ভয়াল ২৯ এপ্রিল: দুই ভাইকে হারিয়ে বেঁচে ফেরা সোহেলকে থমকে দেয় স্মৃতি
রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম || রাইজিংবিডি.কম
চট্টগ্রামের আলোকচিত্র সাংবাদিক সোহেল সরওয়ার।
আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ৩৫ বছর আগে এই দিনে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝগের আঘাতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চল লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। বাতাসের তীর্ব গর্জন, জলোচ্ছ্বাস আর মানুষের চিৎকার সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা ঝড়ে প্রাণ হারান লাখো মানুষ।
সেই ভয়াল রাত মোকাবিলা করে বেঁচে ফিরেছিলেন চট্টগ্রামের আলোকচিত্র সাংবাদিক তৎসময়ের ৭ বছর বয়সী সোহেল সরওয়ার। তবে, হারিয়েছেন তার ছোট দুই ভাইকে। রাইজিংবিডিকে সোহেল বলেছেন দুই ভাই হারানো ও নিজের বেঁচে ফেরার ভয়াল সেই স্মৃতি।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের সেই রাত এখনো স্পষ্ট সোহেলের চোখে। বয়স তখন সাত। বিকেলে মেলায় ঘোরাঘুরি, ছোট ভাইদের নিয়ে আনন্দ। রাতে সেই হাসি থেমে যায় হঠাৎ।
ঝড় শুরু হওয়ার পর প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসের শব্দ বদলে যায়। ঘরের দরজা কেঁপে ওঠে। একসময় তা ভেঙে পড়ে। পানি ঢুকতে শুরু করে ঘরের ভেতরে।
সোহেল বলেন, “বয়স কম হলেও সেই রাতের অনেক স্মৃতি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। শুরুতে পানি ছিল হাঁটু পর্যন্ত। তারপর খুব দ্রুত পানি বাড়তে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই যেন পানি গলা ছুঁয়ে ফেলে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু বাতাসের গর্জন আর মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।”
এই সময় সোহেল সরওয়ারের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক ও মা তাহেরা বেগম তাদের সন্তানদের নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বাইরে বের হয়েই বুঝতে পারেন, তারা আর মাটিতে নেই। স্রোত তাদের ভাসিয়ে নিচ্ছে। গাছ ভেঙে পড়ছে, টিনের চাল উড়ে যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ভেঙে পানিতে মিশে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আবু বক্কর সিদ্দিক ছেলে সুমনকে কোলে নিয়ে আলাদা হয়ে যান স্রোতের টানে। মা তাহেরা বেগমের কাছে ছিল তিন সন্তান সোহেল, রাসেল ও শিশু শাহেদ। তিনি রাসেল ও সোহেলকে দুই হাতে ধরেন।
একটু বড় হওয়ায় মাকে তারা ধরে রাখতে পেরেছিল। শাহেদকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে তাহেরা বেগম এক অদ্ভুত উপায় খুঁজে নেন। সন্তানের জামার বোতামসহ শার্ট দাঁত দিয়ে চেপে ধরেন। যেন সে স্রোতে হারিয়ে না যায়। এভাবেই সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্ঠা করতে থাকেন তিনি।
সোহেল জানান, পানির স্রোত ছিল এত শক্তিশালী যে, সাঁতার কাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কখনো ভাসমান ঘরের চাল, কখনো গাছের ডাল, কখনো অজানা কোনো বস্তুতে ধাক্কা খেতে খেতে তারা স্রোতের টানে হারিয়ে যাচ্ছিলেন। একসময় তারা একটি ভাসমান ঘরের ছাউনিতে উঠতে সক্ষম হন। সেখানে আরো মানুষ উঠে পড়ায় সেটিও ভারসাম্য হারিয়ে আবার পানিতে ডুবে যায়। আবার শুরু হয় ভেসে থাকার সংগ্রাম।
সোহেল বলেন, “সেই সময় শুধু একটি চিন্তাই ছিল, বাঁচতে হবে। মাকে শক্ত করে ধরে ছিলাম। হাত ছাড়লেই শেষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই লড়াই চলতে থাকে।”
তিনি জানান, ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে তারা একটি উঁচু জায়গায় এসে আছড়ে পড়েন। পরে জানা যায়, তারা নিজেদের বাড়ি থেকে প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার দূরে ভেসে গিয়েছিলেন। ভোরের আলোয় সামনে যা দেখেন, তা ছিল আরো ভয়ংকর। চারদিকে শুধু নিথর দেহ। মানুষের লাশ, পশুর লাশ, ভাঙা ঘরবাড়ি, ছিন্নভিন্ন জীবনের চিহ্ন। মায়ের হাতে ধরে থাকা সোহেল ও রাসেল বেঁচে ছিলেন। কিন্তু, তাহেরা বেগম শার্টের বোতাম কামড়ে মুখের সঙ্গে যে ছোট শাহেদকে আগলে রেখেছিলেন, তার দেহে সকালে আর প্রাণ ছিল না।
সোহেল জানান, স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়। কিছু সময় পর সোহেলের বাবাকেও খুঁজে পাওয়া যায়। বাবার সঙ্গে থাকা সুমনকে আর পাওয়া যায়নি। সেই ভাইটিও বাবার হাত থেকে স্রোতের টানে ভেসে যায়। হারিয়ে যাওয়া এই ভাইকেও আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
দুই ভাইকে হারানো এই ভয়াল ঘটনার পর সোহেলের জীবনে আর কিছু আগের মতো ছিল না। ভয়, শোক, আর স্মৃতির ভার তাকে বদলে দেয়। পরিবার শহরে চলে আসে। গ্রাম ছেড়ে দেয় চিরতরে। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট সোহেল হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা মানুষ।
সোহেল অ্যাথলেট হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পান। অ্যাথলেটিক্সে নিজের পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হন সোহেল সরওয়ার। ২০০৪ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুব প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটারে স্বর্ণপদক এবং ১৫০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি। পরে হাতে তুলে নেন ক্যামেরা। হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ আলোকচিত্রি সাংবাদিক।
বর্তমানে সোহেল সারওয়ার বাংলানিউজ২৪ ডটকম-এর এর চট্টগ্রাম অফিসে সিনিয়র ফটো করেসপন্ডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি তুলে ধরেন সময়ের ইতিহাস। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত উইমেন্স এশিয়ান কাপ কভার করে দেশে ফিরেছেন তিনি।
সোহেল জানান, জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তিনি পেয়েছেন সেই রাত থেকেই। মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে তিনি অন্যভাবে দেখেন। যখন তিনি দুর্যোগের ছবি তোলেন, তখন সেই রাতের স্মৃতি ফিরে আসে। সেই স্রোত, সেই আঁধার, সেই লড়াই। একটি ভয়াল রাত তার কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। কিন্তু সেই রাতই তাকে শিখিয়েছে বেঁচে থাকার মানে।
ঢাকা/মাসুদ