ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ মাঘ ১৪২৬, ২৮ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আদালতে মিয়ানমার, প্রার্থনায় রোহিঙ্গারা

সুজাউদ্দিন রুবেল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১০ ৭:৪৩:১০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১১ ২:১১:৩০ এএম

‘সারা রাত আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে চেয়েছি, রোজাও রেখেছি। আল্লাহর কাছে বলেছি, তুমি আমাদের দেশের কাফেরদের মনে রহমত নাজিল করো। যাতে আমরা রোহিঙ্গারা সবাই নিজের দেশে ফিরে যেতে পারি।’

মঙ্গলবার রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা মামলায় শুনানি শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে রাইজিংবিডিকে উল্লিখিত কথাগুলো বলেন উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া হাজি সুলতান আহমদ (৬৫)।

সুলতান আহমদ বলেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে গরমে ঘেমে, বৃষ্টিতে ভিজে ও শীতে কষ্ট পেয়ে পরদেশে বসবাস করছি। এখানে আর বসবাস করতে ইচ্ছে করছে না। এখন আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। এতে মনে হচ্ছে, বিচার আমাদের পক্ষে যাবে এবং আমরা শিগগির নিজের দেশ মিয়ানমারে ফিরতে পারব।

শুধু সুলতান আহমদ নন, একই আকুতি উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত সব রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিচার শুরু হওয়ায় মসজিদ ও মাদ্রাসায় চলছে দোয়া এবং মিলাদ মাহফিল।

এদিকে, মঙ্গলবার উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা জড়ো হন। তারা গাম্বিয়া, গাম্বিয়া এবং বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বলে বলে স্লোগান দেন। পরে সংক্ষিপ্ত মোনাজাত করেন তারা। মোনাজাতে তারা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলায় করায় গাম্বিয়ার প্রতি শুকরিয়া এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। পরে সবাই ক্যাম্পে ফিরে যান।

মধুরছড়া বাজার এলাকার দোকানদার রোহিঙ্গা জাফর আলম (৭০)। আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘নির্যাতিত হয়ে আমরা বাংলাদেশে এসেছি। বাংলাদেশ স্থান দিয়েছে। এটার জন্য শুকরিয়া ও বেশি বেশি ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাংলাদেশকে। আন্তর্জাতিক আদালতে যেহেতু বিচার হচ্ছে, এটার জন্য লাখ লাখ শুকরিয়া। এখন আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই।’

আরেক রোহিঙ্গা আবু ছিদ্দিক বলেন, ‘মিয়ানমারে আমাদের ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনকে মেরে ফেলেছে। ঘর পুড়িয়েছে। জমি দখল করেছে। এখন আন্তর্জাতিক আদালতে এসবের বিচার চাই। ওদের সাজা দিতে হবে। আমাদের সবকিছু ফিরে পেতে হবে।’

মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পর কুতুংপালং ক্যাম্পে গিয়ে একই অবস্থা দেখা যায়। সবার মনযোগ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানির প্রতি।

গণহত্যার অভিযোগ উত্থাপন করে গত ১১ নভেম্বর নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া।

মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) শুরু হয়েছে শুনানি। আদালতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিয়ানমারের ডি ফ‌্যাক্টো নেতা অং সান সু চি।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সাক্ষ্য দিতে কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের তিনজনের একটি প্রতিনিধিদল নেদারল্যান্ডের হেগে গেছেন। তারা আদালতে গণহত্যার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরবেন। রোহিঙ্গারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে আদালতে তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

সিরাজুল ইসলাম নামের আরেক রোহিঙ্গা বলেন, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট মিয়ানমার আমাদের নির্যাতন করে তাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে চলে এসেছি। গাম্বিয়া আমাদের পক্ষ হয়ে মামলা করেছে। তাই গাম্বিয়ার জন্য শুকরিয়া প্রকাশ করছি। মিয়ানমার থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে অং সান সু চি গেছে। সু চি এর আগে ২০১৪ সালে আমাদেরকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়েছে। সেখানে আমাদের পক্ষ হয়ে কথা বলবে না, বরং আমাদের ক্ষতি করবে।

কুতুপালং ক্যাম্প-১ লম্বাশিয়ার রোহিঙ্গা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এখন সু চি সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে হেগে গিয়েছে। সুষ্ঠু বিচার করে দেয়ার জন্য যায়নি। সু চি আসলে সেখানে গেছে দেশে ভোট পাওয়া জন্য। ’

একই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা আমির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের নাগরিকত্ব, অধিকার, নিরাপত্তা, জায়গা-জমি যাতে ফিরে পাই এবং অন্যান্য ১৩৫টি জাতি মিয়ানমারে যে অধিকার নিয়ে বসবাস করে সেই অধিকার নিয়ে আমরাও যাতে মিয়ানমারের ফেরত যেতে পারি, সে বিচারটা আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে আশা করি।’

আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার শুরু হওয়ায় রোহিঙ্গারা খুশি বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তারা বলেছেন, গত ৭০ বছর ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান জাতিগত নির্যাতন-নিপীড়নের সুষ্ঠ বিচার পাব আমরা।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ‌্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সদস্য মোহাম্মদ জুবায়ের রাইজিংবিডিকে বলেন, মিয়ানমার যে গণহত্যা চালিয়েছে, এটার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হচ্ছে। ওখানে অং সান সু চি গেছে, সেটাও দেখছি। বিশ্ব আমাদের মামলাটাকে সঠিকভাবে বিচার করে দিক। তারা রোহিঙ্গাদের সকল অধিকার ফিরিয়ে দেবে এবং রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের বিচারও করবে বলে আশা করছি।

কক্সবাজারের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, আইসিজে’তে শুরু হওয়া বিচার কার্যক্রম রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ কূটনৈতিক সফলতার প্রাথমিক ধাপ। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে।

কক্সবাজার পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল রাইজিংবিডিকে জানান, দুই বছরের বেশি সময় ধরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভারে বিপর্যস্ত কক্সবাজার। আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা নিজদেশ ফিরে যাবে, এটা আশা করি। এক্ষেত্রে মিয়ানমার অতীতের মতো নানা ধরনের টালবাহানা করতে পারে। তাই বিশ্বকে মিয়ানমারের এসব টালবাহানাকে রুখে দিতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে স্বদেশে ফেরত পাঠাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোকে বাংলাদেশ প্রথম কূটনৈতিক সফলতা পেয়েছে।


কক্সবাজার/সুজাউদ্দিন রুবেল/রফিক

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : কক্সবাজার, চট্টগ্রাম বিভাগ