রম্যগল্প
ট্রিমার
আহসান হাবীব || রাইজিংবিডি.কম
অলংকরণ: মামুন হোসাইন
হাসান সাহেব এবার জন্মদিনে ট্রিমার উপহার পেয়েছেন। এমন না যে প্রতি জন্মদিনেই তিনি উপহার পেয়ে থাকেন। এই ষাট বছর বয়সে কি আর জন্মদিন হয়? তাছাড়া তিনি যে যুগের মানুষ তাদের ছোটবেলাতেও জন্মদিন বলে কিছু ছিল না। যাহোক ঘটনা চক্রে এবার জন্মদিনটা হয়েছে; মানে স্ত্রী কি মনে করে রান্নাবান্না করেছেন (সংখ্যাটা বালাই ষাট বলেই হয়তো), কিছু গেস্ট এসেছে এবং টুকটাক উপহারও পেয়েছেন। তার মনে হচ্ছে দারুণ একটা উপহার ট্রিমার। উপহারটা দিয়েছে তার শালা।
ট্রিমার জিনিসটা তিনি খুব যে চিনতেন তাও না। এ নামে একটা বস্তু আছে তাও জানা ছিল না। তবে এখন জেনেছেন এই ট্রিমার দিয়ে তিনি চুল ছোট-বড় করতে পারবেন। না ভুল বললাম, বড় করা যাবে না। হাফ ইঞ্চি, এক ইঞ্চি, দেড় ইঞ্চি পর্যন্ত ছোট করতে পারবেন নিজে নিজেই। শুধু তাই না, তিনি দাড়িও ছোট-বড় করতে পারবেন।
অবশ্য ‘বড় করতে পারবেন’ কথাটা বলা খুব ভুলও না। গালের একদিকে দাড়ি বা গোঁফ ছোট করলেন, আরেক দিকে একটু বড় রাখলেন, একই দিকে এই ঘটনা ঘটতেই পারে ফ্যাশন বুঝে। অর্থাৎ ছোটটার তুলনায় এটাই হচ্ছে বড় করা। যাহোক তিনি বেশ খুশিই ছিলেন। একদিন বেশ আয়োজন করে চুল ট্রিমও করলেন। এ বেশ ভালোই হলো, এই দুর্দিনের বাজারে নাপিতের খরচটা অন্তত কমল। এই বা মন্দ কি!
কিন্তু ক’দিন বাদেই একটা দুর্ঘটনা ঘটল। হাসান সাহেবের বাসায় চোর ঢুকল। গ্রিল কেটে ঢুকেছে। খুব ভোরে এই কণ্ডটা হয়েছে। তবে লোকজন জেগে যাওয়ায় চোর বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। কিছু কাপড় আর হাসান আব্দুল্লাহ সাহেবের ট্রিমারটা নিয়ে গেছে। সত্যি বলতে কি মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল তার। এই বয়সে এসে জাগতিক জিনিসপত্রের প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ বা মায়া নেই। কিন্তু ট্রিমারটার প্রতি কেন যেন একটুখানি মায়া জন্মে গিয়েছিল, আর সেটাই কিনা এখন নাই!
হাসান আবদুল্লাহ ফেসবুক করেন। তিনি বেশ মন খারাপ করা একটা পোস্ট দিলেন ট্রিমারটা নিয়ে। পঞ্চাশটির মতো লাইক পড়ল। দু’একজন আহা উহু টাইপ কমেন্ট করল। এক বাল্যবন্ধু লিখল: ‘পুরো দেশটাই চলে গেছে চোরছ্যাচ্চরদের হাতে... সামান্য এক ট্রিমার নিয়ে নাকিকান্না কাঁদছিস!’
