ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৬ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১৩ ১৪৩২ || ৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

কাশেম ছিল এতিম কিশোর, দাফন করবে এলাকাবাসী

রেজাউল করিম, গাজীপুর  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৫০, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫   আপডেট: ২২:০৫, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
কাশেম ছিল এতিম কিশোর, দাফন করবে এলাকাবাসী

সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলায় আহত আবুল কাশেম বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আবুল কাশেম ছিল এক এতিম কিশোর। তার মা নিখোঁজ রয়েছেন ১৫ বছর ধরে, বাবাও কবরদেশে ঘুমিয়ে আছেন ৬ বছর হলো। তবু জীবন চালিয়ে নিচ্ছিল এই কিশোর। একাই সামলাচ্ছিল বাড়ি। এই এতিম কিশোরের মৃত্যুর খবরে এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশবাসী ছাড়া মা ও বাবা হারানো এই কিশোরের দাফনের জন্য, তার রুহের শান্তির জন্য দোয়া করার আর কেউ নেই। 

আবুল  কাশেমের বয়স ১৭ বছর। গাজীপুর মহানগরীর দক্ষিণ কলমেশ্বর এলাকার মৃত জামান হাজীর ছেলে সে। বুধবার বেলা ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

বিকেলে কাশেমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করছে। কোথায় কবর খোঁড়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা করছে। বাবা-মা ও ভাই না থাকায় এলাকাবাসী তার মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার চাচি বিপাল করে বলছিলেন, এই দেশ ছাড়া এতিম কাশেমকে দাফন করার, তার জন্য দোয়া করার কেউ রইল না। 

কাশেমের বাড়িতে ভিড় করা শোকাহত মানুষের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, কাশেম এতিম। তার বাবা মারা গেছেন ছয় বছর আগে। তার মা হারিয়ে গেছেন; তার খোঁজ নেই ১৫ বছর হলো। বড় ভাই গত বছর জুলাইয়ে মারা গেছেন। 

সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হয় আরো কাশেমের কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুইটি নামে কাশেমের এক ছোট বোন আছে। সে তাদের এক আত্মীয়ের বাসায় থাকে। 

যার সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি-ই বলেছেন, কাশেম ছিল স্পষ্টভাষী ছেলে। একাই বাড়িতে থাকত; পাশের অনুশীলন প্রি- একাডেমি স্কুলে পড়াশোনা করত। জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে মিছিল-মিটিং যেত সে। সে কথা এলাকার সবাই জানত। সদালাপি ও বিনয়ী ছেলে ছিল সে। 

আবুল কাশেমদের বাড়ির সামনে কথা হয় তার চাচি সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে। ছবি: রাইজিংবিডি


কাশেমদের বাড়ির সামনে কথা হয় তার চাচি সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে । তিনি বলেন, “শুক্রবার বিকেলে বাসার সামনে বসে আছি। ও বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। সন্ধ্যার পরে শুনলাম ছাত্রদের সাথে কোথায় যেন গেছে। এরপরে তো আহত অবস্থায় হাসপাতালে। বাবা-মা নেই ওর। ওর মৃত্যুতে কাঁদার মতো কেউ নেই দেশবাসী ছাড়া। ওর মৃত্যুতে যারা দায়ী, তাদের বিচার চাই।

কাশেমের দূর সম্পর্কের দুলাভাই সজিব আহমেদের শাহিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “একসাথে আমরা চলাচল করতাম। শুক্রবার রাতে কাশেমের আহত হওয়ার খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে যাই। আমাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, বলে, শাহিন ভাই আমাকে অনেক মার মেরেছে। আমাকে বাঁচাও।”

“আমি কিছু করি নাই, ছাত্ররা ফোন দিছে; পরে আমি আইছি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। এরপর আর কথা বলতে পারিনি ও, ইনজেকশন দিয়ে ঢাকার হাসপাতালে নিয়ে যায়। কেউ ছিল না; একা একা হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করেছি। আজ ওর মৃত্যু হয়েছে; এই মৃত্যুর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের বিচার চাই।”

আবুল কাশেমের মৃত্যুর পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গাজীপুর শাখার আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মুহন জানান, বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে আবুল কাশেমের দুটি জানাজা হবে।  সাড়ে ১০টায় রাজবাড়ী মাঠে প্রথম এবং বেলা সাড়ে ১১টায় মহানগরীর বোর্ড বাজার-সংলগ্ন আল-হেরা সিএনজি পাম্প মাঠে আবুল কাশেমের দ্বিতীয় জানাজা হবে। সেখানে থেকে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হবে।

আবুল কাশেমের বাড়ির সামনে শোকাহত এলাকাবাসী। ছবি: রাইজিংবিডি


আবুল কাশেমকে শহীদ বর্ণনা করে আব্দুল্লাহ বলেন, গাজীপুরের শহীদ কাশেমকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা হত্যা করেছে। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।

আবুল কাশেম (১৭) গাজীপুর মহানগরীর দক্ষিণ কলমেশ্বর এলাকার জামান হাজীর ছেলে। বুধবার বেলা ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এতিম এই কিশোরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুরে ক্ষোভ দেখা যায়। তার এই মৃত্যু কোনোভাবে মেনে নিতে পারছে এলাকার মানুষ।

গত শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে গাজীপুর মহানগরীর ধীরাশ্রম দক্ষিণখান এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে গেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলা হয়। তাদের আটকে রেখে মারধর করা হয়। এতে আহত হন ২০ জন শিক্ষার্থী, যার মধ্যে গুরুতর জখম হন আবুল কাশেম। তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

এ ঘটনার পরদিন শনিবার আব্দুল্লাহ বাদী হয়ে গাজীপুর সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় ২৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ২০০ থেকে ৩০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি আমজাদ হোসেন মোল্লা, যিনি আওয়ামী লীগের একজন কর্মী।

ঢাকা/রেজাউল/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়