টা, নিজের সঙ্গে প্রতারণা না করার প্রতিজ্ঞা। এটা তো আসলে নিজে নিজেই বুঝতে পারা যায়, একটি কাজ আমি ঠিক করছি নাকি ভুল করছি। কিন্তু অনেক সময় হয়তো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মধ্যে কিছুটা শৈথিল্য ও আপসকামিতা চলে আসে। কিন্তু তত্ত্বগতভাবে আমি সবসময়ই একটা ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলাম যে, কোথাও যেন ফাঁক না পড়ে এবং যতদূর সম্ভব আমার অনুবাদটি যেন মূলানুগ হয়, আবার যেন সেটা আমাদের বাংলা ভাষার আত্মা ও আদত প্রকৃতির সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ হয়। আমাদের যে উদ্দিষ্ট পাঠক শ্রেণি, সেটা যেন তাদের কাছে একইসঙ্গে বোধগম্য ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সেই লক্ষ্যটা আমার কাছে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

পাশাপাশি উন্নত বিশ্বে থাকার কারণে, তাদের সাহিত্য-পরিমণ্ডলের যে পেশাদারিত্ব সেটার প্রভাবে সবমিলিয়ে আমার মধ্যে এক ধরনের নিবেদন ও নিষ্ঠার মনোভাবও গড়ে উঠেছিল। অবশ্য, ছাত্রাবস্থায় বা তরুণ বয়সে আমি যেসব অনুবাদ করতাম সেটা তেমন কোনো আত্মিক কিংবা বৌদ্ধিক তাগিদ থেকে নয়। ওটা তাৎক্ষণিক আবেগ থেকেই করা হতো; যেমন একটা লেখা পড়লাম, ভালো লাগল, তখন ইচ্ছে করত আমাদের দেশের পাঠকদের সঙ্গে সেটা ভাগ করে নিতে। 

কোনো কোনো পত্রিকাও আমার কাছে অনুবাদ চাইত। যেহেতু ইংরেজিতে মোটামুটি দখল ছিল, বাংলাটাও জানা ছিল ভালোই, ফলে ঝটপট সেটা করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু একপর্যায়ে ধীরে ধীরে এর সাহিত্যমূল্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলাম, অনুবাদকে সাহিত্যের বড় একটা বিষয় ও বর্গ হিসেবে দেখতে শিখলাম, ভাবতে শিখলাম এর বহুমুখী তাৎপর্য বিষয়ে। তখন আমার মনে হতে লাগল বাংলাদেশে অনুবাদের নামে আসলেই বেশ একটা নৈরাজ্য, যথেচ্ছাচার এবং বাজারিয়ানা আমাদের অনুবাদের পরিমণ্ডল দূষিত করে তুলছে। সেই থেকেই একটা ভাবনা আসে আমার মনোজগতের গভীরে, অনুবাদচর্চার ক্ষেত্রে প্রকৃত দায় ও দায়িত্ব নিয়ে এক ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সম্ভাবনা সম্পর্কে। সেটা লেখা নির্বাচন থেকে শুরু করে উপস্থাপনা, সম্পাদনা, লেখক-পরিচিতি রচনা, ভূমিকা, টীকাভাষ্য সংযোজন সবকিছু মিলিয়েই। 

এভাবে ধীরে ধীরে নিজের মতো করে একটা দিকনির্দেশনা, একটা পথ খুঁজে পেয়েছিলাম। ফলে অনুবাদটা এখন আমি খুব সচেতন হয়েই করি। যতদিন না নিজে সন্তুষ্ট হচ্ছি ততদিন ছাপানোর বা প্রকাশের কোনো তাগিদ কাজ করে না ভেতরে। এখন বলা যেতে পারে যে, আমি অনুবাদটা সত্যিকারভাবেই খুব সিরিয়াসলি করি। বাস্তব চর্চার দিক থেকে যেমন, তাত্ত্বিকভাবেও সেটা নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা ও পড়ালেখা করি, যেন অনুবাদটাকে একটা আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যমাধ্যম হিসেবে আমরা এ দেশের সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, যা আমাদের সামগ্রিক সাহিত্য-পরিমণ্ডলকে আরও ঋদ্ধ করবে, প্রসারিত করবে।