তবে মজার ব্যাপার ঘটল ক’দিন পর। পরপর দুটো ট্রিমার এসে হাজির তার ঠিকানায়। একটা পাঠিয়েছে তার সুইডেনে থাকা ভাগ্নি। লোকমারফত। আরেকটা বাইপোস্টে এসেছে আমেরিকা থেকে তার এক ভাস্তে পাঠিয়েছে। একটা হারিয়ে এখন দুটো ট্রিমারের মালিক তিনি। তিনি হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে পারছেন না। আর সেদিন বিকেলেই তার শালা দ্বিতীয় একটা ট্রিমার নিয়ে এসে হাজির; সেই একই মডেলের ট্রিমার। যেন সেই আগেরটাই ফিরে পেলেন।
‘আরে আবার কেন এনেছ?’ তিনি বলেই ফেললেন।
‘কি বলেন দুলাভাই! যে মন খারাপ করা পোস্ট দিয়েছেন ওটা তো রীতিমত ভাইরাল হয়েছে।’
‘বলো কী!’
সেদিনই ফেসবুক খুলে দেখেন আরে তাই তো! তিন হাজার লাইক, কমেন্ট দুইশ ত্রিশটা, শেয়ারও কম না পাঁচশর উপরে। এটাকেই ভাইরাল হওয়া বলে নাকি! তিনি ভাইরাল হওয়ার জন্য লিখেছিলেন? তিনি লেখাটা আবার পড়লেন।
‘‘এই বুড়ো বয়সে জন্মদিনে একটা উপহার পেয়েছিলাম। জিনিসটা ‘ট্রিমার’। আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। নিজের চুল দাড়ি ঘরে বসেই ট্রিম করা যাবে মন্দ কি। কিন্তু জিনিসটা চুরি হয়ে গেল। গ্রিল কেটে ঢুকে চোর আর কিছু পেল না, আমার উপহার পাওয়া ট্রিমারটাই নিয়ে গেল। আচ্ছা ঐ চোর কি ট্রিমারটা দিয়ে নিজের চুল দাড়ি ছাটবে নাকি জিনিসটা বিক্রি করে দেবে? হয়ত বিক্রিই করে দেবে। সেই টাকায় তার বাচ্চার স্কুলের বেতন দেবে কিংবা এক বেলা বাজার করবে কিংবা স্ত্রীর জন্য কোনো একটা উপহার কিনে ঘরে ফিরবে। ট্রিমার চোরকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমার মনটা হঠাৎ ভালো হয়ে গেল। মনে পড়ল তলস্তয়ের গল্পের এক চোরের কথা।
এক বিখ্যাত পাদরি এক দরিদ্র লোককে আশ্রয় দিল, খেতে দিল, ভালো কাপড় দিল ... রাতে থাকতে দিল। আর কি আশ্চর্য সেই দরিদ্র লোক তার বাসার দামি জিনিসপত্র নিয়ে ভোর বেলা ভেগে গেল। মানে চুরি করল। পাদরি মন খারাপ করলেন না, কাউকে কিছু বললেনও না। সন্ধ্যার দিকে পুলিশের লোকজন সেই চোরকে ধরে নিয়ে এলো চুরি যাওয়া জিনিসপত্রসহ।
‘জনাব আপনার ঘরের দামি জিনিসপত্র চুরি করেছে সে। আমরা ধরে নিয়ে এসেছি।’
‘না না ও চুরি করেনি। এ সব ওকে আমি উপহার দিয়েছি।’ বললেন পাদরি।
পুলিশ সব শুনে চলে গেল। আর চোর বেচারা হতভম্ব হয়ে বসে রইল দরজায় গোড়ায়। পরে অবশ্য এই চোর মহান এক চরিত্র হয়ে ওঠে তলস্তয়ের গল্পে।
আমার ট্রিমার চোরটাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আামি বেশ...।’’
বাকিটা আর পড়লেন না হাসান আব্দুল্লাহ। ভাবলেন এটা কি সত্যিই আদৌ ভাইরাল হওয়ার মতো কোনো লেখা হয়েছে? শেষের দিকে একটু মেলোড্রামা হয়ে গেছে। ওটাই কি সবাইকে টাচ করেছে?
