ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৬ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১৩ ১৪৩২ || ৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ঈদে ‘ঈদ কার্ড’ এখন হারিয়ে গেছে

কাঞ্চন কুমার, কুষ্টিয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৩৯, ৩০ মার্চ ২০২৫   আপডেট: ২১:৪১, ৩০ মার্চ ২০২৫
ঈদে ‘ঈদ কার্ড’ এখন হারিয়ে গেছে

‘‘আট-দশ বছর আগেও ঈদ এলে দোকানে সাজানো থাকতো বাহারি রঙের ঈদ কার্ড। সেগুলো পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকায় বিক্রি হতো। নানা বয়সী মানুষের ব্যাপক চাহিদা ছিল ঈদ কার্ডে। এখন মানুষ আর ঈদ কার্ড কেনে না। মোবাইলে শুভেচ্ছা ও ভাবের আদান-প্রদান করে।’’

রবিবার (৩০ মার্চ) দুপুরে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা বাজারের সামাদ কসমেটিকসের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, ‘‘প্রায় ৪০ বছর ধরে কসমেটিকসের ব্যবসা করছি। আমার দোকানে অন্তত দুই হাজার ধরনের পণ্যের পসরা রয়েছে। তবে সেখানে ঈদ কার্ড নেই।’’ 

তিনি বলেন, ‘‘বন্ধু তুমি অনেক দূরে, তাইতো তোমায় মনে পড়ে; সুন্দর এই সময় কাটুক খুশিতে, সব কষ্ট ভুলে যেও আপনজনের হাসিতে।’ ‘বাকা চাঁদের হাসিতে, দাওয়াত দিলাম আসিতে; আসতে যদি না পার, ঈদ মোবারক গ্রহণ কর।’ ঈদ ঘিরে প্রায় এক যুগ আগেও এসব বাণী লেখা ঈদ কার্ডের জন্য অধীর আগ্রহে সময় গুনত প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধবরা। কে কাকে আগে ঈদের কার্ড দেবে, এ নিয়েও চলতো প্রতিযোগিতা। প্রিয়জনের ঈদ কার্ড ছাড়া যেন ঈদের আনন্দ জমতো না। তবে কালের বিবর্তনে আর মোবাইলের ফোনের কাছে হেরে গেছে বন্ধু ও প্রিয়জনদের প্রতি আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের এই মাধ্যম। এখন হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে চলছে কৃত্রিম অনুভূতির আদান-প্রদান।’’ 

আমলা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. নাজিম সুলতান বলেন, ‘‘ছোটবেলায় ঈদ আসার আগে কার্ড কেনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। খুব কাছের বন্ধু-বান্ধবীদের কার্ড দিতাম। অনেক সময় শত্রুদেরও দিতাম। কার্ড না দিলে বন্ধুরা অভিমান করে থাকতো। কার্ড ছাড়া যেন ঈদই হতো না।’’ 

আমলা বাজারের ফুলবারী স্টোর, আদর্শ লাইব্রেরি, সামাদ কসমেটিকস, আমিরুল স্টোর, টুটুল স্টোর, রনি কম্পিউটারসহ অন্তত ২৫টি কসমেটিকস দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দোকানে সাজানো হাজারো পণ্যের পসরা রয়েছে। তবে সেখানে ঈদ কার্ড নেই।

রনি কম্পিউটারের স্বত্বাধিকারী হারুনার রশিদ রনি জানান, অনেক বছর হলো ক্রেতারা ঈদ কার্ড চান না। বিক্রিও হয় না। সেজন্য এগুলো আর দোকানে তোলা হয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘‘১০-১৫ বছর আগেও ঈদ কার্ডের প্রচলন ছিল। ছোটবেলায় অনেক কার্ড পেয়েছি।’’ 

কুষ্টিয়া সরকারী মহিলা কলেজের অর্নাসের ছাত্রী রত্মা খাতুন জানান, তিনি ঈদ কার্ড কী জানেন না। কখনো দেখেননি। কোনোদিন চিঠিও লেখা হয়নি।

কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস জানান, নব্বইয়ের দশকে ঈদকার্ডের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। কার্ড কেনার জন্য সারা বছর এক-দুই টাকা করে গোছানো হতো। ঈদ কার্ড সংগ্রহ করে তাতে নিজস্ব অথবা কোনো বিখ্যাত কবির কয়েকটি লাইন লিখে প্রিয়জনকে দাওয়াত দেওয়া হতো। তবে মোবাইলের কারণে ঈদ কার্ড আর চলে না। বাঙালির সংস্কৃতি হিসেবে পুনরায় ঈদ কার্ড চালু হওয়া দরকার।

অনলাইনে দেখে অনুপ্রেরিত হয়ে এবার বেশকিছু ঈদ কার্ড কিনে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নূর ই সিয়াম উচ্চারণ। তিনি জানান, ২০১৩ সালের দিকে চাচাত বোন প্রথম ঈদ কার্ড দিয়েছিল। আর দেওয়া-নেওয়া হয়নি। তবে প্রিয়জনদের দেওয়ার জন্য এবার বেশ কিছু কিনেছেন। প্রাচীন এই সংস্কৃতি আবারও ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ভেড়ামারা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘‘কাগজে-কলমে লিখে মনের যে ভাব প্রকাশিত হয়, তা যান্ত্রিকরণের মাধ্যমে হয় না। একটা সময় হালখাতা কার্ডের প্রচলন ছিল। তেমনিভাবে ঈদে ঈদ কার্ড ছিল। এখন কালের বিবর্তনে সবই হারিয়ে গেছে। তবে নতুন প্রজন্মের মাঝে প্রাচীন এ সব সংস্কৃতি আবারও জাগ্রত করা উচিত।’’ 

ঢাকা/বকুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়