এ ছাড়া অনুবাদকর্ম, তা সেটা বিদেশি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় কিংবা বাংলা ভাষা থেকে বিদেশি ভাষাতেই হোক না কেন, একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, তার সৃষ্টিশীলতার পরিচয়, সার্বিক উন্নয়ন ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ আমাদের দেশে, স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরেও এটা নিয়ে নেই কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মতৎপরতা। যতটুকু কাজ হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও বেসরকারি পরিসরে। সেখানেও নেই কোনো সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের চর্চা। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যকে সুষ্ঠু অনুবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পাঠক-সম্প্রদায়ের কাছে ও বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা তো এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। 

বছর কয়েক আগে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের পঞ্চাশজন নারীকবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সংকলন Arise out of the Lock সম্পাদনা করতে গিয়ে এই সত্যটি আরও প্রবলভাবে অনুভব করেছি আমি। বিদেশে বাংলাসাহিত্য ও দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের বেশ ভালোরকম চাহিদা এবং একটি সম্ভাবনাময় বাজার থাকা সত্ত্বেও আমরা যে সেটাকে কাজে লাগাতে পারছি না কিছুতেই, এটি একটি জাতিগত লজ্জার বিষয় বইকি। এই ব্যর্থতার অপনোদন আর শূন্যতা মোচনে আমি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ ক্ষেত্রে যথাসম্ভব অবদান রাখার তাগিদ বোধ করি। নিজে সাধ্যমতো বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদের পাশাপাশি, অন্যদেরও এই কাজে উৎসাহিত করা এবং তাঁদের অনূদিত মানসম্পন্ন রচনাকে দেশে-বিদেশে প্রকাশ ও পরিবেশনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালনের ষোলোআনা সদিচ্ছাও রয়েছে আমার।

এরই সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই এখানে। সেবার ঘোষিত হলো সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হাঙ্গেরির কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনোহোরকাইয়ের নাম। তার আগে বিশ্বজুড়েই চলেছে এন্তার জল্পনাকল্পনা―এ  বছর কে পাচ্ছেন এই পুরস্কার, তা নিয়ে প্রতি বছরের মতো।  বাজি ধরাধরিও চলেছে রীতিমতো বলে-কয়েই। এ সময় এমন উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা গ্রাস করে এ দেশের বিদ্বৎজনদেরও। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে নিবন্ধাদি প্রকাশের হিড়িক পড়ে যায়। এ সময় আরেকটি প্রশ্নও প্রায় দীর্ঘশ্বাসের মতোই শোনা যায়― সাহিত্যে আমরা কবে নোবেল পাব আবার? 

সবেধন নীলমণি যে-একটিমাত্র পুরস্কার জুটেছিল বাংলা সাহিত্যের ভাগ্যে তার বয়সই তো এখন একশ তেরো! গত বছর বাঙালি লেখক অমিতাভ ঘোষের নামও উচ্চারণ করেছিলেন কেউ কেউ সম্ভাব্য প্রাপক হিসেবে, যদিও তিনি বাংলা ভাষায় নয়, ইংরেজিতেই লেখেন প্রধানত। বস্তুত এই প্রশ্নটিকেই আরেকটু তলিয়ে দেখা এবং এর একটা সন্তোষজনক উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা এই নিবন্ধের আদত উদ্দিষ্ট।

