ঠাকুরগাঁও-১
ফখরুলের আসনে জয় পেতে চান দেলাওয়ার
মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল, ঠাকুরগাঁও || রাইজিংবিডি.কম
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দেলাওয়ার হোসেন।
দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও। আর এই জেলার সদর উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও–১ সংসদীয় আসনে নির্বাচনি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. দেলাওয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের ঠাকুরগাঁও জেলার সহ-সভাপতি হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম এই আসনে লড়বেন। তবে ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদ্বয়।
শুধু ঠাকুরগাঁওয়ে নয়, পুরো দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার পাল্টে গেছে নির্বাচনি চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে ঠাকুরগাঁও–১ আসনকে উত্তরাঞ্চলের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে এই আসন ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঠ। তবে এবারের নির্বাচনে প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আসনে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে সরব রয়েছেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট ও দোয়া যাচ্ছেন।
এ আসনে ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগরের শুরা সদস্য দেলাওয়ার হোসেন এবার নতুন মুখ হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন পেয়েছেন। দলীয় ব্যানারে—জনসংযোগ ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি সামনে রেখে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
ঠাকুরগাঁও–১ আসনে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের ঠাকুরগাঁও জেলার সহ-সভাপতি হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম দলের প্রার্থী হয়ে এই আসনে লড়ছেন। তিনি তাদের এজেন্ডা নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও–১ থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ১৯৯১ সালে পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে যথাক্রমে ৩৬ হাজার ৪০৬ ও ৫৮ হাজার ৩৬৯ ভোট পান এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী খাদেমুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ১ হাজার ৩৪ হাজার ৯১০ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ক্ষমতায় এলে ঠাকুরগাঁওয়ের সার্বিক উন্নয়নসহ বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা পুরোপুরি বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অঙ্গীকার করছেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলছেন, এটাই হয়ত তার জীবনের শেষ নির্বাচন; তাই আগামীর বাংলাদেশকে সুখী, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও উন্নত দেশ গড়তে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত হয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
দেলাওয়ার হোসেন বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নাম। স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে যখন দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেই আন্দোলনের সরাসরি নেতৃত্ব দেন তিনি। এ জন্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। দিনের পর দিন পুলিশের রিমান্ডে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে।
জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, এই আসনের মানুষ এবার তাকে বেছে নেবেন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং প্রতিযোগী হিসেবে দেখেন। জামায়াত ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও আধুনিক ঠাকুরগাঁও গঠনে কাজ করবেন। নির্বাচনে জয়-পরাজয় যাই হোক, মানুষের চাওয়া-পাওয়া বাস্তবায়নে চেষ্টা করবেন। তারমতে, তিনি মানুষের শাসক নন, সেবক হতে চান।
নির্বাচনের আরেক নতুন মুখ বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম। তিনি ছাত্রজীবন থেকে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার এবং ইসলাম প্রচারের কাজে সক্রিয় ছিলেন। এবার দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচনি মাঠে তিনি একেবারে নতুন মুখ।
নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশ এখন ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, যেহেতু এটি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এলাকা। তিনি দলমত নির্বিশেষে একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। পাশাপাশি নির্যাতিত ছাত্রশিবির নেতা দেলাওয়ার হোসেনও মানুষ হিসেবে ভালো। এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও প্রতিযোগিতা করা তাঁর জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। নতুন হলেও তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করেন।
তিনি আরো বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কৃষির উন্নয়ন, শিক্ষা, বিমানবন্দর চালু, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার, শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার অঙ্গীকার। ইসলামী আন্দোলন ইসলাম, আদর্শ ও মানবতার কাজ করে যাচ্ছে। মানুষ যদি দলের নীতি ও আদর্শ বুঝতে পারে, তাহলে তারা অন্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। ইসলামী আন্দোলন যেমন ইসলামকে লালন করে, তেমনি দেশকেও ভালোবাসে, তাদের দেশপ্রেম অন্যদের তুলনায় অনন্য।
স্থানীয় ভোটার নিশাত তাসিম, রেজু হাসান, বজলুর রহমান, মাসুকুল আলম, রিফাত, রোহান ও জহির বলেন, এখন রাজনীতির চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষ আর শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা নিরাপত্তা ও সুশাসনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যিনি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারবেন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দিতে পারবেন, ভোটাররা তাকে সমর্থন দেবেন বলে তারা জানান।
তারা আরো বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় ঠাকুরগাঁও–১ আসনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং ভোটারদের সামনে বিকল্প নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ভোটই এবার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন। তাদের ভাষায়, তরুণরা এবার আবেগ নয়, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে ভোট দেবে।
স্থানীয় ভোটার মাহামুদা মুন্না বলেন, আগে ভোট মানেই ছিল সংঘাতের ভয়। তবে এখন সবাই আশা করছে এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, ভোটাররা চাইছেন ভোটের দিন যেন কোনোরকম সহিংসতা না ঘটে এবং সবাই নিরাপদে ভোট দিতে পারে।
ভোটারদের মতে, এবার ঠাকুরগাঁও–১ আসনে লড়াই হবে জনপ্রিয়তা, সততা ও নেতৃত্বগুণের ওপর ভিত্তি করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দেলাওয়ার হোসেনের তরুণ প্রভাব—দুজনই ভোটারদের আলোচনায় থাকবে। হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলামও ভোটারদের মনে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমীন বলেন, ঠাকুরগাঁও–১ আসনের মানুষের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। এই আসনে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ— এমন কেউ নেই, যিনি তাকে চেনেন না। এলাকার সংখ্যালঘু ভোটাররাও কখনো সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে ছিলেন না। ফলে সাম্প্রদায়িক দলগুলো সংখ্যালঘু ভোট তেমনভাবে টানতে পারবে না। এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ বিএনপির পক্ষে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪ হাজার ৮৩৮ জন। তার মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৮ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫১ হাজার ১৯৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৪ জন। নতুন ভোটার ২৪ হাজার ২৩৪ জন।
ঠাকুরগাঁও–১ আসনে বিগত সংসদ নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যরা হলেন— ১৯৮৬ সালে: খাদেমুল ইসলাম (জাতীয় পার্টি), ১৯৮৮ সালে: রেজওয়ানুল হক ইদু চৌধুরী (জাতীয় পার্টি), ১৯৯১ সালে: খাদেমুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ), ১৯৯৬ সালে (ফেব্রুয়ারি): মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বিএনপি), ১৯৯৬ সালে (জুন): খাদেমুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ), ১৯৯৭ (উপনির্বাচন): রমেশ চন্দ্র সেন (আওয়ামী লীগ), ২০০১ সালে: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বিএনপি), ২০০৮ সালে: রমেশ চন্দ্র সেন (আওয়ামী লীগ), ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে: রমেশ চন্দ্র সেন (আওয়ামী লীগ, বিতর্কিত নির্বাচন)।
ঢাকা/বকুল