ঢাকা     শনিবার   ০৭ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২২ ১৪৩২ || ১৭ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সাদা মার্বেলের অপূর্ব স্থাপত্য আল-আমান বাহেলা মসজিদ

অদিত্য রাসেল, সিরাজগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৪৭, ৬ মার্চ ২০২৬  
সাদা মার্বেলের অপূর্ব স্থাপত্য আল-আমান বাহেলা মসজিদ

আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ।

সাদা মার্বেলের ঝলমলে আভা, দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ আর আকাশছোঁয়া মিনারের সমন্বয়ে সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও ইসলামিক নকশার মিশেলে নির্মিত এই মসজিদটি এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং স্থাপত্য সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ দেখতে আসেন মসজিদটির সৌন্দর্য। তারা বিমোহিত হন এর গঠন কাঠামো নিয়ে।

সাদা মার্বেলে মোড়া বিশাল গম্বুজ এবং সুউচ্চ মিনারগুলো সূর্যের আলো পড়লে ঝলমল করে ওঠে। ভোরের কোমল আলো কিংবা বিকেলের শেষ রোদে মসজিদটির সৌন্দর্য আরো বেশি ফুটে ওঠে, যা দর্শনার্থীদের মনে আলাদা এক প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করে।

আরো পড়ুন:

স্থানীয়রা জানান, বেলকুচি উপজেলার মনোরম পরিবেশে নির্মিত এই মসজিদটি এলাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। সিরাজগঞ্জ-এনায়েতপুর আঞ্চলিক সড়কের মুকন্দগাঁতী নামক স্থানে অবস্থিত এই মসজিদ আধুনিক নির্মাণশৈলী এক অনন্য দৃষ্টান্ত। 

মসজিদ কমিটি সূত্র জানায়, মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী সরকার, তার ছেলে আল-আমান ও মা বাহেলা খাতুনের নামে ‘আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ’ কমপ্লেক্স নামে ২০১৬ সালে নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০২০ সালের আগস্ট মাসে শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকারের মৃত্যু হয়। পরে তার ছেলে আল-আমান মসজিদটির কাজ এগিয়ে নেন। ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল জুমার নামাজের মধ্যদিয়ে মসজিদটি উদ্বোধন হয়।

প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মসজিদের নির্মাণকাজে ৪৫ জন শ্রমিক যুক্ত ছিলেন। মসজিদ নির্মাণে নিজস্ব পরিকল্পনা ব্যবহার করেন শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকার। 

১১০ ফুট উঁচু মিনার ও ৩১ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা মসজিদের প্রতিটি দেওয়ালই যেন স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব নির্দশন। মিনারসহ মসজিদের বিভিন্ন দেওয়ালে খচিত আছে আয়াতুল কুরসি, সুরা আর রহমানসহ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরার আয়াত। ছোট ছোট গম্বুজ, মিনারের ভাঁজ, নামাজের জায়গায় থাকা সৌন্দর্য খচিত টাইলস, দেওয়ালে ব্যবহৃত রং-বেরঙের পাথর, সবমিলিয়ে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা অপরূপ ছবি। আঞ্চলিক সড়কের পাশে থাকা মসজিদ কমপ্লেক্সে ঢুকলেই নাকে ভেসে আসে ফুলের সুগন্ধ।

মসজিদটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে সাত হাজার লোক নামাজ পড়তে পারেন। মুসল্লির সংখ্যা বেশি হলে ভেতর এবং আঙিনা মিলিয়ে নামাজ পড়তে পারেন প্রায় ৮ হাজার মুসল্লি। এতে ইতালি ও ভারত থেকে আনা উন্নতমানের মার্বেল পাথরসহ কাঠের কারুকাজে মসজিদের বিভিন্ন স্থানকে আকর্ষণীয় করতে নান্দনিক নকশার কাজ করা হয়েছে।

মসজিদের খাদেম আব্দুল মান্নান বলেন, ‍“২০২৪ সালের ২ এপ্রিল জুমার নামাজের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হয় মসজিদটি। দুজন ইমাম, চারজন খতিব ও ছয়জন খাদেমসহ একটি পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই মসজিদে ছাই রঙের বিশালাকৃতির মনোরম একটি গম্বুজ আছে। এছাড়া মেঝেতে সাদা রঙের ঝকঝকে টাইলস ও পিলারগুলো মার্বেল পাথরে জড়ানো। তৃতীয় তলায় গম্বুজের সঙ্গে লাগানো ছাড়াও অন্যান্য স্থানে চীন থেকে আনা বেশ কয়েকটি আলো ঝলমল ঝাড়বাতি আছে। দুপাশে নির্মাণাধীন ১১ তলা সমতুল্য (১১০ ফুট) উচ্চতার মিনার থেকে আজানের ধ্বনি জমিনসহ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।”

আব্দুল মান্নান বলেন, “অনেক দূর থেকেই মসজিদের গম্বুজ ও মিনার দুটি সবার দৃষ্টি কাড়ে। এই মসজিদের চারপাশে সাদা রঙের পিলার, সুউচ্চ জানালা, সাদা রঙের টাইলস। মসজিদ চত্বরে পরিকল্পিতভাবে লাগানো সবুজ ঘাস। চারপাশে রং-বেরঙের লাইটিংয়ে রাতের বেলা অন্যরকম আবহের সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে বেশ শান্ত পরিবেশ। এ কারণে সামনের সদা ব্যস্ত সড়কের কোলাহল যেন স্পর্শ করে না মসজিদটিকে।”

মসজিদ নির্মাণকালীনে দায়িত্বে থাকা আলমগীর হোসেন বলেন, “ইমাম ও মুয়াজ্জিনের থাকার জন্য মসজিদের পাশে নিজস্ব কোয়ার্টার, পাঠাগার ও শৌচাগার রয়েছে। সেই সঙ্গে মুসল্লিদের কথা বিবেচনা করে মসজিদের প্রবেশপথের দুই সিঁড়ির পাশে একদম কাঁচে ঘেরা অটোফিল্টার করা পানি দিয়ে ওজুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটি নিছক উপাসনালয় নয়। দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে মসজিদের নির্মাণশৈলী বেশ আকর্ষণীয়। ব্যস্ত সড়কে যাতায়াতকারী যে কেউ প্রথম দেখাতেই থমকে দাঁড়ান। সব মিলে দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদ ঘিরে এ অঞ্চলে লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে।”

আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদের (খতিব) ড. খলিলুর রহমান জানান, নান্দনিক স্থাপত্য আর ধর্মীয় আবহ মিলিয়ে এই মসজিদ এখন শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং হয়ে উঠেছে আধ্যাত্মিক ও স্থাপত্য সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। আধুনিক নির্মাণশৈলী এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে তৈরি হওয়ায় মসজিদটি আলাদা বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। গম্বুজের নকশা, মিনারের অনুপাত এবং মার্বেলের ব্যবহার পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানের এক নান্দনিকতা। সেই সঙ্গে ভোরের আলো কিংবা বিকেলের শেষ রোদে দেখা হোক, সাদা মার্বেলের এই মসজিদ সকলের মনে রেখে যায় এক অনন্য প্রশান্তির অনুভূতি।

ঢাকা/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়