এই প্রশ্নের পিঠে আরো একটি প্রশ্নও উঠে আসে: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কি নোবেল পুরস্কার পাবার মতো লেখক কিংবা সাহিত্যকর্ম আছে আদৌ? এর উত্তরে জোর দিয়েই বলা যায়, আলবৎ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের পরে অন্তত আরও এক ডজন সাহিত্যিকের নাম এই মুহূর্তেই করা যায়, যে কোনো মানদণ্ডে যাঁরা নোবেল পুরস্কার পাবার যোগ্য। বাংলা কথাসাহিত্যের বিখ্যাত তিন বন্দ্যোপাধ্যায় তো রয়েছেনই, সেই সঙ্গে জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সতীনাথ ভাদুড়ী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী, দেবেশ রায়, শঙ্খ ঘোষ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এমনকি সৈয়দ শামসুল হকের নামও উঠে আসতে পারে এই তালিকায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাঁরা কেউই এই পুরস্কারের মুখ দেখে যেতে পারেননি। এর প্রধান কারণ: জীবদ্দশায় তাঁদের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মসমূহের বিদেশি তথা ইংরেজি ভাষায় ঠিকঠাকমতো অনুবাদ না হওয়া। খোদ রবীন্দ্রনাথও এই পুরস্কার আদৌ পেতেন কিনা সন্দেহ, যদি না তিনি নিজেই নিজের কিছু কবিতা অনুবাদ করার উদ্যোগ নিতেন এবং যদি ঘটনাচক্রে বিখ্যাত বিলেতি চিত্রশিল্পী উইলিয়াম রদেনস্টাইনের সঙ্গে পূর্বপরিচয় না থাকত তাঁর। কেননা এই রদেনস্টাইনই প্রখ্যাত আইরিশ কবি ইয়েটসের সঙ্গে কবির পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের অনূদিত কবিতার পাণ্ডুলিপিখানি। ইয়েটস সেগুলো পড়ে ও কবির কণ্ঠে সেসবের অপূর্ব আবৃত্তি শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রকাশিতব্য ‘গীতাঞ্জলি’ গ্রন্থের জন্য একটি ভূমিকা লিখে দেন, যা আমরা জেনেছি, কবির নোবেল পুরস্কারলাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ধান ভানতে এই রবির গীত গাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য: অনুবাদ ও বৈশ্বিক যোগাযোগের ওপর জোর দেওয়া, যে-দুটোর অভাবে অদ্যাবধি বাংলা সাহিত্যের আর কারও ভাগ্যে, যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, এই নোবেলের শিকেটুকু ছিঁড়ল না। প্রথমে আসা যাক অনুবাদের বিষয়টিতে। নোবেল পুরস্কারটি যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার যার পরিসর বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত, সেহেতু এর যাবতীয় কার্যকলাপ একটি মোটামুটি সর্বজনবোধ্য আন্তর্জাতিক ভাষার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়; বলাবাহুল্য সে-ভাষাটি ইংরেজি। ফলত নোবেল পুরস্কারের জন্য আমাদের কোনো সাহিত্যিককে প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হতে হলেও তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মসমূহকে ইংরেজিতে এবং সম্ভব হলে আরও দুয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বভাষাতেও অনূদিত হওয়া আবশ্যক। তবে এই অনুবাদ যার-তার দ্বারা, যেন-তেন প্রকারে সংঘটিত হলে চলবে না; তাকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং বর্তমান বিশ্বের স্বীকৃত ন্যূনতম ভাষাভঙ্গি ও প্রকাশরীতির নিরিখে প্রকাশক, সম্পাদক, সমালোচক সম্প্রদায়, সর্বোপরি বৃহত্তর বোদ্ধা পাঠকশ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

তেমন অনুবাদক, যাঁর বাংলা ও ইংরেজি এই দুই ভাষাতেই রয়েছে সমান দখল ও দক্ষতা, বিশেষ করে সমকালীন ও সৃজনশীল ইংরেজিতে লিখবার সহজাত ক্ষমতা, খুব বেশি যে নেই এখনকার বাংলাদেশে এই কথাটি আমাদের সর্বাগ্রে স্বীকার করে নেওয়াটাই তাই মঙ্গলজনক। তাহলে করণীয় কী? করণীয় এই যে, আমাদের এ জন্য শুধু দেশের ভেতরে নয়, বাইরের দিকেও তাকাতে হবে। ঐতিহাসিক কারণেই পাশের দেশ ভারতে উল্লিখিত মান ও যোগ্যতাসম্পন্ন অনুবাদকের সংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। ফলে আমাদের নজরটা সেদিকেও প্রসারিত করতে হবে।

অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের অনুবাদকেরাই আমাদের সাহিত্যের অনুবাদ করছেন অনেক বেশি এবং সেগুলো বিশ্বের বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত, প্রশংসিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরস্কৃতও হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বিশেষ করে দুজন অনুবাদক অরুণাভ সিনহা ও ভেঙ্কটেশ রামাস্বামীর কথা বলতেই হয়, যাঁদের দক্ষ হাতে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, শহীদুল জহির, শাহাদুজ্জামান, শাহীন আখতার, মশিউল আলম, মাসরুর আরেফিনের মতো আমাদের অনেক মেধাবী লেখক অনূদিত হয়েছেন। এর বাইরে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও অনেকে রয়েছেন যাঁরা এই কাজের যোগ্যতা রাখেন এবং তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে তা করেও চলেছেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শবনম নাদিয়া, মাহমুদ রহমান প্রমুখ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যের একাধিক শক্তিমান লেখকের রচনা ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেশে ও বিদেশে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন। 

