ঢাকা     শুক্রবার   ০১ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ১৭ ১৪২৯ ||  ০১ জিলহজ ১৪৪৩

ইটভাটায় পুড়ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি 

মাওলা সুজন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৬, ১৩ এপ্রিল ২০২২   আপডেট: ১২:৩১, ১৩ এপ্রিল ২০২২
ইটভাটায় পুড়ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি 

ফসলি জমির পাশে গড়ে ওঠা একটি ইটভাটা

নোয়াখালীতে দিনদিন বাড়ছে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা। জেলায় গড়ে ওঠা এসব বৈধ-অবৈধ দেড় শতাধিক ইটভাটায় অবাধে পুড়ানো হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি। এতে অস্বাভাবিকভাবে কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। ইট বানাতে খনিজ কয়লা ব্যবহারে সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকলেও পোড়ানো হচ্ছে গাছ। 

এছাড়া মাটি আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টরের চাকায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তৈরি করা গ্রামীণ সড়ক। ইটভাটার ধোঁয়ায় ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ।

ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৯ থেকে জানা যায়, ফসলি জমিতে কোনো ইটভাটা তৈরি করা যাবে না। এলজিইডির রাস্তা ব্যবহার করা যাবে না। কাঠ পোড়ানো যাবে না। লাইসেন্স পাওয়ার আবেদনের সঙ্গে ইট প্রস্তুতের মাটির উৎস উল্লেখ করে হলফনামা বাধ্যতামূলক দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত মানমাত্রার অতিরিক্ত সালফার, অ্যাশ, মারকারি বা অনুরূপ উপাদান সম্বলিত কয়লা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। এ আইন অমান্যকারীদের ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

নোয়াখালী রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (এনআরডিএস) প্রধান নির্বাহী আবদুল আউয়াল বলেন, ‘ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন মানছেন না ভাটার মালিকরা। এসব ভাটার মালিকরা তথ্য গোপন করে আধুনিক পদ্ধতিতে ইট উৎপাদনের অনুমোদন নিলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করছেন তারা। মাঝে মধ্যে অবৈধ ইট-ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা আদায় করলেও থামানো যাচ্ছেনা ভাটা মালিকদের কার্যক্রম।’

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীতে ১৫৪টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ ভাটার সংখ্যা ৬৭টি। অবৈধ ভাটা রয়েছে ৮৭ টি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইটভাটার কারিগরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি কাঁচা ইট তৈরিতে মাটি লাগে ০.০৮৫ ঘনফুট। প্রতি বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিটি ভাটায় কমপক্ষে গড়ে ৮ রাউন্ড ইট পোড়ানো হয়। প্রতি রাউন্ডে ১০ লাখ ইট থাকে। একটি ভাটায় বছরে কমপক্ষে ৮০ লাখ ইট পোড়ানো হয়। ভাটা কারিগরদের হিসেবে জেলায় ১৫৪টি ইটভাটায় বছরে প্রায় ১২৪ কোটি ইট তৈরিতে প্রায় ১১ কোটি ঘনফুট মাটি ব্যবহার করা হয়। 

এছাড়া ইটভাটা স্থাপনে অনুমোদিত জমি ৩ একর হলেও ভাটার মালিকরা ব্যবহার করছেন কমপক্ষে ৯-১০ একর। সে হিসেবে ইটভাটার নিচে চলে গেছে প্রায় দেড় হাজার একর জমি।

জেলার সুবর্ণচর উপজেলার কয়েকেজন বাসিন্দা জানান, ইটভাটার ক্ষতিকর ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টসহ জটিল রোগে ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও গাছের ফল ফলাদির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এই উপজেলায় নষ্ট হচ্ছে প্রায় একশ কিলোমিটার গ্রামীন সড়ক। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের নোয়াখালী আঞ্চলিক অফিস, উপজেলা কৃষি অফিস, বন বিভাগ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে দায়ী করছেন তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিদর্শন না করেই ছাড়পত্র দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর, তিন ফসলি জমিকে অনাবাধি দেখিয়ে ছাড়পত্র দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘কিছু ইটেরভাটা পরিবেশ ছাড়পত্র, কৃষি বিভাগের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, বিএসটিআই ইত্যাদির অনুমোদন কাগজে বৈধ। অথচ বৈধ ও অবৈধ সবারই ইট তৈরি প্রক্রিয়া, ভাটা স্থাপন এলাকা, জ্বালানি ব্যবহার, মাটি সংগ্রহ প্রক্রিয়া সবই অবৈধ।’

সুবর্ণচর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা চৈতি সর্ববিদ্যা বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেননি। ইটভাটার অনুমোদন ও বৈধ অবৈধতা জেলা প্রশাসন দেখেন। এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই।‘

নোয়াখালী সদর উপজেলার চরমটুয়া ইউনিয়নের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, ‘আমার ক্ষেতের পাশে ইটের ভাটা। রাতদিন সেখানে পুড়ছে ইট, উড়ছে ধোঁয়া আর গ্রামের প্রতিটি কাঁচা-পাকা সড়কে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাটিবাহী  ট্রাক্টর যাতায়াত করছে। ভাটার ধোঁয়া, ধুলোবালি এবং গাড়ি চলাচলে গ্রামবাসী অসহায় হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন প্রতিটি ভাটায় কমপক্ষে ৩০-৪০ ট্রাক্টর মাটি যাচ্ছে। গ্রামজুড়ে যেনো মাটি কাটার উৎসব চলছে।’

এ বিষয়ে চরমটুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কামাল উদ্দিন বাবলুর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন ও বার্তা দেওয়া হলে তিনি উত্তর দেননি।

নোয়াখালী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ইটভাটার বিষয়টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়ন্ত্রণ করেন। উনাদের ম্যাজিস্ট্রেট, র‌্যাব, পুলিশ সব আছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছুই নাই, আমরা উনাদের সহযোগী হিসাবে কাজ করি। অনেকে না জেনেই আমাদের ওপর দায় চাপায়।’

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরিদ মিয়া বলেন, ‘ইটভাটায় জ্বালানি হিসাবে কাঠ বা লাকড়ি ব্যবহার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে আমরা তাদের সহযোগিতা করে থাকি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো.শহিদুল হক বলেন, ‘আমরা চাইনা ইটেরভাটা হোক। তারপরও জেলা প্রশাসন অনুমোদন দিলে আমাদের তো কিছু করার থাকেনা। ফসলি জমিতে ইটভাটার জন্য কোন ছাড়পত্র না দিতে আমাদের নির্দেশনা আছে।’

নোয়াখালী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইকরামুল হক বলেন, ‘গ্রামীণ সড়কগুলো ইটভাটার মাটি পরিবহনের ট্রাক্টরের  কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা কিভাবে এটা বন্ধ করবো? ইটভাটা অনুমোদনের জন্য যে কমিটি আছে তাতে তো স্থানীয় সরকার বিভাগের কেউ নেই।’

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সব উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ এবং ছাড়পত্র নবায়নহীন ইটভাটায় ধারাবাহিকভাবে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। এরপরও অবৈধ এবং ছাড়পত্র নবায়নহীন ইট ভাটা নিয়মের মধ্যে না আসলে ওই ভাটাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

নোয়াখালী/ মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়