ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৫ ১৪৩৩ || ১১ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরের ধান

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:১১, ২৮ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ২০:১২, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরের ধান

অব্যাহত বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে হাওরে চাষ করা পাকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের কৃষকরা। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরের নিচু এলাকার ফসল হারিয়েছেন অনেকে। বৈরী আবহাওয়া ও পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে ধান ঘরে তুলতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন জেলার লাখো কৃষক। আগাম বন্যার পূর্বাভাস, ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত, অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সংকট থাকায় বিপর্যযের মুখোমুখি চাষিরা।

পাহাড়ি ঢলে মধ্যনগর উপজেলার এরনবিল হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে বোরো ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের কাছে সুরেশ্বরী নদীর শাখা মনাই নদীর পানির চাপে এরনবিলের খালের বাঁধ ভেঙে যায়। এই বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরো পড়ুন:

অন্যদিকে, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হরিমনের স্থায়ী বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে বাঁধের বিভিন্ন অংশ দিয়ে পানি চুঁইয়ে বের হতে দেখা গেছে, যা ধীরে ধীরে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সেখানে জড়ো হয়ে নিজ উদ্যোগে মেরামতের কাজ শুরু করেন। বালুর বস্তা ও মাটি দিয়ে ফাটল বন্ধের চেষ্টা চালানো হলেও পানি চাপ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক রয়েছে।

সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৩৪ সেন্টিমিটার। তবে, নদীর পানি বিপৎসীমার ২১৯ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জেলার সব হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতায় ফসল হারিয়েছেন হাওরের নিচু এলাকার হাজারো কৃষক। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে হাওরের অবশিষ্ট ধান ঘরে তুলতে মরিয়া চাষিরা। 

শিয়ালমারা হাওরের কৃষক শরিক মিয়া বলেছেন, “আমরা গতকাল পানি থেকে ধান কেটে শুকনো জায়গায় রেখেছিলাম। কিন্তু, আজ আবার বৃষ্টি হয়েছে, কোনো শুকনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। সব ধান নষ্ট হয়েছে। এখন শ্রমিক খরচ দিয়ে আবার পাড়ে নিতে হচ্ছে। সব মিলে আমাদের এবার লোকসান গোনা ছাড়া উপায় নেই।” 

হাওর এলাকার আরেক কৃষক সামসুউদ্দিন বলেন, “অকালে পানির জন্যে আমাদের সব ধানই এখন পানির নিচে। সারা বছর যে ফসলের আশায় বুক বেঁধে ছিলাম, সেটাই চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেল। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলব, কী খেয়ে বাঁচব, সে চিন্তায় আছি।”

হাওরের কৃষকরা জানিযেছেন, ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে ধান কাটা যাচ্ছে না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হাওরে আসছেন না কৃষকরা। একদিকে, তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে হাওরে পাকা ধান কাটা নিয়ে অনিশ্চিয়তা দিয়েছে। অন্যদিকে, পাহাড়ি ঢলে ফসল ডুবির শঙ্কায় হাওরের চাষিরা।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক হেলাল মিয়া বলেছেন, “পাহাড়ি ঢল নামলে আমাদের হাওরে আর কোনো ধানই থাকবে না। যা কিছু কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করেছি, সেগুলোও ভিজে নষ্ট হয়ে যাবে। কষ্টের ফসল এভাবে হারালে আমাদের বাঁচার আর কোনো উপায় থাকবে না। সব দিকে পানি আর পানি, খুব আতঙ্কে আছি।”

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের কৃষক মোস্তফা আহমেদ বলেন, “আমাদের হাওরের ধান ইতোমধ্যে অনেক নষ্ট হয়েছে। বাঁধ এতটা দুর্বল করে করা হয়েছে যে, যখন-তখন ভেঙে যাবে। সকালে একবার লিক হয়েছিল, নামমাত্র মেরামত করছে। জানি না, কী যে হয়।” 

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের ফসলডুবির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফসল রক্ষা বাঁধগুলোকে সর্বোচ্চ সুরক্ষায় রাখতে আমরা সতর্কতা বাড়িয়েছি। সংশ্লিষ্ট সকল পিআইসি ও স্থানীয়দের সার্বক্ষণিক বাঁধ নজরদারিতে থাকতে বলা হয়েছে। কোথাও দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত মেরামতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে হাওরের ফসল শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যায়।” 

এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৪ ভাগ ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

ঢাকা/মনোয়ার/রফিক

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়