Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৪ ১৪২৮ ||  ০৯ সফর ১৪৪৩

কুমিল্লার নদী-খালে দেশি মাছের আকাল

আবদুর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৭, ২৬ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১১:৫২, ২৬ জুলাই ২০২১
কুমিল্লার নদী-খালে দেশি মাছের আকাল

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ফুলপুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো.দুলাল মিয়া। গ্রামের একটি খালে বেল জাল দিয়ে মাছ ধরছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু বর্তমানে সারাদিন খালে জাল পেতেও পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত দেশীয় মাছের দেখা। চলামান বর্ষা মৌসুমেও প্রায়দিনই শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাকে। এতে দুলালের পরিবারে চলছে চরম দুর্দিন।

শুধু দুলাল একা নয়, নদ-নদী, খাল-বিল এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত দেশীয় মাছ না পেয়ে কুমিল্লার হাজারো জেলের পরিবারে এখন দুর্দিন চলছে। যার কারণে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।

রোববার (২৫ জুলাই) বিকেলে এ প্রতিবেদকের কথা হয় দুলাল মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও গ্রামের খালগুলোতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিলো। কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছের স্বাদও ছিলো দারুণ। কিন্তু এখন আর সেসব দেশীয় মাছের দেখা মেলে না। সারাদিন জাল ফেলে রাখলেও দুই'শ টাকার মাছ পাওয়া যায় না। তিনি পরিবার নিয়ে এখন কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। ভাবছেন সামনে হয়তো তার পেশা পরিবর্তন করবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লায় বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জেলার প্রধান নদ-নদী ও খাল-বিল এবং পুকুর-দিঘি-ডোবা থেকে এরই মধ্যে অন্তত অর্ধশত প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পথে চলে গেছে। গত ১০ বছরের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি প্রজাতির মাছ পুরোপুরিভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যদিও এক সময় কুমিল্লার জলাভূমির দেশীয় মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। পুরো জেলার নদ-নদী-খাল ও জলাভূমিতে ছিলো দেশীয় মাছের প্রাচুর্য।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, মেঘনা, গোমতী, কালাডুমুর, ডাকাতিয়া নদীসহ জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ১৩টি নদ-নদী কুমিল্লার দেশীয় মাছের প্রধান উৎস। ছাড়াও এসব নদীর শাখা, উপ-শাখা ও খাল-বিল প্রাচীনকাল থেকেই দেশীয় মাছের জন্য সম্মৃদ্ধ ছিলো। তবে ফসলী জমিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ভরাট, উন্মুক্ত জলাশয়ে বাঁধ নির্মাণ, কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য পানিতে গিয়ে পড়া, অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহারসহ মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তনের কারণে এখন আর প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ আগের মতো পাওয়া যায় না। এছাড়া কৃষি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে দেশীয় প্রজাতির মা মাছগুলো প্রজনন কিংবা ডিম ছাড়তে পারে না।

এরই মধ্যে ‘নানদিয়া, রিঠা, বাচা, ছেনুয়া, গাওড়া, নাপতিনী, বুইতা’ ইত্যাদি প্রজাতির মাছ এ অঞ্চল থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া ‘বাগাইড়, গোলসা, পাবদা, আইড়, নামাচান্দা, তারা বাইম, বড় বাইম, কালিবাউশ, দাঁড়কিনাসহ প্রায় অর্ধশত প্রজাতির মাছ রয়েছে বিলুপ্তির পথে। এ অঞ্চলে আগে যেসব দেশীয় প্রজাতির মাছ দেখা যেত, তাঁর বেশির ভাগই এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত হাইব্রিড মাছ দিয়েই চাহিদা মেটাতে হচ্ছে জেলার মানুষকে।

দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য চাষ নিয়ে কাজ করছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন সংগঠক কুমিল্লার দাউদকান্দির মতিন সৈকত। তিনি জানান, উন্মুক্ত জলাশয়ে পানি কমে আসলে এক শ্রেণির মানুষ বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করে। আবার অনেকে একই জলাশয় কিছুদিন পর পর পানি সেচ করে শুকিয়ে মাছ ধরে। এছাড়া কৃষি জমিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক মাছের বংশ বিস্তার ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাকৃতিক মাছ রক্ষা করতে হলে, এসব মাছেরও লালন-পালন করতে হবে। মাছকে বেড়ে উঠার সুযোগ দিতে হবে। মাছের প্রতি আমাদের মানবিক হতে হবে।

জেলা সদরের হুমায়ুন কবির, কামাল হোসেন, সামছুল আলমসহ অন্তত ১০ জন জেলে জানান, গত ১০ বছর আগেও কুমিল্লায় যেই পরিমান জেলে ছিলো এখন তার তিন ভাগের এক ভাগও নেই। আগে কুমিল্লার সকল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় দেশীয় মাছে ভরপুর ছিলো। নদীতে জাল ফেললে ২-৩ ঘন্টার মধ্যে নৌকা মাছে ভরে যেতো। কিন্তু এখন সারাদিন নদীতে পড়ে থাকলেও ৩/৪ কেজি দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না। ফলে অনেক জেলে এখন রিকশা, অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

জেলা মৎস কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি আসলেই সত্য। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ দিনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমরা দেশীয় মাছ রক্ষায় প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র বাড়াতে বিভিন্ন কাজ করছি। এসব মাছ রক্ষায় মানুষকে সচেতন করছি।

কুমিল্লা/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়