বরগুনায় বাড়ছে হামের সংক্রমণ
ইমরান হোসেন, বরগুনা || রাইজিংবিডি.কম
বরগুনার একটি হাসপাতালে এক শিশুকে হামের টিকা দিচ্ছেন নার্সরা।
দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় তুলনামূলকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দিয়েছে। ইপিআইয়ের হিসাবে, সারাদেশের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি বরগুনা সদর উপজেলায়।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য বলছে, চলতি এপ্রিল মাসে বরগুনায় হামে আক্রান্ত শিশু শনাক্ত হয়েছে ৩৮ জন। চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৪ দিনে হাসপাতালে সন্দেহজনক ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২৪৭ জন। তাদের মধ্যে সব থেকে বেশি বরগুনা সদরে ২১৩ শিশু। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৭৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৮ শিশু।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে হাম আক্রান্ত কয়েকজন শিশুর স্বজনরা জানান, হামের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সন্তানদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
বরগুনা সদরের লাকুরতলা এলাকার ৭ মাসের শিশু রিসাদ হোসেন হামে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হয় গত বৃহস্পতিবার। তার বাবা সামসুল হক বলেন, “হামের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসক দ্রুত ভর্তি করাতে বলেন। পরীক্ষা করানোর পর ওর শরীরে হাম শনাক্ত হয়।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেকেই ওষুধ কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।”
সদরের কেওড়াবুনিয়া এলাকার সাফিন আহমেদের দেড় বছরের শিশু সাজ্জাদ আহমেদ হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সাফিন আহমেদ বলেন, “বরগুনা সদর হামের হটস্পট ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক ছিলাম আমরা। বাইরের কোনো শিশুর সংস্পর্শে যাইনি আমরা। তারপরও আমার বাবু আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর থেকে এখন সে কিছুটা সুস্থ, তবে আতঙ্ক কাটেনি এখনো।”
এদিকে, সদরের ধূপতি এলাকার পাশাপাশি পরিবারের চার শিশু বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে হামের লক্ষণ নিয়ে। তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এই চার শিশুর বয়স ৮ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রেজয়ানুর আলম রাইজিংবিডিকে বলেন, “হামে আক্রান্ত এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশু রোগীর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওষুধের কিছু সংকট আছে। আমরা শিশু বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করছি।”
হামের প্রকোপ রোধে নানামুখী উদ্যোগের কথা বলেন বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, “হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন স্কুলে অভিভাবক সমাবেশ ডেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। এছাড়া, গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকায় ফেস্টুন ও লিফলেট বিলি করে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “প্রতিদিন হামের টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আশা করছি, এই মাসের মধ্যে হাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।”
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন মোবাইল ফোনে বলেন, “বরগুনায় হামের সংক্রমণ বেড়েছে। সারা দেশেই হামের সংক্রমণ বাড়ছে, তবে বরগুনায় কেন বেশি-এ নিয়ে গবেষণা জরুরি। অনেক অভিভাবক ৯ মাসে প্রথম ডোজ দিলেও ১৫ মাসের দ্বিতীয় ডোজটি দিচ্ছেন না, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হতে পারে।”
তিনি জানান, অতীতে ভ্যাকসিন সংগ্রহে বিঘ্ন এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়টিও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।
ডা. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, “মাতৃ পুষ্টির ঘাটতি, জন্মের পর শালদুধ না খাওয়ানো এবং শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না থাকাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।” বিস্তর গবেষণার পরই আসলে মূল কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব বলে বলে মনে করে তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, “আগে আমাদের ভ্যাকসিনেশন কাভারেজ ৯০ শতাংশের বেশি ছিল। তারপরও হামের প্রভাব বেড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর পর ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হয়েছে। আমরা এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। এই মুহূর্তে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করতে সক্ষম হই।”
বর্তমানে জেলায় ১৭টি কেন্দ্রে ২১ দিনের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং আগে টিকা নেওয়া শিশুদেরও এর আওতায় আনা হচ্ছে জানান তিনি।
ঢাকা/মাসুদ