ঢাকা     বুধবার   ২৯ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১৫ ১৪২৯ ||  ২৮ জিলক্বদ ১৪৪৩

ধানের বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:১৭, ২২ মে ২০২২   আপডেট: ০৯:১৮, ২২ মে ২০২২
ধানের বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের

বিধবা কৃষাণী কেডু বেগম। টাঙ্গাইল পৌরসভার কাগমারা এলাকায় তার বাড়ি। চলতি বোরো মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে তিনি বর্গা চাষ করেছেন। অতিরিক্ত শ্রমিকের মজুরির কারণে তিনি ধান কেটে শেষ করতে পারেননি। কিছু ধান নিজে কাটলেও বৃষ্টির কারণে সময় মতো তা গোলায় তুলতে পারেননি। যে পরিমাণ ধান পেয়েছেন তাতে খরচ বাদে তেমন লাভ হবে না। 

কেডু বেগম বলেন, ধানের বীজ, হাল চাষ, সারের দাম বেশি। আবার শ্রমিকের দাম প্রায় দ্বিগুণ। অপর দিকে ফলনের অর্ধেক জমির মালিককে দিতে হবে। আবার বৃষ্টির কারণে সময়  মতো ধানও গোলায় তুলতে পারিনি। সব মিলে খুব খারাপ অবস্থায় আছি। 

শুধু কেডু বেগম নয়, ফলন ভালো হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ার কারণে টাঙ্গাইলের কৃষকদের মুখে হাসি নেই।

কৃষকরা জানান, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে ধানের বীজ, হাল চাষ, সার, শ্রমিক মিলিয়ে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এক বিঘা জমিতে সেচ পাম্প মালিকের ভাগ বাদ দিয়ে প্রায় ১৮ মণ ধান পাওয়া যায়। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধানের মূল্য ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। এতে করে তিন মাস পরিশ্রম করেও কৃষকের তেমন কোনো লাভ থাকছে না। দাফায় দফায় বৃষ্টির কারণে অনেকের ধান ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। এলাকাভেদে তিন বেলা খাবারসহ ধানকাটা শ্রমিকের মজুরি ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্র জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে এক লাখ ৭১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে চাষ হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। পোকা মাকড়ের আক্রমণ না থাকা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অন্য বছরের তুলনায় ফলন ভালো হয়েছে।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর ও কালিহাতী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ধান ক্ষেতে অনেক পানি জমে আছে। আবার নিচু ক্ষেতগুলোতে হাটু পানি জমে আছে। শ্রমিকরা পানির মধ্যেই ধান কাটছেন। অনেক ধান আবার পাকার আগেই ঝড়ে ক্ষেতেই নষ্ট হয়েছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন, শুকনার সময় বিঘা প্রতি ধান কাটা, আনা ও মাড়াই করতে আটজন শ্রমিক লাগলেও ক্ষেতে পানি থাকায় ১০ জন শ্রমিক লাগছে। এতে করে কৃষকের সময় ও টাকা বেশি লাগছে।

সদর উপজেলার বাইমাইল গ্রামের কৃষক ইনছান আলী বলেন, অন্যবছর খরচ বেশি হলেও শান্তিতে ধান গোলায় তুলতে পারছি। কিন্তু এবছর ১০/১২ দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। রোদ না থাকায় আমার প্রায় ৬০ মণ ধান ভালোভাবে শুকাতে পারিনি।

কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা এলাকার কৃষক হারেজ মিয়া বলেন, শ্রমিক প্রতি ১১০০ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটতে হয়েছে। ধান চাষ করে বিঘা প্রতি আমার তিন হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলার আউলিয়াবাদ গ্রামের কৃষক তুলা মিয়া বলেন, পানিতে ধান কাটার কারণে মজুরি বেশি। ১২০০ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটছি। এছাড়া, তিন বেলা খাবার দিতে হচ্ছে।

পঞ্চগড় থেকে আসা শ্রমিক সুভাষ চন্দ্র ও কালিপদ সাহা বলেন, আমাদের এলাকায় খাবার ছাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি। কিন্তু টাঙ্গাইলে কাজ করছি তিন বেলা খাবারসহ ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়। যে দিন চাহিদা বেশি থাকে ওই দিন মজুরি বেশি হয়। যে কারণে দূর থেকে টাঙ্গাইলে ধান কাটতে আসি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক মো. আহসানুল বাসার বলেন, চলতি মৌসুমে বোরোর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। রোগ ও পোকার আক্রমণ ছিলো না বললেই চলে। আশা করি, ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এখন যেভাবে ধান কাটা চলছে তাতে আগামী সাত দিনের মধ্যে শতভাগ কাটা শেষ হবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় শ্রমিকের মূল্য বেশি হওয়ায় কৃষকরা একটু সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৫০ শতাংশ ভর্তুক্তিতে ৫০টি কোম্বাইন হারভেস্টার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। সেগুলো ধান কাটার কাটার কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া আশেপাশের জেলা থেকে মেশিন এনে ধান কাটা হচ্ছে।

কাওছার আহমেদ/ইভা 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়