জবিতে জুলাইবিরোধী শিক্ষকদের পদোন্নতি ঘিরে বিতর্ক
জবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) আওয়ামীপন্থি ও জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীবিরোধী অবস্থানে থাকার অভিযোগ থাকা কয়েকজন শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
১০ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের পদোন্নতি বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অন্তত সাতজন বিতর্কিত শিক্ষক পদোন্নতি পেতে পারেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন বিভাগের মোট ১৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতির জন্য বোর্ডের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত সাতজন শিক্ষক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে অভিযুক্ত।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে জবিতে আয়োজিত নীল দলের মানববন্ধনে এসব শিক্ষক অংশ নিয়েছিলেন। মানববন্ধনে তারা ছাত্র-জনতার এক দফা আন্দোলনকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
পদোন্নতির তালিকায় থাকা আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা হলেন—প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসা. উম্মে হাবিবা খাতুন, ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর ড. মো. মনির হোসেন, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাবিনা ইয়াসমিন, আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা হাসান, মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বালো, দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া আফরিন এবং সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সজীব সাহা। তারা সবাই জবির আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’-এর সদস্য।
এছাড়া, ২০২৫ এর ৩ আগস্ট গণভবনে আন্দোলন প্রতিহত করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও জবির নীল দলের শিক্ষকরা অংশ নেন। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘অশুভ শক্তির কবল’ থেকে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করা হয়। এর পরদিন থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে বাধা, হুমকি ও নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও ওঠে।
এসব শিক্ষকের প্রত্যক্ষ মদদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ ছাত্রলীগের পরিচয়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনের সময় ক্যাম্পাসে লাঠি ও পাইপ হাতে অবস্থান নেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।
৪ আগস্টের মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা কামাল বলেছিলেন, “এই বাংলাদেশে অরাজকতা সৃষ্টি করবেন না। দেশকে যারা আফগানিস্তান বানাতে চান, তাদের ফাঁদে পা দেবেন না।” একই সঙ্গে তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
অভিযুক্ত ৭ শিক্ষকের মধ্যে তিনজন সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে এবং চারজন সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন। পাশাপাশি আরো কয়েকজন শিক্ষককে অধ্যাপক গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ পদে উন্নীত করার প্রস্তুতিও চলছে।
ফার্মেসি বিভাগের ড. মনির হোসেন, মার্কেটিং বিভাগের বিদ্যুৎ কুমার বালো এবং দর্শন বিভাগের সাজিয়া আফরিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া, তালিকাভুক্ত সাত শিক্ষকই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী পোস্ট দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে আরো জানা যায়, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সাদেকা হালিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মনির হোসেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া, মার্কেটিং বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রবিষয়ক সম্পাদক নূরনবীকে ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী শাসনামলে বিএনপি-জামায়াতপন্থি ট্যাগ দিয়ে অনেক শিক্ষকের পদোন্নতি ও নিয়োগ বোর্ড শেষ মুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ এখন আন্দোলনবিরোধী শিক্ষকদেরই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
তারা আরো বলেন, উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন নিজেও আওয়ামী আমলে নিপীড়নের শিকার ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থান না হলে তিনি আজ উপাচার্য হতে পারতেন না। অথচ এখন নীল দলের নেতারা আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদ ও পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “জুলাই বিপ্লবের সময় যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করেছে, ক্লাসরুমে হেনস্তা করেছে এবং মানসিকভাবে টর্চার করেছে, তাদের পদোন্নতি দেওয়া জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে প্রতারণার শামিল।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা দেখেছি বাংলা বিভাগের এক শিক্ষককে বহিষ্কার করার পরও আবার ক্লাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন আচরণ কাম্য নয়। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে শিক্ষার্থীরা তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে।”
জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইমরানুল হক বলেন, “আমরা শিক্ষক সমিতি আগে থেকে এ বিষয়ে কিছু জানতাম না। যদি সত্যিই এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই এর বিরোধিতা করব। জুলাই আন্দোলনের সময় তারা সরাসরি আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।”
পদোন্নতি বোর্ডের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিনা শারমিন বলেন, “এখনো বোর্ড বসেনি। বোর্ড বসলে তখন দেখা যাবে কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে বা হবে না। কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে সেটি বিবেচনায় আসতে পারে।” তিনি এ বিষয়ে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন বলেন, “তারা কর্মরত শিক্ষক বা কর্মকর্তা। ৫ আগস্টের পর প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান কমিটি কাজ করছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসেনি। পদোন্নতি বোর্ড একটি ধারাবাহিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটকে দিলে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে প্রশাসন অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।”
ঢাকা/লিমন/জান্নাত