যাহোক পরপর দুদিন তিনি আরো দুটো ট্রিমার পেলেন। একটা নিয়ে এসেছে তার ছোট বোন। আরেকটা তার বন্ধু কলিগ মারুফ।
‘আচ্ছা তোরা শুরু করেছিস কি?’
‘কী করেছি?’
‘এই যে ট্রিমার কিনে এনেছিস?’
‘আরে কিনে আনি নি। আমার দুটো আছে একটা তোকে দিয়ে গেলাম। তবে সত্যি তোর লেখাটা কিন্তু দারুণ হয়েছে!’
‘কোন লেখা?’
‘আরে ফেসবুকে যেটা লিখেছিস ট্রিমার নিয়ে। উফ আমি তো শেষের দিকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। শোন একটা কথা বলি।’
‘বল।’
‘তুই লেখালেখি শুরু করে দে। তোর মধ্যে জিনিস আছে। তোর হবে। সামনে বইমেলা আসছে তুই একটা পা-ুলিপি রেডি কর। বই বের করার দায়িত্ব আমার। দরকার মনে করলে তুই আমি মিলে একটা প্রকাশনা দিয়ে ফেলব।’
‘প্রকাশনার নাম কি দিবি? ট্রিমার পাবলিকেশন্স?’
‘হা হা হা... মন্দ বলিসনি।’
সপ্তাহ দু’য়েকের মধ্যে হাসান আব্দুল্লাহ ২০টা ট্রিমারের মালিক হয়ে গেলেন। তার ভার্সিটিতে পড়ুয়া মেয়ে বলল, ‘বাবা তুমি ট্রিমারের একটা শোরুম দাও।’
ছেলে বলল, ‘বাবা আমি কিন্তু মডেল হবো।’
‘মডেল লাগবে কেন?’
‘বাহ শোরুমের অ্যাড করতে ট্রিমারের মডেল লাগবে না?’
পরের সপ্তাহেই আরেক চমক। স্মার্ট এক তরুণ এসে হাজির। হাতে এটাচি কেস।
‘কী ব্যাপার?’ দরজা খুললেন হাসান সাহেব নিজেই।
‘আমি ‘কিমেই’ প্রফেশনাল হেয়ার ক্লিপার কোম্পানি থেকে এসেছি।’
‘আমার কাছে কী দরকার?’
‘আমরা আসলে ট্রিমার সেল করি। বাংলাদেশে আমরাই সবচেয়ে বড় ডিলার। আমরা ভাবছি আপনাকে আমাদের কোম্পানির অ্যাম্বাসেডর করব।’
‘সে কি! কেন?’
‘কারণ স্যার আপনাকে নিয়ে ট্রিমার প্রসঙ্গে ফেসবুকে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। তাই আমাদের হাই অফিসিয়ালরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্তটা স্যার সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে। আমাদের হেড অফিস সিঙ্গাপুরে।’
শেষ পর্যন্ত হাসান আব্দুল্লাহ ‘কিমেই’ প্রফেশনাল হেয়ার ক্লিপার কোম্পানির অ্যাম্বাসেডর পদটা নিয়েছিলেন কিনা জানা যায়নি। তবে হঠাৎ এক সন্ধ্যায় অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান রমিজ এসে হাজির।
‘স্যার?’
‘বলো রমিজ।
‘স্যার পিছন দিক দিয়া ময়লা সাফ করতে গিয়া এইটা পাইসি।’
‘এইটা কী?’
‘স্যার যে দিনকা আপনার বাসায় চুরি হইল। সেই দিনকা চোরে মনে হয় এটা ফালায়া গেছে, নিতে পারে নাই। নিচে ময়লার মধ্যে পইরা ছিল।’
জিনিসটা হাতে নিয়ে হাসান সাহেব দেখেন জন্মদিনে উপহার পাওয়া তার সেই প্রথম ট্রিমারটা। সব মিলিয়ে হাসান আব্দুল্লার ট্রিমারের সংখ্যা এবার হলো একুশটি।
সংখ্যা হিসেবে একুশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিবোনাক্কি সংখ্যা।
ঢাকা/তারা//