এ ছাড়া ক্লিন্টন বুথ সিলি, উইলিয়াম রাদিচে, হান্স হার্ডারের মতো আরও অনেক বিদেশিও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রেমে পড়ে এই ভাষা রপ্ত করেছেন খুব যত্ন করে, যা কাজে লাগিয়ে তাঁরা আমাদের অনেক মূল্যবান সাহিত্য ইতোমধ্যেই ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এঁদের সবাইকে উপযুক্ত সম্মান ও সম্মানীর বিনিময়ে যদি সুপরিকল্পিতভাবে, সত্যিকার পেশাদারিত্বের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনুবাদ প্রকল্পে যুক্ত করার কথা ভাবা যায়, তাহলে অবশ্যই সেটি আমাদের সাহিত্যের জন্য সুফল ও সুনাম বয়ে আনবে।

তবে বলাবাহুল্য এটি কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। এর পেছনে অবশ্যই রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক উদ্যোগকে ক্রিয়াশীল হতে হবে। আমাদের দেশে বাংলা একাডেমি, মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থা, সাহিত্য পত্রিকাসমূহ ইত্যাদির সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগেই কেবল এ ধরনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রকল্প গ্রহণ ও তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ জন্য সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে আলাদা সেল গঠন করে একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা কমিটির তত্ত্বাবধানে সেটি পরিচালিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রকাশনাসংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন, যোগাযোগ রক্ষাজনিত বৈশ্বিক বিধিবিধানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্তিও থাকা দরকার এই প্রকল্পের সঙ্গে। বিশেষত ফিবছর অনুষ্ঠিত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশগ্রহণের সময় আমাদের লক্ষ্য থাকা উচিত বিদেশি প্রকাশক, সম্পাদক, সাহিত্যের এজেন্ট প্রমুখের সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও যোগাযোগ গড়ে তোলা, এবং তাদের কাছে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সম্যকভাবে তুলে ধরা।

এ ছাড়া বিশ্বের বৃহত্তর সাহিত্যিকসমাজ ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক, প্রকাশকদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন, উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। পাশাপাশি নিজেরাও, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নিয়মিতভাবে নানাবিধ সাহিত্য উৎসব, সম্মেলন, সেমিনার ইত্যাদি আয়োজন করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিখ্যাত লেখক, প্রকাশক, অনুবাদক, সমালোচক, সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এনে তাঁদের সঙ্গে ভাববিনিময় ও কার্যকর সৃজন-সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

মোদ্দা কথা এই যে, আমরা সবাই জানি আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে, রয়েছে গর্ব করার মতো অনেক অর্জনও। কিন্তু সেই ঐতিহ্য ও অর্জন, শুধু পুরস্কার প্রাপ্তির আশাতেই নয়, সাধারণভাবেই বিশ্বের দরবারে পরিচিত করানো, বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা বিশাল ও উৎসুক ভোক্তাশ্রেণির কাছে পৌঁছানো আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বের অংশ। বিশ্বসাহিত্য ও তার বিপুল জ্ঞানকাণ্ডের  নিয়মিত অনুবাদের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমরা নিজেদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষার সমৃদ্ধি ঘটাতে পারব, তেমনি আমাদের নিজেদের গৌরবময় সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে মানসম্পন্ন অনুবাদের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর বিশ্বে হাজির করাটাও সহজ ও সম্ভবপর হবে। এটি আমাদের সম্মিলিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বইকি। বাইরের জগৎকে আমাদের সুপ্রাচীন সংস্কৃতি, মূল্যবান মানস-ঐশ্বর্যের সন্ধান দেওয়া এবং তার কাছে দেশের বৌদ্ধিক ভাবমূর্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুবাদসংশ্লিষ্ট বহুবিধ কর্মযজ্ঞ শুরু করা এখন তাই সময়ের দাবি―এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়