দুই চাকায় ভর করে চলছে কালামের সংসার
মেহেদী হাসান শিয়াম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আবুল কালাম। তিনি একজন খাবার ব্যবসায়ী। সাইকেলে চড়ে বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেওয়াই তার পেশা। প্রতিদিন কর্ম ব্যস্ততায় শুরু হয় সকাল। দুপুর হলেই খাবারের বাটি হাতে ভোক্তার দরজায় কড়া নাড়েন তিনি।
সেদিন রাতে পাঠান পাড়ায় এক ভোক্তার বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সাইকেলে ৪টি বড় বড় ব্যাগ দেখে এগিয়ে যাই। জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা কী আছে ব্যাগে? তিনি বললেন ব্যাগগুলোতে খাবারের বাটি। শীতের রাতে এতগুলো খাবারের বাটি নিয়ে ঘোরার কারণ জানতে চাইলাম। তখন জানালেন তার জীবনযুদ্ধের গল্প।
কালাম বলছিলেন, অনেক কষ্টে জীবনের একাংশ কাটিয়েছি। কর্মজীবন শুরু হয় প্রবাসীদের মতো। আর্থিক সঙ্কট থাকায় লেখপড়া সেরকম করতে পারিনি। জীবন জীবিকার তাগিদে চলে যাই জেলার বাইরে। সেখানে কর্মের প্রথম ধাপ শুরু হয়। পরিবারের কারণে ওই কর্মস্থল ছেড়ে আসতে বাধ্য হই। তারপর আমার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এক কন্যা ও পুত্র সন্তান রেখে মারা যান। ওই দুজন সন্তানের বিয়ে হয়ে যায়। ছেলেটা প্রবাসে। পরে সংসার চালাতে ফের বিয়ে করি। এখানে এক মেয়ে হয়। তারও বিয়ে হয়ে গেছে।
গত এক বছর ধরে খাবার সরবরাহের কাজ করছেন কালাম। করোনাকালে কারো কাছে হাত না পেতে, নিজেই স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে আমার কাছে প্রায় ৪০ জন খাবার খায়। প্রতিমাসে এতে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করি। ১০/১২ হাজার টাকা লাভ হয়। এখান থেকে যে টাকা লাভ হয়, তাই দিয়ে চলে সংসার।
প্রতিদিনের সকাল কেমন ব্যস্ততায় শুরু হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুপুরের খাবার সরবরাহ করার চিন্তা নিয়েই সকাল শুরু। প্রথম কাজ ফজরের নামাজের পর পরই দুপুরের রান্নার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। আমার গিন্নি আর ছোট মেয়ে দুপুরেরে খাবার প্রস্তুত করার জন্য কাঁচা সবজিগুলো কেটে রান্না চাপান। খাবার রান্না শেষে টিফিন বাটিতে খাবারগুলো রাখার পালা। খেতে খেতে দেরি হয়ে যাবে বলে নিজে না খেয়েই ভোক্তাদের বাড়ি ছুটে যাই। বাড়ি বাড়ি খাবার দিয়ে এসে পরে আমি খাই। আমার দুপুরের খাবার খেতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যায়।
রাতের খাবার দেওয়ার জন্য যেখানে যেখানে দুপুরের খাবার দিয়েছিলাম, সেখান থেকে টিফিন বাটিগুলো সংগ্রহ করার জন্য বের হই। বাটি সংগ্রহ করে রাতের খাবার রান্না করার প্রস্তুতি নেই। রান্না-বাড়ার সব কাজ শেষে রাতের খাবারগুলো ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র কাজ তখন। এভাবেই চলছে জীবন।
কষ্টের জীবন নিয়ে তিনি বলেন, আমার আগের স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তার চিকিৎসার জন্য ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লোন তুলেছিলাম। এ ছাড়াও বিশেষ কিছু কাজের জন্য ব্যাংক থেকে কয়েক লাখ টাকা লোন তুলেছিলাম। এখন লক্ষাধিক টাকা লোন আছে। মাসের লাভের টাকাতে সব খরচ চালাতে হয়। যেভাবে পরিশ্রম করি, কিন্তু সুখের দেখা আর পাই না। সাইকেলের দুইচাকায় ভর করে চলছে জীবন।
মেহেদী হাসান নামের একজন কালামের কাছে খাবার খান। তিনি বলেন, কালাম চাচা প্রতিদিন দুপুর আর রাতে দু’বেলা খাবার দেন। প্রতিবেলা ৫০ টাকা করে নেয়। খাবারের মান বেশ ভালো। প্রতিবেলাই ভাতের সাথে আমিষসহ সবজি থাকে। সপ্তাহে একদিন দুপুরে পোলাও আর গরুর গোস্ত রান্না হয়। সেদিন দুপুরের বিল ১০০ টাকা হয়।
তিনি আরও বলেন, বাইরে হোটেলে খেতে গেলে প্রতিবেলায় ১০০ থেকে দেড়শ টাকা লাগে। কিন্তু চাচা যে খাবারটা দেয়, সে খাবারটা হোটেলের থেকে অনেক ভালো। দামও অনেক কম।
/মাহি/